প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কী ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের আইনি/বেআইনি, প্রকাশ্য/অপ্রকাশ্য সেন্সরশিপ থাকে তা সহজেই বোধগম্য

আলী রীয়াজ : বাংলাদেশ সরকার দেশের তিরিশটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে মনিটরিং করার জন্য ১৫ জন সরকারি কর্মকর্তাকে ক্ষমতা প্রদান করে কথিত মনিটরিং সেল গঠনের যে ঘোষণা দিয়েছিলো তা বাতিল করে দিয়েছে। এই বাতিলের ঘোষণায় অনেকেই স্বস্তি প্রকাশ করছেন এবং এই নিয়ে ঠাট্টা তামাশাও করছেন। অধিকাংশের মন্তব্যে এই ধরনের সিদ্ধান্ত কারা নেয়, কেন নেয় বা যারা নেয় তারা কতোটা ‘নির্বোধ’ এমন ধরনের কথাবার্তাই বলা হচ্ছে। ক্ষোভটা হচ্ছে কেন অগ্রপশ্চাদ না ভেবে এই ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে, আবার বাতিল করা হচ্ছে। এই ধরনের আলোচনায় প্রায় কেউই প্রশ্ন তুলছেন না এই ধরনের প্রত্যক্ষ সেন্সরশিপের হুমকি দেওয়ার রাজনৈতিক পটভূমি কী। যারা এই সিদ্ধান্তে স্বস্তিবোধ করছেন তারা জানেন যে, লিখিতভাবে এই ধরনের মনিটরিং ব্যবস্থার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করা হলেও অবস্থার কোনো হেরফের হবে না, সাবেক একজন সচিবের ফেসবুকে দেওয়া এই মন্তব্য যথেষ্টÑ ‘গণমাধ্যম ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা হয়, হচ্ছে’। মনিটরিংয়ের এই ঘোষণা দেওয়া হয়েছিলো করোনাভাইরাসকে উপলক্ষ করে। বলা হয়েছিলো যে, গণমাধ্যমে করোনাভাইরাস সংক্রান্ত গুজব এবং অপপ্রচার রোধ করার জন্য এই সেল গঠন করা হয়েছে। বাংলাদেশে গণমাধ্যমের উপরে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সেন্সরশিপের উপস্থিতি নতুন নয়। গত ছয়-সাত বছর ধরে পুরো মাত্রায় বহাল আছে। প্রাতিষ্ঠানিক সেন্সরশিপের প্রয়োগ ছিলো অদৃশ্য। যার পরিণতিতে সেলফ সেন্সরশিপের চর্চা বিস্তার লাভ করেছে এবং স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। কোনো কোনো সাংবাদিক/সম্পাদক তা প্রকাশ্যেই বলেছেন। এই সরকারি প্রজ্ঞাপন কেবল বিরাজমান ব্যবস্থার আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দিয়েছিলো। করোনাভাইরাসকে উপলক্ষ করে সরকার এই ধরনের ব্যবস্থা নেবে সেটা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ২৫ মার্চের ভাষণেই ইঙ্গিত ছিলো। ভয়েস অব আমেরিকার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘ঘাতক ব্যাধি করোনাভাইরাস নিয়ে যারা গুজব ছড়াচ্ছেন তাদের সতর্ক করে দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
ফলে এখন এই ঘোষণা বাতিলে যে সব সাংবাদিক তাদের বিজয় দেখতে পাচ্ছেন তারা কার্যত এবং প্রকারান্তরে অপ্রকাশ্য ‘মনিটরিং’, যাকে সেন্সরশিপ ছাড়া আর কিছু বলা শব্দের খেলা মাত্র, তার প্রতি আস্থা রাখছেন। কী ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে এই ধরনের আইনি/বেআইনি, প্রকাশ্য/অপ্রকাশ্য সেন্সরশিপ থাকে তা সহজেই বোধগম্য। সেই রাজনীতি অবশ্যই গণতান্ত্রিক নয়। অনেক মিডিয়া থাকলেই তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বোঝায় না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, মিডিয়ার স্বাধীনতা এমন কোনো বিষয় নয় যে তা রাজনীতির বাইরে থেকে অর্জন করা যাবে। গণতন্ত্র অনুপস্থিত কিন্তু মিডিয়া স্বাধীন এমন দেশের সন্ধান এখনো পাওয়া যায়নি। এই প্রজ্ঞাপন বিষয়ে সাংবাদিকদের কারও কারও প্রতিক্রিয়া দেখে উদ্বেগের মাত্রা বাড়ে। কোনো কোনো সাংবাদিক লিখেছেন যে, গণমাধ্যমের বিরুদ্ধে যেহেতু গুজবের বা অপপ্রচারের অভিযোগ উঠেনি সেহেতু এই ধরনের মনিটরিংয়ের দরকার নেই, কিন্তু তার ভাষ্য অনুযায়ী ‘সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেক গুজব ছড়ানো হচ্ছে’। এই ধরনের কথাবার্তা বিপজ্জনক। এটি প্রকারান্তরে সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণের একধরনের খোলামেলা আমন্ত্রণ। অন্যদিকে এটাই বলা যে, অভিযোগ উঠলেই এই ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ বৈধ। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে বিরাজমান ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের আওতায় কয়েকজনকে এই ধরনের অভিযোগে আটক করা হয়েছে। এই অ্যাক্টের ভয়াবহতা বিষয়ে আমরা জানি, সেখানে এই ধরনের পরামর্শ যারা দিচ্ছেন তারা কী বলতে চান তা আশা করি দুর্বোধ্য নয়। কেবল একটি প্রজ্ঞাপন বাতিলে আনন্দিত না হয়ে, সব ধরনের ‘মনিটরিংয়ের’Ñ প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্যÑ বিরুদ্ধে দাঁড়ান, যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় অবধারিতভাবেই মিডিয়ার স্বাধীনতা থাকবে না তার পক্ষে কথা বলে কেবল একটি প্রজ্ঞাপনের জন্য আমলাদের শাপশাপান্ত করে লাভ নেই। কালকে ভিন্নভাবে এই প্রজ্ঞাপন জারি হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কিংবা না জারি করলেই কিÑ আমরা তো জানি, ‘গণমাধ্যম ২৪ ঘণ্টা মনিটর করা হয়, হচ্ছে’। ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত