প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

নুসরাত হত্যাকাণ্ড: অভিযুক্তদের কার কী ভূমিকা

সুজন কৈরী : সোনাগাজীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান রাফিকে পুড়িয়ে হত্যার ঘটনায় মোট ১৬ জনকে আসামি করে আদালতে জমা দেয়ার জন্য চার্জশিট (অভিযোগপত্র) চ‚ড়ান্ত করেছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। চার্জশিটটি আজ বুধবার আদালতে দাখিল করা হচ্ছে। এতে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাকে হত্যার হুকুমদাতা হিসেবে আসামি করা হয়েছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর ধানমন্ডিতে সদর দফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পিবিআইয়ের প্রধান ডিআইজি বনজ কুমার মজুমদার বলেন, নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার ঘটনায় সরাসরি পাঁচজনের জড়িত থাকার বিষয়ে তারা নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওই পাঁচজন এবং সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ মোট ১৬ জনকে আসামি করে বুধবার আদালতে এই অভিযোগপত্র দাখিল করা হবে। ৭২২ পৃষ্ঠার চার্জশিটে ১৬ জনের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড চাওয়া হবে। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পুলিশ পরিদর্শক শাহ আলম তদন্ত প্রতিবেদনে যাদের আসামি করছেন, তাদের সবাই গ্রেফতার হয়েছেন। তাদের মধ্যে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলাসহ ১২ জন আদালতে ১৬৪ ধরায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন।

পিবিআই প্রধান বলেন, নুসরাতকে হত্যার হুমকিদাতা হিসেবে অভিযোগপত্রে অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার নাম আসামির তালিকার ১ নম্বরে। এছাড়া ওই মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন এবং সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম ওই হত্যাকাণ্ড বাস্তবায়নে আর্থিক সহযোগিতাসহ বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন বলে চার্জশিটে উল্লেখ থাকছে। সেখানে বলা হচ্ছে- তদন্তে মোট ১৬ জন আসামির বিরুদ্ধে নুসরাত জাহান রাফিকে অগ্নিদগ্ধ করে হত্যা করা এবং হত্যার পরিকল্পনায় অংশগ্রহণ ও হত্যাকাণ্ডে সহযোগিতার অপরাধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ (সংশোধিত ২০০৩) এর ৪(১) ও ৩০ ধারায় অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে।

আসামি হচ্ছেন যে ১৬ জন : সোনাগাজীর ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা, নূর উদ্দিন, শাহাদাত হোসেন শামীম, সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মাকসুদ আলম, সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের, জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন জাবেদ, হাফেজ আব্দুল কাদের, আবছার উদ্দিন, কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা ওরফে পপি ওরফে তুহিন ওরফে শম্পা ওরফে চম্পা, আব্দুর রহিম শরীফ, ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন, মোহাম্মদ শামীম, মাদ্রাসার গভর্নিং বডির সহসভাপতি স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা রুহুল আমীন ও মহিউদ্দিন শাকিল। তাদের মধ্যে নুসরাতের তিন সহপাঠী কামরুন নাহার মনি, উম্মে সুলতানা পপি ও জাবেদ হোসেন ছাড়াও শাহাদাত হোসেন ও জোবায়ের আহমেদ হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেন বলে আসামিদের জবানবন্দি ও পিবিআইয়ের তদন্তে উঠে এসেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মোট চারটি গ্রæপে ভাগ হয়ে আসামিরা কাজ করেছে। নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়ার পর তার তিন সহপাঠী পরীক্ষার হলে ঢুকে ঠাণ্ডা মাথায় আলিম পরীক্ষাও দিয়েছে।

নুসরাত হত্যায় কার কী ভ‚মিকা : সিরাজ-উদ-দৌলা: সরাসরি অংশ না নিলেও হত্যাকাণ্ডের চেয়ে বেশি করেছেন। নুসরাতের যৌন হয়রানির মামলা তুলে নিতে চাপ প্রয়োগ করেন। তাতে কাজ না হলে নুসরাতকে ভয়-ভীতি দেখানো এবং প্রয়োজনে নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন তিনি। কিভাবে হত্যা করতে হবে তারও নির্দিষ্ট দিকনির্দেশনাও দেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ- দৌলা। পুড়িয়ে হত্যার পর আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার পরামর্শও দেন তিনি। নুর উদ্দিন হত্যাকাণ্ডের আগে বোরখা রাখা কক্ষটি পরিদর্শন করেন। ঘটনার সময় ভবনের নিচের পরিস্থিতিটা খুব চাতুরতার সঙ্গে সামলান। পুরোটা সময় নাটকের মতো চিত্রায়ন করতে সহায়তা করেন। শাহাদাত হোসেন শামীম হত্যাকাণ্ডের আগে পরিকল্পনার বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন। কার কী করণীয়, তার পুরো পরিকল্পনা সাজান তিনি। কাউন্সিলর মাকসুদের কাছ থেকে ১০ হাজার টাকায় বোরখা ও কেরোসিন কেনা হয়। তার জবানবন্দি অনুযায়ী পরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত বোরখা ও নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালতে ব্যবহৃত গ্যাস উদ্ধার করা হয়। মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ কাউন্সিলর ২৮ মার্চ সিরাজের মুক্তির দাবিতে মানববন্ধনে অংশ নেন। শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে না থাকলে আইসিটি পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়ার হুমকি দিতে সংশ্লিষ্টদের পরামর্শ দেন। হত্যাকাণ্ডের জন্য তিনি ১০ হাজার টাকা দেন। ঘটনার সবকিছু জানলেও ঘটনার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে ফেনীতে ছিলেন। সাইফুর রহমান মোহাম্মদ জোবায়ের ঘটনাস্থলে নুসরাতকে শোয়ানোর পর পা বাঁধেন। নুসরাতের শরীরে কেরোসিন ঢালার পর শামীমের নির্দেশে নিজের সঙ্গে থাকা ম্যাচ দিয়ে আগুন ধরান। জাবেদ হোসেন ওরফে সাখাওয়াত হোসেন নুসরাতের গায়ে কেরোসিন ঢালেন। নুসরাতকে আগুন ধরিয়ে দিয়ে খুবই ঠান্ডা মাথায় পরীক্ষার হলে চলে যান। পরে চিৎকার শুনে ছুটে এসে নুসরাতকে দেখতে যান। এমনভাব করেন যেন কিছু জানেন না। হাফেজ আব্দুল কাদের নুসরাতের ভাই নোমানের বন্ধু। ঘটনার সময় মেইন গেটের বাইরে পাহাড়ায় ছিলেন। নুসরাত পরীক্ষার হলে ঠিকমতো পৌঁছেছে কি না, ভাই নোমান দেখতে চাইলে কাদের তাকে বাধা দেন। কাদেরের কাছে নুসরাতের বিষয় জানতে চাইলে কাদের জানান, ২ মিনিট পর জানাচ্ছি। পরে তিনি জানান, নুসরাত গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছে। আবছার উদ্দিন ঘটনার সময় গেট পাহাড়ার দায়িত্বে ছিলেন। ঘটনার কিছুক্ষণ আগেও আগের মামলার বাদীকে ফোন করে মামলা তুলে নিতে চাপ দেন। কামরুন নাহার মনিকে শামীম ২ হাজার টাকা দিয়ে বোরখা ম্যানেজ করতে বলেন। ওই টাকায় ২টি বোরখা ও হাত মোজা কেনেন। কেনা ২টি বোরখাসহ তার নিজের কাছ থেকে একটি মিলিয়ে মোট তিনটি বোরখা ওই ভবনের তৃতীয় তলায় রেখে আসেন। ছাদে ওঠানোর পর নুসরাতকে শুইয়ে ফেলতে সহায়তা করেন এবং বুকের উপর চাপ দিয়ে ধরে রাখেন। ঘটনার পর ঠান্ডা মাথায় এসে তিনিও পরীক্ষায় অংশ নেন। উম্মে সুলতানা ওরফে পপি নুসরাতকে ছাদে ওঠানোর পর মামলা তুলে নিতে প্রথমে চাপ দেন। রাজি না হওয়ার নুসরাতের গায়ে ওড়নাটি বের করেন পপি। এরপর ওড়নাটি ২ ভাগ করে দেন, যা দিয়ে নুসরাতে হাত ও পা বাঁধা হয়। নুসরাতের হাত পেছন দিয়ে বাঁধার পর কেরোসিন ঢালার গ্যাসটি নুসরাতের হাতে ধরিয়ে দেয়। যাতে বোঝা যায় নুসরাত আত্মহত্যা করেছে। আব্দুর রহিম শরীফ বাইরের গেটে পাহারায় ছিলেন। নুসরাতের ভাই ভেতরে ঢুকতে চাইলে বাধা দেন। ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন ওরফে মামুন ও মহিউদ্দিন শাকিল গেটে পাহারায় ছিলেন। সবকিছু স্বাভাবিক বুঝাতে যা যা করণীয় তা করছিলেন তারা। মোহাম্মদ শামীম প্রথমে পপির সঙ্গে ভবনটির গেটে পাহারায় ছিলেন। যাতে কেউ সে সময় ভবনে উঠতে না পারে এবং এর ফলে অন্য কাউকে খুন করতে না হয় সেজন্য সতর্ক ছিলেন। রুহুল আমিন ঘটনার পর মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সহ-সভাপতি হিসেবে পুলিশ-প্রশাসন সবকিছু ম্যানেজ করার আশ্বাস দেন। হত্যাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে প্রয়োজনীয় সবকিছু করেন। ঘটনার পর শামীমের সঙ্গে দুই দফা ফোনে কথা বলে সবকিছু নিশ্চিত হন।

যেভাবে শুরু : নুসরাত জাহান রাফির অভিযোগ ও তার মায়ের দায়ের করা মামলায় অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা গ্রেফতার হলে তার অনুগতরা ক্ষিপ্ত হয়। গত ১ এপ্রিল আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম, নুরু উদ্দিন, ইমরান, হাফেজ আব্দুল কাদের ও রানা সিরাজের সঙ্গে জেলখানায় দেখা করেন। তখন সিরাজ নিজের মুক্তির বিষয়ে জোর চেষ্টা চালাতে ও মামলা তুলে নিতে নুসরাতের পরিবারকে চাপ দিতে তাদের নির্দেশ দেন। হুমকি ও ভয়ভীতি দেখানোর পরও মামলা না তুললে আসামিরা নুসরাতের ওপর ক্ষুব্ধ হয়। এছাড়া, শাহাদাত হোসেন শামীম এ ঘটনার আগে নুসরাতকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হয়ে ক্ষুব্ধ ছিলেন।

পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা : এই প্রেক্ষাপটে শাহাদাত হোসেন শামীম কাউন্সিলর মাকসুদ ও রুহুল আমিনের সঙ্গে আলোচনা করে নুসরাতকে ভয়ভীতি দেখানো ও প্রয়োজনে আগুনে পুড়িয়ে মারার পরিকল্পনা করে। কাউন্সিলর মাকসুদ এ কাজে শাহাদাত হোসেনকে ১০ হাজার টাকা দেন। এই টাকা দিয়ে শাহাদাত হোসেন শামীম পরিকল্পনা অনুযায়ী তার দূর সম্পর্কের ভাগ্নি কামরুন্নাহার মনিকে দিয়ে দুটি বোরকা ও চার জোড়া হাতমোজা কেনান। ৩ এপ্রিল শাহাদাত হোসেন শামীম, নুরুদ্দিন, হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ কয়েকজন জেলখানায় সিরাজের দেখা করে। তখন সিরাজ তাদের নির্দেশ দেয় নুসরাতকে ভয়ভীতি দেখানো ও প্রয়োজনে পুড়িয়ে হত্যার। সেইসঙ্গে হত্যার পর ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দেয়ার নির্দেশও দেন তিনি। পরিকল্পনা অনুযায়ী ৪ এপ্রিল বিকেল ৩টার দিকে মাদ্রাসার পাশের টিনশেড কক্ষে আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম, নুরুউদ্দিন, জোবায়ের, জাবেদ, পপি ও কামরুন্নাহারসহ আরো কয়েকজন বৈঠকে বসে এবং নুসরাতকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। ওইদিনই রাত সাড়ে ৯টার দিকে মাদ্রাসার ছাত্রদের হোস্টেলে নুসরাতকে হত্যার বিষয়ে আবারও আলোচনা করে তারা। সে অনুযায়ী ৫ এপ্রিল বিকেল ৫টায় ভ‚ইয়া বাজার থেকে আসামি শাহাদাত হোসেন শামীম এক লিটার কেরোসিন তেল কিনে নিজের কাছে রেখে দেয়।

ঘটনার দিন : ৬ এপ্রিল নুসরাতের গায়ে আগুন দেয়া হয়। ওইদিন সকাল ৭টা থেকে সাড়ে ৭টার দিকে শাহাদাত, নুরুদ্দিন, হাফেজ আব্দুল কাদের মাদ্রাসা চত্বরে যান। পরিকল্পনা অনুযায়ী সকাল ৮টা থেকে ৯টা ২০ মিনিটের মধ্যে আসামিরা যার যার অবস্থানে চলে যায়। শাহাদাত হোসেন শামীম পলিথিনে করে আনা কেরোসিন ও অধ্যক্ষের কক্ষের সামনে থেকে একটি কাচের গøাস নিয়ে ছাদের বাথরুমের পাশে রেখে দেয়। কামরুন্নাহার মনির কেনা দুটি ও বাড়ি থেকে নিয়ে আসা আরেকটিসহ মোট ৩টি বোরকা ও ৪ জোড়া হাতমোজা সাইক্লোন সেন্টারের তৃতীয় তলায় নিয়ে রাখা হয়। শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ ও জোবায়ের সকাল সাড়ে ৯টার দিকে বোরকা ও হাতমোজা পরে তৃতীয় তলায় গিয়ে অবস্থান নেন। নুসরাত পরীক্ষা দিতে আসলে পরিকল্পনা অনুযায়ী আসামি উম্মে সুলতানা পপি গিয়ে তাকে বলে, তার (নুসরাতের) বান্ধবীকে মারধর করা হচ্ছে। নুসরাত দৌড়ে পরীক্ষা কক্ষে গিয়ে তার ফাইল রেখে ছাদের দিকে যান। দ্বিতীয় তলায় পৌঁছালে উম্মে সুলতানা পপি অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে বলে নুসরাতকে এবং ভয়ভীতি দেখায়। নুসরাত মামলা তুলবেন না বলতে বলতে পপির সঙ্গে ছাদে ওঠেন। আসামি কামরুননাহার মনি, শাহাদাত হোসেন শামীম, জোবায়ের ও জাবেদ পেছনে পেছনে ছাদে যায়। এরপর তারা নুসরাতকে মামলা তুলে নিতে হুমকি দেয় ও কয়েকটি কাগজে সই দিতে বলে। নুসরাত সই দিতে অস্বীকৃতি জানালে আসামিরা ক্ষিপ্ত হয়। পিবিআইয়ের তদন্তে জানা যায়, শাহাদাত হোসেন শামীম বাম হাত দিয়ে নুসরাতের মুখ চেপে ধরে এবং ডান হাত দিয়ে নুসরাতের হাত পেছন দিকে নিয়ে যায়। উম্মে সুলতানা পপি নুসরাতের গায়ের ওড়না খুলে জোবায়েরকে দেয়। জোবায়ের ওড়নাটি ছিঁড়ে দুভাগ করে ফেলে। পপি ও মনি ওড়নার এক অংশ দিয়ে নুসরাতের হাত তার শরীরের পেছন দিকে নিয়ে বেঁধে ফেলে। জোবায়ের ওড়নার অন্য অংশ দিয়ে নুসরাতের পা বাঁধে। আসামি জাবেদ পায়ে গিট দেয়। এরপর সবাই মিলে নুসরাতকে ছাদের ফ্লোরে ফেলে দেয়। শাহাদাত এ অবস্থায় নুসরাতের মুখ ও গলা চেপে রাখে। নুসরাতের বুকের ওপর চাপ দিয়ে ধরে রাখে কামরুন নাহার মনি। আর নসরাতের পা চেপে ধরে উম্মে সুলতানা পপি ও জোবায়ের। জাবেদ পাশের বাথরুমে লুকিয়ে রাখা কেরোসিনের পলিথিন থেকে কাচের গøাসে কেরোসিন ঢেলে নেয়। এরপর নুসরাতের সারা শরীরে ঢেলে দেয়। এবার শাহাদাতের ইশারায় জোবায়ের দেয়াশলাই দিয়ে নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়।

ঠাÐা মাথায় আসামিরা পালিয়ে যায় : নুসরাতের গায়ে আগুন ধরিয়ে দেয়ার পর জোবায়ের প্রথমে ছাদ থেকে নেমে যায়। এরপর নামে উম্মে সুলতানা পপি। তখন কামরুন নাহার মনি পরিকল্পনা অনুযায়ী পপিকে ‘কাম কাম চম্পা/শম্পা’ বলে ডাক দিয়ে নিচে নেমে যায়। কামরুন নাহার মনি ও উম্মে সুলতানা পপি নিচে নেমে পরীক্ষার হলে ঢুকে যায়। আসামি জাবেদ ও শাহাদাত হোসেন শামীম সাইক্লোন সেন্টারের তৃতীয় তলায় গিয়ে বোরকা খুলে ফেলে। জাবেদ তার বোরকাটি শাহাদাতকে দিয়ে দ্রুত নেমে গিয়ে পরীক্ষার হলে ঢোকে। শাহাদাত হোসেন শামীম ছাদ থেকে নেমে মাদ্রাসার বাথরুমের পাশ দিয়ে চলে যায় এবং মাদ্রাসার পুকুরে বোরকাটি ফেলে দেয়। জোবায়ের সাইক্লোন সেন্টারের ছাদ থেকে নেমে মাদ্রাসার মূল গেট দিয়ে বের হয়ে যায় এবং তার বোরকা ও হাতমোজা সোনাগাজী কলেজের ডাঙ্গি খালে ফেলে দেয়। নুরুউদ্দীন সাইক্লোন সেন্টারের নিচে থেকে পুরো ঘটনাটি তদারকি করে। এছাড়া মহিউদ্দীন শাকিল ও মোহাম্মদ শামীম সাইক্লোন সেন্টারের দুই সিঁড়ির সামনে পাহারায় থাকে। মাদ্রাসার মূল গেটের পাশে ইফতেখার উদ্দিন রানা, ইমরান হোসেন মামুন, আব্দুর রহিম শরীফ ও হাফেজ আব্দুল কাদের পাহারায় ছিল। নুসরাতের গায়ে আগুন লাগানোর পর আসামিরা নিরাপদ স্থানে সরে গিয়ে ঘটনাটিকে আত্মহত্যা বলে বিভিন্নভাবে প্রচারণা চালায়।

আগুন নেভান পুলিশ কনস্টেবল ও নাইটগার্ড : আগুনে দগ্ধ হওয়ার কারণে নুসরাত নিচে নেমে আসার অবস্থায় ছিলেন না। তার হাত-পা বাঁধা ছিল। আগুনে বাঁধন পুড়ে যাওয়ার পর সিঁড়ি দিয়ে তিনি নিচে নেমে আসেন। তখন কর্তব্যরত পুলিশ কনস্টেবল ও নাইটগার্ড তার গায়ের আগুন নেভান। ওই সময় আসামি নুরুউদ্দীনও ভালো সাজার জন্য নুসরাতের গায়ে পানি দেয়। আসামি হাফেজ আব্দুল কাদের নুসরাতের ভাই নোমানকে ফোনে সংবাদ দেয়। পরে নুসরাতকে চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে নেয়া হয়। নুসরাত ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুকালীন জবানবন্দি দেন।

পিবিআইয়ের দায়িত্ব গ্রহণ : গত ১০ এপ্রিল নুসরাত নিহতের ঘটনার তদন্তভার গ্রহণ করে পিবিআিই। মামলার এজাহারনামীয় আসামি কাউন্সিলর মাকসুদ আলম ওরফে মোকসুদ আলমকে ১১ এপ্রিল গ্রেফতার করা হয়। পরদিন ১২ এপ্রিল এজাহারনামীয় ২ আসামি নুরুউদ্দিন ও জাবেদ হোসেনকে গ্রেফতার করা হয়। ১৩ এপ্রিল এজাহারনামীয় আসামি শাহাদাত হোসেন শামীমকে গ্রেফতার করা হয়। পরে এজাহারনামীয় বাকি আসামি হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ আসামিদের দেয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি অনুযায়ী আরো ৭ জনকে বিভিন্ন সময় গ্রেফতার করা হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত