হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: ফরিদপুরে পাঁচ বছর আগে এক ইতালী প্রবাসীকে কুপিয়ে হত্যার ঘটনায় দায়েরকৃত হত্যা মামলা রাজনৈতিক মামলা বলে প্রত্যাহারের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন দপ্তরে সুপারিশ করা হয়েছে। এ ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করে ন্যায় বিচার চেয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন নিহতের পরিবার। তাঁরা বলছেন, মামলাটি প্রমাণিত ও বিচারাধীন থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক ক্ষমতাশালী লোকের তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে সুপারিশ করা হয়েছে। এছাড়া রাজনৈতিক মামলা হিসেবে গণ্য না করে হত্যা মামলা হিসেবে উল্লেখ করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সহযোগিতা চেয়েছেন তাঁরা।
মঙ্গলবার (৫ মে) দুপুর ১২ টায় ফরিদপুর প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ করেন পরিবারটি। সংবাদ সম্মেলনে নিহতের বৃদ্ধা মা হালিমা বেগমের (৭৫) পক্ষে লিখিত বক্তব্য রাখেন তাঁর ছোট ছেলে আসাদুজ্জামান।
এ সময় নিহতের স্ত্রী শাহীন আফরোজ রোজা ও পাঁচ বছর বয়সী মেয়ে মাসুদা মেহেরুবা (৫) সহ পরিবারের অন্য সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা ভাঙ্গা উপজেলার হামিরদি ইউনিয়নের গজারিয়া গ্রামের বাসিন্দা।
সংবাদ সম্মেলনে হালিমা বেগম জানান, ২০০৪ সাল থেকে ১৮ বছর যাবৎ তাঁর ছোট ছেলে মাসুদ রানা (৪৫) ইতালিতে বসবাস করে আসছিলেন। এরপর ২০১৭ সালে স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যান সেখানে। এরমধ্যে ২০২১ সালে দেড়মাসের ছুটিতে দেশে আসেন মাসুদ রানা। তৎকালীন সময়ে তাঁদের গ্রামে দুই পক্ষের বিরোধ মেটাতে তিনি উদ্যোগ নেন। এতে গ্রাম্য মোড়ল ও পৌর আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চু গ্রুপ তাঁর ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে। যার প্রেক্ষিতে ওই বছরের ১৩ এপ্রিল রাতে ভাঙ্গা উপজেলার নওপাড়া বাসস্ট্যান্ড এলাকায় দলবল নিয়ে ধারালো অস্ত্র চাপাতি, রামদা নিয়ে তাঁর ছেলেকে কুপিয়ে হত্যা করে।
এ ঘটনায় ১৫ এপ্রিল ৩৫ জনকে আসামী করে ভাঙ্গা থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন তিনি। এই মামলায় একই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর হত্যাকান্ডের বিবরণ, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও হত্যাকান্ডের ব্যবহৃত একটি ধারালো ছুরির ফরনেসিক প্রতিবেদনসহ ৩৪ জনের নামে আদালতে অভিযোগপত্র জমা দেন- তদন্তকারী কর্মকর্তা জেলা গোয়েন্দা পুলিশের উপ-পরিদর্শক মো. ফরহাদ হোসেন।
এছাড়া অভিযোগপত্রে উপজেলা আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি ইমদাদুল হক বাচ্চুর (৬০) নেতৃত্বে ও নিজেই কুপিয়ে জখম বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। পরবর্তীতে ফরিদপুর অতিরিক্ত দায়রা জজের ২য় আদালতে বিষয়টি বিচারাধীন রয়েছে এবং ৯ জনের স্বাক্ষ্য চলমান বলে সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে পরিবারটির উত্থাপিত নথিপত্রে দেখা যায়, আদালতে চলমান মামলাটি চলতি বছরে রাজনৈতিক মামলা উল্লেখ করে প্রত্যাহারের আবেদন করেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদারেরস আলী ইছা। এতে তিনি সকল আসামীর নাম উল্লেখ করেছেন।
পরবর্তীতে চলতি বছরের ৮ এপ্রিল জেলা ‘বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক কারণে দায়েরকৃত হয়রানিমূলক মামলাসমূহ প্রত্যাহার সংক্রান্ত যাচাই-বাছাই’ কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে প্রত্যাহারের জন্য সুপারিশ হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়। ওই সুপারিশপত্রে স্বাক্ষর করেন কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা (সাবেক), সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস, সদস্য ও পুলিশ সুপার মো. নজরুল ইসলাম, জেলা ও দায়রা জজ আদালতের পাবলিক প্রসিকিউটর মো. আশরাফুজ্জামান নান্নু।
এছাড়া গত ২৩ এপ্রিল জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ কামরুল হাসান মোল্যা স্বাক্ষরিত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন ও বিচার বিভাগ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, মন্ত্রী পরিষদ বিভাগ ও ঢাকা বিভাগীয় কমিশানারের কাছে প্রেরণ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বৃদ্ধা হালিমা বেগম ছেলে হত্যার ন্যায়-বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, সরকারের কাছে আমার দাবি- আমি জীবিত থাকতে যেন ন্যায্য বিচারটা পাই। আমার ছেলের শোকে চার মাস পর আমার স্বামীও স্ট্রোক করে মারা গেছে। এই মামলা কিভাবে রাজনৈতিক মামলা হয়। এই মামলা তদন্ত করে দেখুক, আমার ছেলের কোনো দোষ ছিল কি-না।’
তিনি বলেন, ‘আমার ছেলে কোনো রাজনীতির সাথে জড়িতও ছিল না এবং বাংলাদেশের ভোটারও ছিল না। এলাকার মানুষের জন্য কাজ করতেন, গরীব মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল, তাঁদের বিভিন্নভাবে সহযোগিতায়ও করতো। তাকে এমনভাবে মারছে যে একটি দোকানে গিয়ে পালিয়েছিল, সেখানে ঢুকে ওই বাচ্চু লোকজন নিয়ে মারছে। এই মামলা কিভাবে রাজনৈতিক মামলা হয়, আমি জানি না।’
এছাড়া নিহতের ভাই আসাদুজ্জামান অভিযোগ করে বলেন, আমার ভাইকে যারা কুপিয়ে হত্যা করেছে, তাঁরা আওয়ামী লীগের পদধারী নেতাকর্মী। তাঁরা সাজাপ্রাপ্ত হওয়ার ভয়ে বর্তমানে ভোল্ট পাল্টিয়ে ক্ষমতাশালী দলের নেতাদের সাথে মিশে এবং তদবির বাণিজ্যের মাধ্যমে রাজনৈতিক মামলা হিসেবে সুপারিশ করিয়েছে। কিন্তু প্রত্যেক আসামীই আমার ভাই হত্যার সাথে জড়িত রয়েছে, যেটা দিনের আলোর মতো পরিষ্কার।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আবেদনকারী ও জেলা বিএনপির আহ্বায়ক সৈয়দ মোদারেরছ আলী ইছা বলেন, ‘একজন ভাল-মন্দ বলতেই পারে। আবেদনের পরে এটা আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, গোয়েন্দা সংস্থা রিপোর্টের ভিত্তিতেই সুপারিশ করা হয়েছে।’ এছাড়া প্রধান অভিযুক্ত আওয়ামীলীগ নেতার বিষয়ে বলেন- ‘আমিতো আর সারাদেশের মানুষ চিনি না, কে কোন দল করে।’
এছাড়া যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্য সচিব ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মিন্টু বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি নিয়ে প্রথমে একটি লোকাল তদন্ত হয়েছে এবং পরে পর্যালোচনা করে তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী কমিটির মাধ্যমে সুপারিশ করে এবং নিয়মতান্ত্রিক অনুযায়ী স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
পরিবারটি যদি প্রথমদিকে আমাদের জানাতেন, তাহলে আমরা পুনরায় তদন্তে পাঠাতাম। এখন তাঁরা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে আপত্তি জানাতে পারেন এবং আপত্তি অনুযায়ী পুনরায় তদন্তে দেয়া হলে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।’