প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

[১] দুর্যোগ-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনর্বাসন নিয়ে ভাবতে হবে এখনই

যুগান্তর : [২] অর্থনীতি শাস্ত্রে ‘কনজুমার্স সারপ্লাস বা ভোক্তার উদ্বৃত্ত’ বলে একটি থিওরি আছে। একজন ভোক্তা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য বা সেবা ক্রয়ের জন্য যে অর্থ খরচ করতে মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে বাজারে গিয়ে যদি তার চেয়ে কম মূল্যে পণ্যটি ক্রয় করতে পারেন তাহলে তিনি যে আত্মতৃপ্তি বা সন্তুষ্টি অর্জন করেন সেটাই ভোক্তার উদ্বৃত্ত বা কনজুমার্স সারপ্লাস।

কিন্তু ভোক্তা নির্দিষ্ট পরিমাণ পণ্য ক্রয়ের জন্য যে অর্থ ব্যয় করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকেন, বাজারে গিয়ে প্রত্যাশিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্যটি ক্রয় করতে হলে যে কষ্ট অনুভব করেন তাকে অর্থনীতির পরিভাষায় কী বলে আখ্যায়িত করা হয় তা পরিষ্কার নয়।

যিনি বা যারা ভোক্তার উদ্বৃত্ত থিওরির উদ্ভাবক তাদের দেশে হয়তো অধিকাংশ পণ্যই প্রত্যাশার চেয়ে কম মূল্যে পাওয়া যেত। তাই তারা বাজারে গিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি মূল্যে পণ্য ক্রয়ের বিষয়টি সেভাবে গুরুত্ব দেননি বা দেয়ার প্রয়োজন মনে করেননি।

[৩] বাজারে গিয়ে প্রত্যাশার চেয়ে কম ব্যয় করে পণ্য ক্রয় করতে পারাকে যদি ভোক্তার উদ্বৃত্ত বা কনজুমার্স সারপ্লাস বলা হয় তাহলে বাজারে গিয়ে প্রত্যাশিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ক্রয় করার অবস্থাকে কনজুমার্স ডেফিসিট বা ভোক্তার ঘাটতি বলা যেতে পারে।

আমাদের দেশের অর্থনীতি এমনই যে এখানে ভোক্তাদের প্রতিনিয়তই প্রত্যাশিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে পণ্য ক্রয় করে মানসিক যন্ত্রণার শিকার হতে হয়। ফলে কনজুমার্স সারপ্লাস বা ভোক্তার উদ্বৃত্তের সুখস্মৃতি লাভ করা তাদের পক্ষে প্রায়শই সম্ভব হয় না।

বিশেষ করে বিভিন্ন দুর্যোগের সময় ব্যবসায়ীদের অনেকেই পরিকল্পিতভাবে পণ্য ও সেবা মূল্য অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টির চেষ্টা করেন। এতে নির্দিষ্ট আয়ের খেটে খাওয়া মানুষকে মারাত্মক দুর্ভোগের শিকার হতে হয়।

[৪] আমাদের দেশে একশ্রেণির ব্যবসায়ী আছেন যারা সুযোগ পেলেই পণ্য মূল্য বৃদ্ধি করে জনদুর্ভোগ সৃষ্টিতে খুবই পারঙ্গম।

বর্তমানে বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ চলছে। চীন থেকে এ ভয়াবহ ভাইরাসের উৎপত্তি হলেও ইতিমধ্যেই তা সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে ইউরোপীয় শীতপ্রধান দেশগুলোয় এ ভাইরাসের সংক্রমণ সবচেয়ে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

২৩ মার্চ পর্যন্ত বিশ্বে করোনাভাইরাসে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল সাড়ে তিন লাখের মতো এবং মৃতের সংখ্যা ১৫ হাজার অতিক্রম করে গেছে। করোনাভাইরাস সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে ইতালিতে। এ পর্যন্ত দেশটিতে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক মানুষ মারা গেছে।

নানা কারণেই বাংলাদেশে এ ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করার আশঙ্কা রয়েছে। বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যেই করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকাতে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন। করোনাভাইরাসের সংক্রমণকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে তা প্রতিরোধে চেষ্টা চালানো হচ্ছে।

বাংলাদেশে এ ভাইরাস সংক্রমিত হচ্ছে প্রধানত বিদেশ প্রত্যাগত বাংলাদেশীদের মাধ্যমে। করোনাভাইরাস যাতে দ্রুত সংক্রমিত হতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের জনসমাবেশ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। জন চলাচল সীমিত করা হয়েছে।

[৫] স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। এমনকি সুপার মার্কেট ও ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলোকেও বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। বাংলাদেশে এখনও করোনাভাইরাস সংক্রমণ মারাত্মক আকার ধারণ করেনি।

আগামীতে এই সংক্রমণ কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করবে তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে করোনাভাইরাসের অজুহাতে একশ্রেণির অসৎ ব্যবসায়ী নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধির মাধ্যমে ফায়দা লুটে নেয়ার অপতৎপরতায় লিপ্ত রয়েছেন।

[৬] বাজারে প্রতিটি পণ্যের বিপুল সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও তারা করোনাভাইরাসের অজুহাতে বিভিন্ন দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি করে চলেছেন। সরকার নানাভাবে বাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে। বিশেষ করে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণের একটি উদ্যোগও লক্ষ করা যাচ্ছে।

কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরা অভিযান চালালে বাজার পরিস্থিতি খারাপ হওয়ার আশঙ্কাও থেকে যায়। বাজার নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত বিভাগের মাধ্যমেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগ নিতে হবে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক অবস্থার সৃষ্টি করেছে বাজারে প্রচলিত এক ধরনের গুজব। আগামীতে টাকা দিয়েও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পাওয়া যাবে না- একটি মহল পরিকল্পিতভাবে এ ধরনের গুজব ছড়িয়ে দিচ্ছে। অনেকেই তাদের প্রচারণায় বিভ্রান্ত হয়ে প্রয়োজনের অতিরিক্ত পণ্য সামগ্রী ক্রয় করছেন।

[৭] সরকারিভাবে যদিও বলা হচ্ছে, দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে পণ্য সামগ্রী মজুদ আছে; কাজেই আতঙ্কিত হয়ে বেশি করে পণ্য কিনে রাখার কোনো প্রয়োজন নেই। এটা অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যেতে পারে যে, বর্তমানে দেশে পর্যাপ্ত পরিমাণে চাল-ডালের মজুদ আছে।

গত ৪-৫ বছর দেশে বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হওয়ার কারণে বাম্পার ফলন হয়েছে। খাদ্য গুদামগুলোয় প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। কাজেই আতঙ্কিত হওয়ার কিছু নেই।

[৮] এখানে একটি বিষয় মনে রাখতে হবে, দেশে প্রচুর পরিমাণে খাদ্যশস্যের মজুদ থাকার পরও সঠিক ব্যবস্থাপনার অভাবে খাদ্যাভাব দেখা দিতে পারে।

কাজেই এখন থেকেই খাদ্য ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। এ ছাড়া কোনো মহল যাতে গুজব ছড়িয়ে খাদ্য পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি করতে না পারে তা নিশ্চিত করার জন্য যে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

করোনাভাইরাসের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইতোপূর্বে বিভিন্ন অর্থনৈতিক পূর্বাভাসে বলা হয়েছিল, এ বছর বিশ্ব জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে আড়াই শতাংশের মতো। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে প্রবৃদ্ধি শূন্য দশমিক ৯ শতাংশে নেমে আসতে পারে।

[৯] দ্বিতীয় বৃহত্তম বিশ্ব অর্থনৈতিক শক্তি চীনের প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। আগে বলা হয়েছিল, চীনের প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। বিশ্বব্যাপী শেয়ারবাজারে প্রচণ্ড রকম ধস নেমেছে।

সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ এবার মারাত্মকভাবে কমে যেতে পারে। আমরা হয়তো অচিরেই এ ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ অবস্থা থেকে মুক্তি পাব। কিন্তু করোনাভাইরাসের সংক্রমণের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে ক্ষতি হয়েছে তা সামাল দেয়া বেশ কঠিনই হবে।

[১০] রিয়েল সেক্টরের উৎপাদন প্রচণ্ড রকমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। শিল্প উৎপাদন কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে রয়েছে। কৃষি উৎপাদনও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পর্যটন, হোটেল ব্যবসায়ের মতো সেবাধর্মী খাতগুলো বিপর্যস্ত অবস্থায় রয়েছে। গত অর্থবছরে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো রেকর্ড পরিমাণ ৪ হাজার কোটি মার্কিন ডলারের বেশি পণ্য রফতানি আয় করেছিল।

কিন্তু এবার সেই রফতানির পরিমাণ মারাত্মকভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ করোনাভাইরাসের কারণে তৈরি পোশাকশিল্পসহ অন্যান্য শিল্পে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাপকভাবে।

বাংলাদেশ তৈরি পোশাক উৎপাদক ও রফতানিকারকদের সমিতির একটি সূত্র মতে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ক্রেতারা তাদের অর্ডার বাতিল করতে শুরু করেছে।

[১১] ইতিমধ্যেই তারা ১ দশমিক ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের ক্রয়াদেশ বাতিল করেছে। নতুন করে কোনো ক্রয়াদেশ আসছে না। পর্যটন, পরিবহন, হোটেল ব্যবসায়ের মতো সেবামূলক খাতের অবস্থা বর্তমানে খুবই খারাপ।

এ খাতগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ত হাজার হাজার শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন। ব্যক্তিমালিকানাধীন অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান ও শিল্প-কারখানা ছুটি দেয়া হয়েছে। ছুটিকালীন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পুরোপুরি দেয়া হবে কিনা তা এখনও নিশ্চিত নয়।

যারা দিন এনে দিন খায় তাদের অবস্থা আরও খারাপ হয়ে পড়েছে। কারখানা মালিকরা তাদের শ্রমিকদের কাজে নিযুক্ত না রেখে কতদিন বেতন-ভাতা দেবেন? তাহলে তারা মারাত্মকভাবে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হবেন।

[১২] আবার তারা যদি শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ছাড়াই ছুটি দেন অথবা কর্মচ্যুত করেন তাহলে শ্রমিকদের দুর্ভোগের সীমা থাকবে না। দেশের বেশিরভাগ এলাকায়ই চায়ের দোকান বা এ ধরনের ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।

ফলে ছোট ছোট ব্যবসায়ীদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। কারখানা মালিকদের প্রয়োজনীয় ভর্তুকি দিয়ে হলেও তাদের প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

করোনাভাইরাস সংক্রমণজনিত দুর্যোগ একদিন কেটে যাবে। কিন্তু দুর্যোগ পরবর্তী আর্থিক পুনর্বাসন নিয়ে আমাদের এখনই ভাবতে হবে। করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে অধিকাংশ মানুষের কর্মক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে।

[১৩] তারা চাইলেই তাদের পূর্ণ কর্মক্ষমতা কাজে লাগাতে পারছেন না। এ ছাড়া যে কতদিন এ দুর্যোগ চলতে থাকবে তারা কাজের সংকুলান করতে পারবে না। এভাবে আরও এক বা দুই মাস চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ব্যাপকভাবে হ্রাস পাবে। সেই অবস্থায় বাজারে প্রচুর পরিমাণ খাদ্যশস্য থাকলেও সাধারণ মানুষের পক্ষে তা ক্রয় করা সম্ভব হবে না।

কাজেই বাজারে পণ্যমূল্য যাতে স্বাভাবিক থাকে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতা যাতে হ্রাস না পায় তার ব্যবস্থা করতে হবে। প্রয়োজনে এখনই বিদেশ থেকে অতিরিক্ত খাদ্য আমদানি করে নিরাপদ মজুদ গড়ে তোলা যেতে পারে।

[১৪] যে কোনো দুর্যোগ-পরবর্তী খাদ্য ব্যবস্থাপনা একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। কোনো কারণেই যেন সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহের সৃষ্টি না হয় যে, তারা বাজারে গেলে খাদ্য ক্রয় করতে পারবেন না।

এ ছাড়া যে কোনো গুজব নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। কারণ গুজব বাজারকে যে কোনো সময় অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে। আর যারা অসৎ ব্যবসায়ী তাদের কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে।

[১৫] অসৎ ব্যবসায়ীরা সব সময়ই সুযোগের সন্ধানে থাকে। তারা সুযোগ পেলেই দ্রব্যমূল্য বাড়িয়ে দিয়ে ফায়দা লুটে নিতে চাইবে। এ জন্য বাজার নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, দুর্যোগের মোকাবেলার চেয়ে দুর্যোগ-পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেয়াটাই বেশি কঠিন।

এম এ খালেক : অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংকার ও অর্থনীতিবিষয়ক কলাম লেখক

সর্বাধিক পঠিত