প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আত্মহত্যার মহামারি

মীর হাসিব মাহমুদ : আত্মহত্যা বলতে বুঝানো হয় নিজ ইচ্ছায় নিজের জীবন বিসর্জন দেয়া। ল্যাটিন ভাষায় সুই সেইডেয়ার থেকে আত্মহত্যা শব্দটি এসেছে, যার অর্থ হচ্ছে নিজেকে নিজে হত্যা করা। প্রতিবছর প্রায় দশ লক্ষ মানুষ আত্মহত্যা করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর মতে প্রতি বছর সারা বিশ্বে যে সব কারণে মানুষের মৃত্যু ঘটে তার মধ্যে আত্মহত্যা ত্রয়োদশতম প্রধান কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে বাংলাদেশে আত্মহত্যার প্রবণতা বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। এক জরিপ অনুযায়ী সারাবিশ্বে আত্মহত্যায় বাংলাদেশের অবস্থান দশম। ২০১১ সালে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ৩৪তম।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অধিকাংশ দেশে নারীদের তুলনায় প্রায় তিন গুণ পুরুষ আত্মহত্যা করেন। অথচ বাংলাদেশে পুরুষের তুলনায় নারীদের আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি। আত্মহননকারী নারীদের বয়স ১৪ থেকে ৩০-এর মধ্যে।

প্রতিবেদনটির তথ্য অনুসারে, বাংলাদেশে ২০১২ সালে ১০ হাজার ১৬৭ জন আত্মহত্যা করেছেন। তাদের মধ্যে ৫ হাজার ৭৭৩ জন নারী, আর পুরুষ ৪ হাজার ৩৯৪ জন।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর সারা পৃথিবীতে আট লাখেরও বেশি মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নেন। অর্থাৎ প্রতি ৪০ সেকেন্ডে পৃথিবীর কোথাও না কোথাও একজন মানুষ আত্মহত্যা করে থাকেন। এবং অগণিত মানুষ আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন। সংস্থাটির আশঙ্কা মতে, ২০২০ সাল নাগাদ প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবেন। আত্মহত্যার চেষ্টা চালাবেন এর ১০ থেকে ২০ গুণ মানুষ।

পৃথিবীর যত মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে মৃত্যুবরণ করে, তার মধ্যে ২.০৬ শতাংশ বাংলাদেশি। বাংলাদেশে প্রতিবছর লাখে ১২৮.০৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। প্রতিবছর এই সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং বাংলাদেশে প্রতিদিন গড়ে ২৮ জন মানুষ আত্মহত্যা করে। আর এই আত্মহত্যার হার শহরের চেয়ে গ্রামে ১৭ গুণ বেশি।

কেন এই আত্মহত্যা?

দীর্ঘদিন অসহনীয় শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা বা কষ্টের কারণে মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে। দীর্ঘদিন এই অসহনীয় যন্ত্রণা একসময় তারা আর সইতে না পেরে আত্মহত্যা করতে পারে। একই সাথে যদি অনেকগুলো সমস্যা এসে হাজির হয় এবং তখন ব্যক্তি সবগুলো সমস্যার সম্মিলিত চাপ যদি নিতে না পারে, তখন ব্যক্তি আত্মহত্যার চেষ্টা করতে পারে।

– আত্মহত্যার জন্য মানসিক কারণগুলোও গুরুত্বপূর্ণ। মানসিক কারণগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো আশাহীনতা। এছাড়া সারাক্ষণ নেগেটিভ চিন্তা করাও গুরুত্বপূর্ণ। যারা সর্বদা নেতিবাচক চিন্তা করতে থাকে তাদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকে।

– আত্মহত্যার জন্য সামাজিক বিভিন্ন ফ্যাক্টর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামাজিক কারণগুলোর উপর এমিল ডুরখেইম একটি গুরুত্বপূর্ণ মতবাদ দিয়েছেন। ডুরখেইম চার ধরনের আত্মহত্যার কথা বলেছেন। এগুলো মূলত দুটি সামাজিক বিষয় দ্বারা প্রভাবিত হয়। যথা- সামাজিক অন্তর্ভুক্তি (social integration) এবং সামাজিক দায়িত্ববোধ (Social Responsibility)। এই দুটি উপাদানের আধিক্য এবং অভাব দুটির কারণেই মানুষ আত্মহত্যা করতে পারে। ২৭% থেকে ৯০% এরও বেশি সময় আত্মহত্যার সাথে মানসিক সমস্যার সম্পর্ক থাকে। জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের দেয়া তথ্য মতে, বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার ৩১ শতাংশ বা প্রায় ৫ কোটি মানুষ কোন না কোন মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত।

– যে সব ব্যক্তি মাদকদ্রব্য গহণ করে বা বিভিন্ন ধরনের ড্রাগ নেয় তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি সাধারণ মানুষের তুলনায় প্রায় ১০ গুণ বেশি। আাবার যারা ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদকদ্রব্য গহণ করে তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি সাধারণ একজন মানুষের তুলনায় প্রায় ১৪ গুণ বেশি। কারণ এসব ব্যক্তি এমনিতেই মাদকদ্রব্য গ্রহণজনিত বিভিন্ন সমস্যায় ভুগতে থাকে এবং এর সাথে তাদের ব্যক্তিগত ও সমাজিক নানা সমস্যা দেখা দিলে তারা আর নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনা।

– শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ও সামাজিক বিষয়গুলো আত্মহত্যা বিষয়টিকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারে না। আত্মহত্যার সাথে বংশগতির কোন সম্পর্ক আছে কিনা তা জানার জন্য বিজ্ঞানীরা পরিবার, অভিন্ন যমজ ও পোষ্যপুত্রদের নিয়ে গবেষণা করে দেখেছেন যে, আত্মহত্যার সাথে বংশগতির একটা গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে।

– বিশ্বের ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণ-তরুণীদের আত্মহত্যার প্রধান কারণ ডিপ্রেশন। বাংলাদেশের শতকরা ১৮ থেকে ২০ ভাগ মানুষ কোনো না কোনো প্রকারের ডিপ্রেশন বা এনজাইটিতে ভুগছেন যাদের পরিবারের অনেকে হয়তো জানেন-ই না যে, তারা ডিপ্রেশনের রোগী, চিকিৎসা তো দূরের কথা। এখনো আমাদের অনেকেই আছে ডিপ্রেশন কে কোন রোগই মনে করেন না। কিংবা ডিপ্রেশন নিয়ে সচেতন না।

বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার পরিসংখ্যান আত্মহত্যার ওপর বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এক গবেষণায় দেখা গেছে, স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চল, সুইজারল্যান্ড, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, পূর্ব ইউরোপের দেশগুলো এবং জাপানে আত্মহত্যার হার সবচেয়ে বেশি (লাখে পঁচিশের ওপরে)। গত ৫০ বছরে সারা পৃথিবীতে, মূলত উন্নয়নশীল দেশগুলোতে আত্মহত্যার হার শতকরা ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

বাংলাদেশে পরিচালিত এক গবেষণায় পারিবারিক সমস্যা (৪১.২%), পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়া (১১.৮%), বৈবাহিক সমস্যা (১১.৮%), ভালোবাসায় কষ্ট পাওয়া (১১.৮%), বিবাহবহির্ভূত গর্ভধারণ ও যৌন সম্পর্ক (১১.৮%), স্বামীর নির্যাতন (৫.৯%) এবং অর্থকষ্ট (৫.৯%) থেকে রেহাই পেতে আত্মহত্যার চেষ্টা করে।

মনোচিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দিলে আত্মহত্যার হার বেড়ে যায়। সমাজে যখন বিশৃঙ্খলা তৈরি হয়, যখন মানুষ বিষণ্ণতায় ভোগে, তখন আত্মহত্যার হারও যায় বেড়ে। অনেকে আবার বাধ্য হয়েও আত্মহত্যা করে। যারা আত্মহত্যা করেন তাদের ৯৫ ভাগই কোনো না-কোনো মানসিক রোগে ভোগেন। এই মানসিক রোগের সঠিক চিকৎসা করা গেলে আত্মহত্যা কমবে। তাই অন্তত আবেগ তাড়িত আত্মহত্যা রোধ করতে স্কুল, কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত সাইকোলজিষ্টের মাধ্যমে কাউন্সিলিং করানো প্রয়োজন।ওদের বুঝানো উচিৎ আত্মহত্যা কোন কিছুর সমাধান নয়।

লেখক : ছাত্র, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকতা অধ্যয়ন বিভাগ
স্ট্যাম্ফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ

সর্বাধিক পঠিত