শিরোনাম
◈ মব–গণপিটুনিতে জানুয়ারিতে নিহত বেড়ে দ্বিগুণ, বেড়েছে অজ্ঞাতনামা লাশ: এমএসএফের প্রতিবেদন ◈ মাসব্যাপী বাণিজ্য মেলায় বিক্রি ৩৯৩ কোটি টাকা ◈ আর্থিক ধসের মুখে জাতিসংঘ, সদস্য দেশগুলোকে গুতেরেসের জরুরি চিঠি ◈ পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর নতুন বাসভবনের স্থান চূড়ান্ত, কাজ শুরু শিগগির ◈ জাইমা রহমানকে সামনে এনে কী বার্তা দিচ্ছে বিএনপি ◈ এ মৌসুমের জন্য শেষ হলো পর্যটকদের সেন্টমার্টিন যাত্রা, ফের ভ্রমণে ৯ মাসের নিষেধাজ্ঞা ◈ নির্বাচন ঘিরে পার্শ্ববর্তী দেশ ষড়যন্ত্রে লিপ্ত: নাহিদ ইসলাম ◈ ১২ ঘন্টার মধ্যে ফলাফল ঘোষণা না হলেই বুঝবো অসৎ কোনো উদ্দেশ্য আছে : মির্জা আব্বাস  ◈ যারাই বিভ্রান্ত করতে আসবে দেখামাত্র বলবেন, ‘গুপ্ত’ তোমরা: তারেক রহমান (ভিডিও) ◈ এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বকেয়া উৎসব ভাতা নিয়ে জরুরি নির্দেশনা

প্রকাশিত : ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৬:৫৪ বিকাল
আপডেট : ৩১ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালা তারেক রহমান: গণমানুষের টানে রাজনীতির নতুন পথচলা

শাহাজাদা এমরান: দীর্ঘ ১৭ বছরের নির্বাসন শেষে ২০২৫ সালের ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফিরে এসেই একের পর এক রাজনৈতিক চমক দেখিয়ে চলেছেন বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান। রাজনীতির মাঠে তার উপস্থিতি, আচরণ ও বক্তব্য অনেকের মনেই নতুন করে প্রশ্ন জাগিয়েছে—তিনি কি হয়ে উঠছেন সেই গল্পে পড়া হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালা, যার সুরে মানুষ আপনাআপনি ছুটে চলে? আর তারেক রহমান যেই সুরটি তুলেছেন, সেটি হচ্ছে-‘করব কাজ,গরব দেশ,সবার আগে বাংলাদেশ’।

দেশের জনসংখ্যার একটি বড় অংশ ইতোমধ্যেই তারেক রহমানের মধ্যে কি তাদের বিশ্বাস ও আস্থার নতুন ঠিকানা খুঁজে পেয়েছে? তার কথা বলার ভঙ্গি, ভাষা ও উপস্থাপনা যেন চেনা রাজনৈতিক ছক ভেঙে দিয়েছে। এখানে নেই প্রতিহিংসার আগুন, নেই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার তাড়না। আছে শুধু দেশের কথা, মানুষের কথা।

দীর্ঘদিন উন্নত রাষ্ট্রে বসবাস করা তারেক রহমান কি সত্যিই বদলে গেছেন? নাকি বদলে গেছে বাংলাদেশ, আর সেই পরিবর্তিত বাংলাদেশই তাকে নতুনভাবে গ্রহণ করছে? তিনি হাসলে যেন হাসে বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা, আর তিনি কাঁদলে কেঁদে ওঠে প্রিয় স্বদেশ।

২৫ ডিসেম্বরের সেই দিনটি ইতোমধ্যে স্মরণীয় হয়ে আছে। বিমানবন্দরে নেমেই খালি পায়ে দেশের মাটি স্পর্শ করেছিলেন তিনি। এটি নিছক আনুষ্ঠানিকতা ছিল না, বরং ছিল তার বদলে যাওয়ার নীরব বার্তা। তিনি বলেছিলেন, “এই দেশ ছাড়া যেমন আমার মায়ের কোনো ঠিকানা ছিল না, তেমনি আমারও নেই।”

এরপর বিশেষায়িত বাসে করে তিনি যান রাজধানীর ৩০০ ফিট এলাকায় আয়োজিত সংবর্ধনা মঞ্চে। তার জন্য নির্ধারিত ছিল একটি আলিশান চেয়ার। কিন্তু তিনি নীরবে সেই চেয়ার সরিয়ে একটি সাধারণ চেয়ারে বসে পড়েন। যেন বলতে চাইলেন—যখন দেশের মানুষ ভালো নেই, তখন বিলাসিতা আমার জন্য নয়। এরপর দেন একটি মাঝারি আকারের বক্তব্য, যা আজও মানুষের মুখে মুখে ফেরে।

সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয়, যাদের কারণে তিনি দীর্ঘ ১৭ বছর নির্যাতনের শিকার হয়ে নির্বাসিত ছিলেন, এমনকি যাদের শাসনামলে তার ছোট ভাইকে অকালে হারাতে হয়েছে—তাদের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেননি। যে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার তার মাকে বিনা অপরাধে দুই বছর কারাগারে রেখে ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস, তাদের বিরুদ্ধেও তিনি প্রতিশোধের ভাষা ব্যবহার করেননি।

তিনি কথা বলেছেন শুধু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে। যে দেশ স্বাধীন করতে ১৯৭১ সালে ঘোষণা দিয়েছিলেন শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, আর যে দেশকে আপোষহীন নেতৃত্বে আগলে রেখেছিলেন গণতন্ত্রের মাতা বেগম খালেদা জিয়া—সেই দেশ গড়ার কথাই বলেছেন তিনি। তিনি আশার বাণী শুনিয়েছেন, সকল ভেদাভেদ ভুলে বাংলাদেশ বিনির্মাণের ডাক দিয়েছেন। যেন মার্টিন লুথার কিংয়ের মতো বললেন— “আই হ্যাভ এ প্ল্যান।”

এরপর আসে ৩১ ডিসেম্বর। ঢাকার মানিক মিয়া এভিনিউতে বেগম খালেদা জিয়ার স্মরণকালের বিশাল জানাজা। সেখানে দাঁড়িয়ে মাত্র এক থেকে দেড় মিনিটের একটি বক্তব্য দেন তারেক রহমান। এটি কোনো রাজনৈতিক ভাষণ ছিল না; ঠিক যেমন একজন সাধারণ মানুষ তার বাবা-মায়ের জানাজায় বলে থাকেন। সেই সহজ, সরল কথাগুলোই মানুষের হৃদয়ে গভীরভাবে দাগ কাটে।

২২ জানুয়ারি, মায়ের মতোই পুণ্যভূমি সিলেট থেকে শুরু করেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা। হযরত শাহজালাল (র.) ও হযরত শাহপরান (র.)-এর মাজার জিয়ারতের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তার যাত্রা। এখানেই তিনি শুরু করেন এক অভিনব রাজনৈতিক প্রচারণা, যা বাংলাদেশের ৫৪ বছরের ইতিহাসে বিরল।

তিনি প্রচারণার মঞ্চকে বানিয়ে ফেলছেন ছোট ছোট আলোচনা সভা। বক্তৃতার ফাঁকে হঠাৎ ডেকে নিচ্ছেন সাধারণ মানুষকে—কখনো নারী, কখনো পুরুষ। জানতে চাইছেন তাদের সমস্যার কথা। মানুষও নির্ভয়ে বলছে তাদের অভাব, বঞ্চনা আর স্বপ্নের কথা। তিনি খুব কমই প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করছেন। যতটুকু করছেন, তা রাজনৈতিক শিষ্টাচারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

তার বক্তব্যও না খুব লম্বা, না খুব ছোট। মানুষের ধৈর্যচ্যুতি বিবেচনায় রেখে মাঝারি আকারের বক্তব্য দিচ্ছেন। বক্তব্যের ফাঁকে কর্মীদের সঙ্গে খুনসুটিও করছেন। কুমিল্লার ডিগবাজি মাঠে এক কর্মীকে মজা করে “গুপ্ত গুপ্ত” বলার দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মুহূর্তেই ভাইরাল হয়।

চট্টগ্রাম বিভাগের পর তিনি যান রাজশাহীতে। সেখানেও দেখা যায়, রাত-দিন মানুষ তার পেছনে ছুটছে। রাজশাহী থেকে ফেরার পথে তার মা বেগম খালেদা জিয়ার ছবি হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক কিশোরীকে দেখে গাড়ি থামান তিনি। কাছে ডেকে আদর করেন এবং ছবিটি নিজের কাছে রেখে দেন।

রাজশাহী ও বগুড়া হয়ে ৩০ জানুয়ারি তিনি যান উত্তরবঙ্গের রাজধানী খ্যাত রংপুরে। রংপুরের জনসভা ও পথসভায় মানুষের ঢল অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যায়। হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকায় তাকে বারবার পথসভায় বক্তব্য দিতে হয়। এক পর্যায়ে নিরাপত্তাকর্মীরা এক যুবককে সরিয়ে দিলে তিনি নিজেই বুলেটপ্রুফ গাড়ি থেকে নেমে সেই যুবকের সঙ্গে হাত মেলান, ছবি তোলেন।

এই কলাম লেখা পর্যন্ত সর্বশেষ তিনি বক্তব্য রেখেছেন গাজীপুরে। যেখানেই যাচ্ছেন, জনসভা রূপ নিচ্ছে জনসমুদ্রে। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মানুষ অপেক্ষা করছে তার বক্তব্য শোনার জন্য।

রাজনীতির মাঠে আজ নেই চিরাচরিত কাদা ছোড়াছুড়ি। আছে আগামী বাংলাদেশ গড়ার ভিশন ও মিশন। ছোটবেলায় পাঠ্যবইয়ে পড়া সেই হ্যামিলিওনের বাঁশিওয়ালার মতোই মানুষ যেন তার পেছনে ছুটছে—দেখছে একটি সম্ভাবনাময় ভবিষ্যৎ।

এখন দেখার বিষয়, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তারেক রহমান যদি বিজয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন, তাহলে এই বিপুল গণমানুষের প্রত্যাশা তিনি কতটা পূরণ করতে পারবেন।

লেখক: সম্পাদক, দৈনিক কুমিল্লার জমিন, 01711-388308

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়