ঢাকা মহানগরীর ফুটপাতে পথচারীদের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিত করা এবং হকারদের সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে দক্ষিণ ও উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় নয়টি স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
এর মধ্যে দক্ষিণ সিটির সাতটি স্থানে হকারদের বেচাকেনার সময়ও ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। উত্তর সিটির দুটি স্থানে পুনর্বাসনের তথ্য মিলেছে, তবে সময় বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।
বৃহস্পতিবার আনুষ্ঠানিকভাবে ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে দুই সিটির ৩০২ জন হকারকে। পর্যায়ক্রমে আরও হকারকে এ পরিচয়পত্র দেওয়ার কথা বলেছে দুই সিটি করপোশেন।
দক্ষিণ সিটির যেখানে হকার বসবে
ঢাকা দক্ষিণের সাতটি স্থানকে হকারদের জন্য নির্ধারণ করে সময় বেঁধে দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশেন।
রমনা ভবন সংলগ্ন লিংক রোড এলাকায় ১০০ জন হকারকে পুনবার্সনের জন্য ডিজিটাল পরিচয়পত্র দিয়েছে তারা।
বৃহস্পতিবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন-ডিএসসিসির নগর ভবন মিলনায়তনে প্রস্তাবিত ‘ঢাকা শহরের হকার ব্যবস্থাপনা নীতিমালা-২০২৬’ এর আওতায় হকার পুনর্বাসন কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত এলাকাগুলো হল গুলিস্থানের রমনা ভবনের লিংক রোড, এখানে প্রতিদিন বসবেন হকাররা।
এছাড়া গুলিস্তান টুইন টাওয়ার গলি, বাইতুল মোকাররম পূর্ব গেইট সংলগ্ন লিংক রোড, নিউ মার্কেটের দক্ষিণ গেইট সংলগ্ন এক পাশে, শাজাহানপুর রেলওয়ে কলোনির অভ্যন্তরে মাঠ সংলগ্ন রাস্তায় প্রতিদিন হকাররা বসতে পারবেন।
সান্ধ্যকালীন বেচাকেনা হবে মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের বিপরীত পাশে এজিবি কলোনি মাঠ, মতিঝিলের ইসলাম চেম্বারের সামনের জায়গা ও রাজউক ভবনের পেছনে।
তবে বেশ কয়েকবছর আগে থেকেই এই স্থানগুলোর বেশিরভাগেই হকারদের পুনর্বাসনের জন্য স্থান নির্ধারণ করা ছিল। এমনকি এসব স্থানে হকাররা নিয়মিত বেচাকেনা করতেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন- ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম বলেন, “আজ ১০০ হকারকে কিউআর কোড সম্বলিত ডিজিটাল পরিচয়পত্র প্রদান করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সংখ্যক সকল হকারকে প্রদান করা হবে।
“এর মাধ্যমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে। এছাড়া, ট্রাফিক পুলিশ সহজেই তাদের বৈধতা ও বসার স্থান যাচাই করতে পারবে।”
তিনি বলেন, “হকার বসার পরও ফুটপাথে পথচারীদের চলাচলের জন্য নূন্যতম ৫-৬ ফুট জায়গা উন্মুক্ত রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।”
ডিএসসিসি প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তারা ঢাকা শহরে হকার ব্যবস্থাপনা শুরু করেছেন। এর ফলে একদিকে যেমন নিরাপদ ও পথচারী বান্ধব ফুটপাত নিশ্চিত হবে, তেমনি সড়কে শৃঙ্খলা আনা সম্ভব হবে। অন্যদিকে হকার নিবন্ধন ও পুনর্বাসনের মাধ্যমে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন হবে।
তিনি বলেন, “হকার, পুলিশ, সিটি করপোরেশন ও সাধারণ মানুষ সবাই মিলে সহযোগিতা করলে এই ঢাকা শহরকে সুন্দরভাবে ব্যবস্থাপনা করা সম্ভব।”
ডিএসসিসি প্রশাসক বলেন, খেলার মাঠ, স্কুল মাঠ বা ধর্মীয় উপাসনালয়ের সামনে কোনো বাজার বসানো যাবে না। এছাড়া কোনো স্থায়ী অবকাঠামো তৈরি করা যাবে না। নীতিমালা লঙঘনকারী বা লাইসেন্সবিহীন অবৈধ হকারদের যেকোনো সময় উচ্ছেদের পূর্ণ এখতিয়ার কর্তৃপক্ষ সংরক্ষণ করবে।
এছাড়া হকারদের কাছ থেকে অবৈধ চাঁদাবাজি বন্ধে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কঠোর তদারকি করবে, বলেন তিনি।
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার বিভাগের নগর উন্নয়ন অনুবিভাগের যুগ্মসচিব পরিমল সরকার এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ-ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
উত্তর সিটিতে আপাতত দুটি স্থানে হকার বসবে
মিরপুর ১০, ১ ও ২ নম্বর সেকশনের মূল সড়কের তালিকাভুক্ত ৮২৯ জন হকারের মধ্যে বৃহস্পতিবার প্রথম ধাপে ২০২ জনকে পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে।
ডিএনসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেছেন, এর মধ্যে ১০২ জনকে মিরপুর-১০ থেকে মিরপুর-১৩ ওয়াসা রোডে পুনর্বাসন করা হবে। মিরপুর ১ থেকে বাকি ১০০ জনকে গাবতলী কাঁচা বাজার সংলগ্ন ফাঁকা স্থানে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
বাকিদেরও পর্যায়ক্রমে পরিচয়পত্র দিয়ে নির্ধারিত স্থানে স্থানান্তর করার কথা বলেছে তিনি।
বৃহস্পতিবার বিকালে ডিএনসিসির নগর ভবনে আনুষ্ঠানিকভাবে হকার পুনর্বাসন কার্যক্রম উদ্বোধন করেন ঢাকা উত্তর সিটির প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন।
প্রধানমন্ত্রী হকারদের জীবিকার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়েছে তুলে ধরে তিনি বলেন, ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার হকারদের বৈধতা দেওয়ার পাশাপাশি ব্যবসার জন্য বিকল্প স্থান নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।
“আমরা আগেই হকারদের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের মতামত নিয়েছি। তারা নিজেরাও অবৈধভাবে ব্যবসা করতে চান না। সে অনুযায়ী পুলিশ প্রশাসনের সহযোগিতায় এই তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।”
বিকল্প স্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুরুতে রাজধানীর ৬টি মাঠে হকার পুনর্বাসনের প্রস্তাব এলেও তা বাতিল করার কথা বলেছেন শফিকুল ইসলাম। তিনি বলেন, “সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মাঠগুলোতে আমাদের সন্তানরা খেলাধুলা করে, তাই মাঠগুলো পুনর্বাসনের জন্য ব্যবহার করা যাবে না।”
ভবিষ্যতে হকারদের জন্য পৃথক ‘হকার্স মার্কেট’ গড়ে তোলার বিষয়টিও সিটি করপোরেশনের বিবেচনায় রয়েছে, বলেন প্রশাসক।
হকারদের নির্ধারিত স্থানে স্থায়ী কাঠামো বা চৌকি না বসানোর নির্দেশ দিয়ে তিনি বলেন, “বিশেষ ডিজাইনের ট্রলিতে করে ব্যবসা করবেন। সেই ট্রলিতেও আপনাদের ‘রেজিস্ট্রেশন কার্ড’ দেওয়া থাকবে।”
অল্প সময়ের মধ্যে হকারদের নতুন জায়গায় যাওয়ার তাগিদ দিয়েছেন তিনি।
পাশাপাশি সতর্ক করে প্রশাসক বলেছেন, “পুরান জায়গায় আর বসবেন না। নির্ধারিত জায়গায় গিয়ে ব্যবসা করবেন, না হলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হবে। নির্ধারিত সময়ের পর পুরোনো স্থানে হকার পাওয়া গেলে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।”
চাঁদাবাজির বিষয়ে তিনি কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “কেউ চাঁদা দাবি করলে আমাদের জানাবেন। যে নেবে আর যে দেবে-দুজনই অপরাধী।”
অনুষ্ঠানে ডিএনসিসির প্রধান বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা কমডোর হুমায়ুন কবীর, প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ইমরুল কায়েস চৌধুরী, প্রধান প্রকৌশলী ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ রকিবুল হাসান উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম