প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] রাজধানীতে কর্মহীন বস্তিবাসীর আর্তনাদ, শুধু হাত ধুইলেই কি পেট ভরবো, খাইতে তো হইবো

ডেস্ক নিউজ : [২] রাজধানীর কড়াইল বস্তির জামাইবাজার এলাকার ছোট্ট একটি টিনশেড ঘরে গৃহকর্মী শিউলি বেগম। তার সংসারে স্বামী, মেয়ে আর ক্যানসারে আক্রান্ত মাকে নিয়ে। করোনা ভাইরাস সংক্রমণের আশঙ্কায় ৮ দিন আগে শিউলিকে কাজে যেতে না করে দেন গৃহকর্ত্রী। এ অনিশ্চয়তার মধ্যেই বন্ধ হয়ে গেছে পেশায় ইলেকট্রিক মিস্ত্রি স্বামী কামালের রোজগারও। সূত্র:সময় নিউজ,যমুনা নিউজ, দিগন্ত নিউজ

[৩] গত বৃহস্পতিবার থেকে দেশব্যাপী অঘোষিত লকডাউনের ফলে নতুন বিপত্তিতে পড়েছে কামাল-শিউলির পরিবার। পুরো পরিবার ঘরে বন্দি। এ পর্যন্ত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো সাহায্য-সহযোগিতা পাননি। ঘরে চাল নেই। বাইরে বের হলে পুলিশের তাড়া।

[৪] গত শনিবার একবেলা শুকনো রুটি খেয়েছেন, গতকাল রোববার দুপুর পর্যন্ত উপোষ করেছে পরিবারের সবাই। স্বামী-স্ত্রী কোনোভাবে চালিয়ে নিলেও অসুস্থ মা আর শিশুসন্তানকে রাতে কী খাওয়াবেন- এ চিন্তায় চোখে অন্ধকার দেখছেন তারা।

[৫] গতকাল দুপুরে বস্তির ঘরে বসে এসব কথা বলতে বলতে শিউলির চোখ থেকে নেমে আসে জলের ধারা। তিনি বলেন, ‘করুনা (করোনা) ভাইরাসের লাইগ্যা ঘন ঘন হাত ধোওনের জন্য চারদিন আগে বস্তির মোড়ে স্যারেরা একটা ব্যাসিন বসাইছে, দুইডা সাবান দিছে। সেইডা শেষও হইয়া গেছে। শনিবার ১০ টাকা দামের এক প্যাকেট বিস্কুট দিছে হক কোম্পানি। হেরা কি বুঝে না, আমাগো পেট আছে! খালি হাত ধুইলেই কি পেট ভরবো? সাবান না দিয়া আমাগো ভাত দেন ভাই। নাইলে করুনায় না মরলেও অভুক্ত থাইকা মরতে হইবো।’

[৬] এ সময় রিকশাগ্যারেজের মালিক জামাল মিয়াসহ আরও অন্তত ৩০ বস্তিবাসী। তাদের মন্তব্যেও উঠে আসে অভিন্ন তথ্য।

[৭] শুধু রাজধানীর অন্যতম বৃহৎ এই কড়াইল বস্তিই নয়, সরকারের অঘোষিত লকডাউনের পর করোনা ভাইরাস সংক্রমণে উচ্চঝুঁকিতে থাকা অধিকাংশ বস্তির চিত্রই এমন। বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিউদ্যোগে কেউ কেউ তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে এলেও অধিকাংশ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিই হতদরিদ্র এসব বস্তিবাসীর পাশে দাঁড়াননি। অথচ কদিন আগেও ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিত এসব বস্তির মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেছেন তারা ভোট চেয়ে চেয়ে। তাদেরই ভোটে হয়েছেন জনপ্রতিনিধি।

[৮] সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) বলছে, দেশে ইতোমধ্যে সীমিত আকারে করোনা ভাইরাসের সামাজিক বা গণসংক্রমণ শুরু হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ঘনবসতির বস্তিগুলো অরক্ষিতই প্রায়। সরকারের পক্ষ থেকে করোনা রোধে হোম কোয়ারেন্টিনসহ যেসব পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, কার্যত এর কোনো কিছুই নজরে আসেনি গতকাল রাজধানীর কড়াইল বস্তি, ভাষানটেক বস্তি, চলন্তিকা বস্তিসহ (পোড়া বস্তি) কয়েকটি বস্তি ঘুরে এবং সেখানকার বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে।

[৯] করোনার সংক্রমণ ঠেকাতে নিরাপত্তা সুরক্ষা (হ্যান্ডগ্লাভস ও মাস্ক) ছাড়াই রিকশাচালক, গৃহকর্মী, পরিবহন ও দিনমজুরের কাজ করা স্বল্প আয়ের এসব বস্তিবাসী বিভিন্ন মানুষের সংস্পর্শে আসছে। থাকছে বরাবরের মতোই একসঙ্গে গাদাগাদি করে। বস্তিতে দামি ও পরিপাটি পোশাক-আশাকের কাউকে আসতে দেখলেই ‘সাহায্য এসেছে’ ভেবে তার কাছে দলবেঁধে ছুটছে প্রান্তিক এই মানুষগুলো।

[১০] স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, করোনায় সংক্রমিত হওয়ার সর্বাধিক ঝুঁকিতে রয়েছে বস্তিবাসীরা। কারণ কোয়ারেন্টিনের মতো বিষয়ে এখনো তাদের সচেতন করা সম্ভব হয়নি। সচেতন হলেও দারিদ্র্যের কশাঘাতগ্রস্ত বাস্তবতায় তা মানা সম্ভব হচ্ছে না। এহেন পরিস্থিতিতে ঘনবসতিপূর্ণ এসব বস্তি থেকে কমিউনিটি ট্রান্সমিশন শুরু হয়ে গেলে তা পুরো দেশের জন্য খুবই বিপজ্জনক হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

[১১] কড়াইল এক নম্বর ইউনিট বস্তি উন্নয়ন কমিটির সভাপতি এসএম মাহমুদুল হাসান বলেন, ঢাকা মহানগর উত্তরের ১৯ ও ২০ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কড়াইল বস্তি। ২০১৫ সালের হিসাব অনুযায়ী এ দুই ওয়ার্ডের বস্তিতে ৫৪ হাজার ৬৫৯টি পরিবারে মোট সদস্যসংখ্যা ২ লাখ ৭৩ হাজার ২৯৫ জন। এটি পাঁচ বছর আগের হিসাব। বর্তমানে বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিন লাখে দাঁড়িয়েছে। এখানে কাঠ, বাঁশ আর টিনের ছোট ছোট একেকটি খুপরিতে গাদাগাদি করে বাস করে নিম্নআয়ের মানুষ।

[১২] অলিগলিতে ছড়ানো-ছিটানো ময়লা। দুর্গন্ধময় টয়লেট। খোলা গোসলখানা, টিউবওয়েলের পাশেই দুর্গন্ধময় আবর্জনার স্তূপ। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে যে সামাজিক দূরত্বের কথা বলা হচ্ছে, কিংবা জীবাণুমুক্ত থাকতে ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে, দারিদ্র্যের কারণে এসব নির্দেশনা উপেক্ষিতই থেকে যাচ্ছে বস্তিতে। সব মিলিয়ে কড়াইল বস্তিসহ রাজধানীর অন্যান্য ঘিঞ্জি অস্বাস্থ্যকর বস্তিগুলো আছে করোনার উচ্চঝুঁকিতে।

[১৩] এসএম মাহমুদুল হাসান আরও জানান, করোনা ইস্যুতে দেশব্যাপী অঘোষিত লকডাউনের পর ৪ দিন আগে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে গোডাউন বস্তির ৪০০ পরিবারকে ২০ কেজি করে চাল, ২ কেজি ডাল, ২ কেজি তেল, ৫ কেজি আটাসহ আনুষঙ্গিক কিছু পণ্য দেওয়া হয়।

[১৪] ইউএনডিপি ও ব্র্যাকের পক্ষ থেকে হাত ধোয়ার জন্য বস্তির বৌবাজার, আনসারক্যাম্প ও ইরশাদ স্কুলের সামনে একটি করে ব্যাসিন ও দুটি করে সাবান দেওয়া হয়; কিন্তু বস্তির বিশাল জনগোষ্ঠীর অন্য সবাই এখনো সরকারের পক্ষ থেকে কিছুই পাননি। জনপ্রতিনিধিদেরও দেখা মেলেনি। ফলে অর্ধভুক্ত থেকে থেকে মানবেতর জীবন কাটছে বস্তিবাসীর। সরকারের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবানদেরও বস্তিবাসীকে মানবিক সহায়তা করতে এগিয়ে আসার জন্য আহ্বান জানান তিনি।

[১৫] ঢাকা মহানগর উত্তরের ১৯ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর মফিজুর রহমান গতকাল সন্ধ্যায় বলেন, করোনা সংক্রমণ এড়াতে ইতোমধ্যে বস্তিতে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। শুকনো খাবার ও বিস্কুট বিতরণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে চাল-ডাল ও ভারী খাবারের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

[১৬] এ বিষয়ে কথা বলতে গতকাল সন্ধ্যায় ২০ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাসিরের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ওপাশ থেকে সাড়া মেলেনি।

[১৭] অভিন্ন মন্তব্য করেন ওই বস্তির বাসিন্দা ভাষানটেক ৪ নম্বর ওয়ার্ড বস্তি উন্নয়ন সমিতির মেম্বার বজলুর রহমান, গৃহকর্মী নার্গিস, কাটা কাপড়ের ব্যবসায়ী জাহানারা ও শাহনাজ, স্বপন খালাসী। তাদের অভিযোগ, এ বস্তি থেকে কাউন্সিলর ভোট কম পেয়েছেন। তাই তাদের প্রতি সহযোগিতার হাত বাড়াননি এবং কাদের সহযোগিতা করা হবে, দেখে-বুঝে সেই তালিকা করেছেন।

[১৮] বস্তিবাসীর এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে ১৫ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সালেক মোল্লা জানান, করোনা সংক্রমণ এড়াতে ইতোমধ্যে বস্তিতে সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। প্রায় ৫০ হাজার মানুষের বসবাস এ বস্তিতে। তাদের চাল-ডাল ও ভারী খাবার? এ প্রশ্নে তিনি বলেন, ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

[১৯] গত ১১ মার্চ মিরপুরের রূপনগর ট-ব্লক বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যায় সহস্রাধিক ঘর। রাস্তায় নেমে আসে প্রায় ৪ হাজার মানুষ। এদেরই একটি অংশ আশ্রয় নিয়েছে স্থানীয় ইসলামিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বিভিন্ন কক্ষে। বিকালে সেই স্কুলে ঢুকতেই কেউ ত্রাণ নিয়ে এসেছে ভেবে এই প্রতিবেদকের ওপর হুমড়ি খেয়ে পড়েন বস্তিবাসী। তাদের ছিল না কোনো নিরাপত্তা সুরক্ষা (হ্যান্ডগ্লাভস ও মাক্স)। সরকারের পক্ষ থেকে করোনা ঠেকাতে হোম কোয়ারেন্টিনসহ নানা পদক্ষেপ নেওয়ার যে কথা বলা হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে এর কোনো কিছুই নজরে আসেনি এই বস্তিতে।

[২০] এখানকার বাসিন্দা আইয়ুব আলী, গার্মেন্টসকর্মী রহিমা, ভিক্ষুক রাশিদা, রিকশাচালক ফারুকসহ উপস্থিত অর্ধশতাধিক মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘আগুন আমাদের সব কেড়ে নিছে। এখানে এসে আশ্রয় নেওয়ার পর শুরু হলো লকডাউন। সরকারের পক্ষ থেকে কেউ আমাদের সাহায্য করেনি। এখন আমরা কী খাব? দ্রুত খাবারের ব্যবস্থা করা না হলে করোনায় না মরলেও ভাতের অভাবে আমরা মারা পড়ব। সম্পাদনা: জেরিন আহমেদ

সর্বাধিক পঠিত