শিরোনাম
◈ ফ্রান্সে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে বিক্ষোভ, পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে গ্রেপ্তার ২৭২ জন ◈ এলন মাস্কের টেসলাকে চ্যালেঞ্জ, রোডস্টারের ওপর দিয়ে উড়ল আলেফের উড়ন্ত গাড়ি! ◈ অনুমতি ছাড়াই অন্যের ওয়ালেট থেকে পরীক্ষামূলক ইথেরিয়াম খরচ করল ওপেনএআইয়ের গবেষণা মডেল ◈ নারী শ্রমিকদের কল্যাণে গুরুত্ব, রিবা আন্তর্জাতিক স্থাপত্য পুরস্কারে বিশ্বের সেরা নতুন ভবন রংপুরের গ্রিন ফিল্ড ফ্যাক্টরি ◈ ইনানী রিসোর্টে আগুন: ফজরের পর সৈকতে গিয়ে বাঁচলেন দুই বান্ধবী, প্রাণ গেল মুক্তার ◈ আ‌লিং হলান্ডের জোড়া গোলে ম‌্যান‌চেস্টার সিটির জয় ◈ তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থায়ন, আবেদন শুরু ১ নভেম্বর ◈ কুমিল্লায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের জমির দ্বন্দ্বে যুবদল নেতা খুন : পুলিশ সুপার ◈ দেশ গঠনে যুবসমাজকেই অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী ◈ কলকাতায় দুর্গাপূজার মণ্ডপে পদদলিত হয়ে নিহত ১৭, ১৩ নারী ও ১ শিশু

প্রকাশিত : ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৯:৫৮ সকাল
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ১০:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

একটি উড়াল সড়কই খুলে দিতে পারে খালিয়াজুরীর সম্ভাবনার দুয়ার

নগরের নীতিনির্ধারণী টেবিলে উন্নয়নের রঙিন মানচিত্র আঁকা হলেও হাওরের হাহাকার যেন সেখানে পৌঁছায় না। বিস্তীর্ণ জলরাশি, উর্বর কৃষি জমি আর দেশীয় মাছের অফুরন্ত ভান্ডার নিয়ে গড়ে উঠা সম্ভাবনাময় জনপদ খালিয়াজুরী উপজেলা আজ অবহেলা, দূষণ ও প্রশাসনিক স্থবিরতায় বিপর্যস্ত। ধান ও মাছের প্রাচুর্যে একসময় সমৃদ্ধ এই জনপদ এখন বঞ্চনা ও সংকটের মূর্ত প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিনের অবহেলিত যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি ঘটালে এ অঞ্চলটি দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্রে পরিণত হতে পারে। ঘুরতে পারে অর্থনীতির বড় চাকাও।

খালিয়াজুরী উপজেলা বিএনপি’র সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান কেষ্টু বলেন, “আমরা ধান ফলাই, মাছ উৎপাদন করি, কিন্তু ঠিকমতো রাস্তা না থাকায় ন্যায্য দাম পাই না। একটি টেকসই উড়াল সড়কই আমাদের ভাগ্য বদলে দিতে পারে।”

উপজেলার পাঁচহাট গ্রামের বাসিন্দা রওশনারা আক্তারের আক্ষেপ, “অসুস্থ রোগী নিয়ে রাতে বের হতে ভয় লাগে। বর্ষায় কখনও নৌকা নেই, আবার শুকনো মৌসুমে দুর্গম যোগাযোগের কারণে কখনও  মাইলের পর মাইল যেতে হয় হেটে। মনে হয় আমরা যেন আলাদা এক দুনিয়ায় বাস করি।”

১২ কিলোমিটার উড়াল সড়কের দাবি
দেশের মূল ভূখন্ডের সঙ্গে সরাসরি ও টেকসই সড়ক সংযোগ না থাকায় সহস্রাব্দ-প্রাচীন ঐতিহ্যের ধারক খালিয়াজুরী আজও এক বিচ্ছিন্ন জনপদ। খালিয়াজুরী কলেজ শিক্ষক জিয়াউল হক হিমেল বলেন, এ উপজেলা সদর থেকে বোয়ালী বাজার পর্যন্ত মাত্র ১২ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে শুকনো মৌসুমে সময় লাগে দুই থেকে তিন ঘণ্টা। কয়েক দফা বাহন পরিবর্তন আর মাথাপিছু অন্তত ২০০ টাকা ভাড়া গুনতে গিয়ে সাধারণ মানুষের নাভিশ্বাস উঠছে।

Advertisement

বর্ষার সাত মাস এই পথ থাকে পানির নিচে, তখন একমাত্র ভরসা ইঞ্জিন চালিত নৌকা। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই নৌযান চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জরুরী রোগী পরিবহন বা প্রশাসনিক প্রয়োজনে তৈরি হয় ভয়াবহ সংকট।

স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি—খালিয়াজুরী সদর থেকে বোয়ালী বাজার পর্যন্ত ‘উড়াল সড়ক’ নির্মাণ। খালিয়াজুরী বাজারের ব্যবসায়ী সোহান-বিন-নবাব বলেন, “১২ কিলোমিটার উড়াল সড়ক হলে সারা বছর গাড়ি চলবে। কৃষিপণ্য ও মাছ দ্রুত বাজারে নিতে পারবো, ক্ষতি কমবে।”

হাতছানি দিচ্ছে পর্যটন সম্ভাবনা
খালিয়াজুরীর প্রাকৃতিক সৌন্দর্য পর্যটকদের জন্য এক বড় আকর্ষণ। স্থানীয় সাংবাদিক মামুন চৌধুরী, মো. হাবিবুল্লাহ ও খালিয়াজুরী সদর ইউপি সদস্য মো. রিয়াজ উদ্দিন তালুকদার সুখন বলেন, বর্ষায় চারদিকে থৈ থৈ জলরাশি আর শরতে নীল আকাশের প্রতিচ্ছবি এখানে এক মায়াবী পরিবেশ তৈরি করে। কিন্তু দুর্গম যাতায়াতের কারণে পর্যটকরা এখানে আসতে সাহস পান না।

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, প্রস্তাবিত ১২ কিলোমিটার উড়াল সড়ক নির্মিত হলে এটি নিকলী বা মিঠামইন-এর মতো পর্যটন শিল্পে পরিণত হবে। এতে করে কেবল কৃষি বা মৎস্য নয়, পর্যটন খাত থেকেও কোটি কোটি টাকার রাজস্ব আয় সম্ভব হবে এবং বাড়বে স্থানীয় কর্মসংস্থান।

ধান ও মাছের খনিতে ধস
খালিয়াজুরীর অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে কৃষি ও মৎস্য সম্পদের ওপর। তবে অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার বলি হচ্ছেন এখানকার উৎপাদকরা। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন জানান, এ উপজেলায় বছরে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন ধানের জোগান আসে। কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থা পশ্চাৎপদ থাকায় কৃষকেরা ধানের ন্যায্য দাম পান না।

উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মাহাবুবুর রহমান বলেন, প্রতিবছর এখান থেকে ২০ হাজার মেট্রিক টন মাছ উৎপাদিত হয়। “সঠিক ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত পরিবহন নিশ্চিত করলে বছরে এখান থেকে দশ কোটি টাকারও বেশি রাজস্ব আয় সম্ভব।”

স্থানীয় কৃষক আক্তার হোসেন তালুকদার বলেন, “ধান বিক্রি করতে খরচই বেশি পড়ে যায়। রাস্তা ভালো থাকলে আমরা সরাসরি বড় বাজারে যেতে পারতাম।”

দুর্গমতার দহনে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও প্রশাসন
দুর্গম যোগাযোগ আর নাগরিক সুবিধার অভাবে সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে খালিয়াজুরী এখন এক ‘পানিশমেন্ট জোন’ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাদির হোসেন শামীম বাস্তবতাকে স্বীকার করে বলেন, “দুর্গমতার কারণে এখানে চাকরি এবং জীবন ধারণ করা অনেক বেশি চ্যালেঞ্জিং।”

খালিয়াজুরী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আরেফিন আযিম বলেন, এখানে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও দুর্গম যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক আসেন না। দীর্ঘ ও কষ্টসাধ্য পথ পাড়ি দিতে সময় বেশি লাগায় জরুরি বা জটিল অবস্থায় গর্ভবতী মা ও নবজাতক শিশুর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটছে।   

উদয়পুর গ্রামের শিক্ষক প্রান্তোষ সামন্ত বলেন, “অনেক শিক্ষার্থী বর্ষাকালে নিয়মিত স্কুলে যেতে পারে না। যোগাযোগ সমস্যা শিক্ষার হার কমিয়ে দিচ্ছে।”

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার কারণে প্রাথমিক শিক্ষার হার মাত্র ৩৭ দশমিক ৩৯ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের তুলনায় প্রায় অর্ধেক নিচে।

এলাকার দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও উন্নয়নের দাবি নিয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, “হাওরাঞ্চলের মানুষ দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখলেও তারা সব সময় উপেক্ষিত থেকেছে। খালিয়াজুরী সদর থেকে বোয়ালী বাজার পর্যন্ত সংযোগ রক্ষা করা আমাদের প্রধান অগ্রাধিকার। আমরা এই পথে একটি টেকসই যোগাযোগ ব্যবস্থা বা উড়াল সড়ক নির্মাণের জন্য সরকারের উচ্চপর্যায়ে জোরালো দাবি রাখবো। এতে পর্যটন ও কৃষিতে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।”

হাওরবাসীর দাবি, কালক্ষেপণ না করে দ্রুত এই উড়াল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হোক। অন্যথায় উন্নয়নের মানচিত্র থেকে এই সম্ভাবনাময় জনপদ চিরতরে ছিটকে পড়বে।

সূত্র: ইত্তেফাক

  • সর্বশেষ