প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খালেদা জিয়ার কারাবাস ও বিএনপির রাজনীতি

বিভুরঞ্জন সরকার : বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার জেলজীবনের এক বছর পূর্ণ হয়েছে ৮ ফেব্রুয়ারি। জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় দণ্ড পেয়ে তিনি জেলে যান গত বছর ৮ ফেব্রুয়ারি। মামলার রায় হওয়ার আগে বিএনপি যতো হম্বিতম্বি করেছিলো, রায় হওয়ার পর আর সেটা দেখা যায়নি। বিএনপি প্রথম ভেবেছিলো, আর যাই হোক তাদের নেত্রীকে সাজা দিয়ে কারাগারে নেয়া হবে না। খালেদা জিয়াকে জেলে নিলে দেশে বিরাট আন্দোলন হবে বলেও বিএনপি ধারণা করেছিলো। বিএনপির কোনো ধারণাই সঠিক হয়নি।

খালেদা জিয়া দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। নিম্ন আদালত যে শাস্তি দিয়েছেন, উচ্চ আদালত তা বাড়িয়ে দিয়েছেন। তাকে জেল খাটতে হচ্ছে। তার মুক্তির দাবিতে কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠেনি। বিএনপির সিনিয়র আইনজীবীরা মনে করছেন, আইনি প্রক্রিয়ায় খালেদা জিয়ার মুক্তি সম্ভব নয়। তাকে মুক্ত করতে হবে গণআন্দোলনের মাধ্যমে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, খালেদা জিয়ার মুক্তির দাবিতে দেশে কী আদৌ কোনো আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব? বিএনপির অন্ধ সমর্থকরাও সম্ভবত দেশে আশু কোনো আন্দোলন গড়ে ওঠার সম্ভাবনা দেখেন না, আশাও করেন না। মুখে বড় বড় কথা বলেন। হেন করেঙ্গা, তেন করেঙ্গা বলেন, কিন্তু তাতে মানুষের মধ্যে কোনো ভাবান্তর হয় না। বিএনপির বিভিন্ন কমিটিতে যাদের নাম আছে তারাও সবাই দলীয় কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ করেন না, উপস্থিত থাকেন না। মামলা ও গ্রেপ্তার আতঙ্ক বিএনপিকে কাবু করে রেখেছে।

বিএনপি একটি চরম দুঃসময় পার করছে। কীভাবে তারা অগ্রসর হলে দল গোছাতে পারবে, কোন কৌশল অবলম্বন করলে মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন তারা পাবে, সেটা বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব নির্ধারণ করতে পারছেন না। বেগম জিয়া কারাগারে যেতে পারেন, তার অনুপস্থিতে দল কীভাবে চলবে, সে বিষয়গুলো তারা আগে থেকে ভেবে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনি। ‘সরকার কিছুই করতে পারবে না’- এই রকম একটি মনোভাব বিএনপির মধ্যে প্রবল থাকায় তারা কিছুই করতে পারলো না, করতে পারছে না। দিন যতো যাচ্ছে, বিএনপির সমস্যা ততো বাড়ছে। জনপ্রিয়তা নিয়ে এক ধরনের মোহগ্রস্ততা বিএনপির আছে। বিএনপি নেতৃত্ব পরিবর্তিত বাস্তবতা উপলব্ধিতে নিতে পারেননি। দেশজুড়ে বিএনপির সমর্থক-শুভাকাক্সক্ষী থাকলেও তাদের মাঠে নামার মতো কর্মী কম। সেজন্যই বিএনপিকে কেউ আন্দোলনের দল বলে মনে করেন না। এই দল আন্দোলন করে গত দশ বছরে সরকারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করতে পারেনি। বরং সন্ত্রাস-সহিংসতা করে মানুষকে ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলেছে।

নানা কারণে বিএনপি দিন দিন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি কোনো যোগাযোগ এই দলের নেই। তারা আওয়ামী লীগ সরকারের সব কাজের সমালোচনা-বিরোধিতা করে। সরকার কোনো ভালো কাজ করেনি বা করে না বলে প্রচার করে। বিএনপির এই ঢালাও সরকারবিরোধিতা মানুষ পছন্দ করে না। সরকারের কিছু ভালো কাজের সরাসরি উপকারভোগী মানুষের সংখ্যা যে কয়েক কোটি- এটা বিএনপি বুঝতে চায় না। সরকারের কোন নীতি বা পদক্ষেপ সাধারণ মানুষের স্বার্থের বিরুদ্ধে সেটা চিহ্নিত করতে পারেনি বিএনপি। সরকারের কোন কাজের বিরোধিতা করলে মানুষের সমর্থন পাওয়া যাবে- বিএনপি তা-ও বোঝার চেষ্টা করেনি।

তাছাড়া বিএনপি ক্ষমতায় গেলে আওয়ামী লীগের চেয়ে ভালোভাবে দেশ চালাবে- এটাও মানুষ বিশ্বাস করে না। ঘুষ-দুর্নীতি-স্বজনপ্রীতি-দলীয়করণ ইত্যাদি নিয়ে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ-অসন্তোষ আছে, কিন্তু মানুষ আবার এটাও মনে করে না যে, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এসবের অবসান ঘটবে। আওয়ামী লীগের বিকল্প হিসেবে মানুষ যতোদিন বিএনপির কথা না ভাববে ততোদিন বিএনপিকে অপেক্ষায় থাকতে হবে।

খালেদা জিয়া এক বছর ধরে কারাগারে আছেন। এখন তার অখণ্ড অবসর। এখন তার উচিত আত্মজিজ্ঞাসার সম্মুখীন হওয়া। কেন তার দল মানুষকে কাছে টানতে পারছে না, বিএনপির কোন নীতি-কৌশল মানুষ পছন্দ করছে না, কোথায় কোথায় পরিবর্তন আনতে হবে, সেসব তাকে বুঝতে হবে। বিএনপি যেভাবে চলছে সেভাবে চলে আর কিছু অর্জন করতে পারবে না। বৃত্ত ভাঙার সাহস দেখাতে হবে। পুরনো পথ নয়, মানুষকে রাজনীতির নতুন পথ দেখাতে হবে।

লেখক : গ্রুপ যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত