প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন: শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্চবিত্তের প্রতিনিধিত্ব বাড়লে শিক্ষকদের মাঝেও বাড়বে

অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন
একটি আদর্শ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এমন হওয়া উচিত যাতে তারা দেশের সকল শ্রেণি-পেশার পরিবারের প্রতিনিধিত্ব করে। আমার ছাত্রজীবন এবং এখন শিক্ষকতা জীবন মিলিয়ে দীর্ঘ একটা সময় কেটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ফলে আমি এর বিবর্তনটা বেশ ভালোভাবেই টের পাচ্ছি। ৮০-র দশকেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্চবিত্তের প্রতিনিধিত্ব বেশ ভালোই ছিলো। তখনো শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের মোটামোটি ভালো একটি অংশ উচ্চবিত্ত এবং উচ্চমধ্যবিত্তকে প্রতিনিধিত্ব করতো। তখন থেকেই দেশে ইংরেজি মাধ্যম ব্যাপক জনপ্রিয় হতে শুরু করে। ফলে উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের বেশি বেশি করে ইংরেজি মাধ্যমে পড়াতে শুরু করে।

এই পরিবর্তনটা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় টের পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয় তার ভর্তি প্রক্রিয়াকে পরিবর্তন করেনি। ফলে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে নিরুৎসাহীবোধ করতো। এর ফলে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা হয় প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে কিংবা বিদেশমুখী হওয়া শুরু করলো। আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চবিত্তের প্রতিনিধিত্ব কমতে থাকলো।

উচ্চবিত্ত ম্যাটার্স। শুনতে ভালো লাগুক আর নাই লাগুক তারাই দেশ চালায়। তারা যখন দেখলো বাংলাদেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তাদের সন্তানদের জন্য নয় তখন থেকে এই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তথা বাংলা মাধ্যম জাহান্নামে যাক তাতে কিছু আসে যায় না এই চিন্তাটা তাদের অবচেতন মনেই এসে যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত ছিলো এই জিনিসটা বুঝতে পারা। আজ থেকে ১০-১২ বছর আগেই আমি আমাদের ডিনকে বলেছিলাম এই বিষয়টা নিয়ে ভাবতে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষাকে এমনভাবে সাজাতে যাতে সকল মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড হয়। উচ্চ শিক্ষা কোনো দয়ামায়ার স্থান নয়। এখানে শিক্ষক নিয়োগ এবং ছাত্র ভর্তি হবে মেধাভিত্তিক। একটু বলে রাখি শিক্ষক কর্মকর্তাদের জন্য কোটা সিস্টেম অতি দ্রুত বাতিল করা উচিত। এটি মেধাভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্তরায়। বিদেশে মেধাবীদের নেওয়ার জন্য আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করে। আমাদের ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা বিদেশের বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী পার হতে পারে না। এ ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ ব্যতিক্রম।

তারা তাদের ভর্তি পরীক্ষাকে এমনভাবে সাজিয়েছে যাতে ইংরেজি বা বাংলা মাধ্যম সবার জন্যই লেভেল প্লেয়িং হয়। পুরো বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন করতে অসুবিধা কোথায়? বিদেশে ভর্তি হতে বাংলা এবং ইংরেজি মাধ্যমের অনেক শিক্ষার্থীই এখন ঝঅঞ পরীক্ষা দেয়। আমার জানামতে ইংরেজি মাধ্যম এবং বাংলা মাধ্যমের নটরডেমসহ কিছু ভালো কলেজের শিক্ষার্থীরা ঝঅঞ পরীক্ষায় দারুণ ভালো করে। এর মাধ্যমে তারা এমআইটি হার্ভার্ড, স্ট্যানফোর্ড, প্রিন্সটন, উইলিয়ামস কলেজসহ বিশ্বের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়। সেখানে ভর্তি হতে শিক্ষার্থীদের একটি রচনাও লিখতে হয়। সেই ঝঅঞ রেজাল্ট, রচনাসহ পরীক্ষার ফলাফল ইত্যাদি সব কিছু মিলিয়ে মেধাবীদের বাছাইয়ের একটা পদ্ধতি বের করেছে এবং গবেষণা করে দেখা গেছে এটিই বেশ ফলপ্রসূ। আমরা কেন কিছু শিক্ষার্থীদের এই পদ্ধতিতে নেই না। এভাবে নিলে উচ্চবিত্তের প্রতিনিধিত্ব বাড়তো।

শিক্ষার্থীদের মাঝে উচ্চবিত্তের প্রতিনিধিত্ব বাড়লে শিক্ষকদের মাঝেও বাড়বে। বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার খুব কাছের জানাশোনার মধ্যে একজন সহকর্মী আছেন যিনি কিনা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স করেছে। সে বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। তিনি আমেরিকার এক স্বনামধন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করে একটি স্বনামধন্য মার্কিন কোম্পানির রিসার্চ ডেভেলপমেন্ট বিভাগে কাজ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দিয়েছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদীয়মান গবেষকদের মাঝে তিনি অন্যতম। তাঁর মতো শিক্ষক যদি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আর ৫০ জন থাকতো আমি নিশ্চিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চেহারা আজ অন্য রকম হতো। এমনকি আমার পদার্থবিজ্ঞানেও কয়েকজন শিক্ষার্থীদের ইংরেজি মাধ্যমের পেয়েছিলাম যাদের পারফরমেন্সে আমি মুগ্ধ।

একটি ক্লাস হওয়া উচিত বৈচিত্র্যময়। বৈচিত্র্যতা আসতে পারে নানা মাত্রায়। ধর্মীয় দিক থেকে, শিক্ষার মাধ্যমের দিক থেকে, অর্থনৈতিক দিক থেকে, এথনিক মাইনোরিটির দিক থেকে। ক্লাস যতো বেশি বৈচিত্র্যময় হবে সেই ক্লাস ততো বেশি সুন্দর এবং রিসোর্সফুল হয়। শ্রেণিকক্ষেতো কেবল পাঠ্যপুস্তক পড়ানো হয় না শ্রেণিকক্ষের মাধ্যমে সামাজিকতাও শেখা হয়। সেই সমাজটা যতো বেশি বৈশ্বিক হবে ততোই ভালো। বৈশ্বিক না পারলাম ন্যূনতম দেশকে প্রতিনিধিত্ব করে তেমনটাতো নিশ্চিত করতে পারি। তাতে দেশের সকল মানুষই আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল নিয়ে ভাবতো। বর্তমানে দেশের রাজা বাদশাহরা আমাদের বাংলা মাধ্যম তথা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মঙ্গল নিয়ে একদম ভাবেন না। ভাববেন কেন? তাদের সন্তানরা কি এখানে পড়ে? লেখক : পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

 

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত