প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উপমহাদেশে ইসলামের আগমন

প্রফেসর ড. এ.কে.এম ইয়াকুব হোসাইন : ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের সম্পর্ক প্রাচীনকাল থেকেই। প্রাগৈতিহাসিককাল থেকেই আরবরা ছিল ব্যবসাপ্রিয় জাতি। পবিত্র কোরআনেও তাদের এ বাণিজ্যপ্রীতির সুস্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায়। (আল কোরআন, সুরা আল কুরাইশ, আয়াত : ১-২) ঐতিহাসিক এলফিনস্টোন বলেন, হজরত ইউসুফ (আ.)-এর আমল থেকেই ভারতের সঙ্গে আরবদের চমৎকার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। (নাসির হেলাল, যশোর জেলায় ইসলাম প্রচার ও প্রসার, যশোর : সীমান্ত প্রকাশনী, ১৯৯২, পৃ.-৩৭) আরবে ইসলামের আগমনের পূর্বে রোমান সাম্রাজ্যের সঙ্গে পারস্যের সাসানীয় সাম্রাজ্যের অব্যাহত যুদ্ধ-সংগ্রামের কারণে আরবদের স্থলভাগের বাণিজ্যপথে মারাত্মক বিঘ্ন ঘটলে জাত ব্যবসায়ী আরবরা প্রয়োজনের তাগিদে বাধ্য হয়ে সমুদ্রবাণিজ্যে আগ্রহী হয় ও নৌপথ অনুসন্ধান করে। খ্রিস্টীয় পঞ্চম শতাব্দী থেকেই আরবরা নৌবাণিজ্যে ইয়েমেন, হাযরামাউত, দক্ষিণ ভারতের মালাবার, কালিকট, চেরর, বার্মা, কম্বোডিয়া অঞ্চলে বাণিজ্যের জন্য যাতায়াত করত। (মুহিউদ্দিন খান, ‘বাংলাদেশে ইসলাম : কয়েকটি তথ্যসূত্র’, ইসলামিক ফাউন্ডেশন পত্রিকা, (ঢাকা : ই.ফা.বা. এপ্রিল-জুন, ১৯৮৮), পৃ. ৩৪৬) তখন থেকেই আরবরা নাবিক হিসেবে সমুদ্র অভিযানে পারদর্শী ছিল। আরব দেশ থেকে বছরে অন্তত দু’বার আরব নৌবহর মৌসুমি বায়ু ধরে বাণিজ্যিক পণ্য আদান-প্রদানের জন্য ভারত মহাসাগর অঞ্চলে যাতায়াত করত। (মো. আতাউর রহমান বিশ্বাস, ‘দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ইসলাম’, প্রবন্ধাবলী, (ঢাকা : উচ্চতর সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র, ঢাবি, জুন, ১৯৯৯, পৃ.-২১৭) শুধু তা-ই নয়, ভারতের বিশিষ্ট ইসলামী গবেষক সাইয়্যিদ সুলায়মান নদভী (র.) তার বিরল গবেষণা গ্রন্থ ‘আরব ও হিনদ কি তাআল্লুকাত’-এ লিখেছেন, মিসর থেকে সুদূর চীন পর্যন্ত প্রলম্বিত দীর্ঘ নৌপথে আরবগণ যাতায়াত করতেন। (শাহ ওয়ালী উল্লাহ, হুজ্জাতিল্লাহিল বালিগাহ-এর মুকাদ্দমা, (দিল্লি : আসাহহুল মাতাবি, ২০০০ইং)

প্রাচীনকাল হতে ভারতবর্ষের সঙ্গে আরবদের স্থল ও জল উভয় পথেই যোগাযোগ বিদ্যমান ছিল। আর এটা ছিল বাণিজ্যিক সম্পর্ক। এরূপ অর্থনৈতিক বিনিময় উভয়ের সাংস্কৃতিক বিনিময়কে গতিশীল ও দৃঢ় করেছে। তবে প্রাক-ইসলামী যুগে ধর্মীয় আচারে পৌত্তলিকতার ব্যাপক অনুসরণ উভয় সংস্কৃতিকে গতিধারায় নতুন মাত্রা সংযোজন করে। আরবদের ধর্মীয় আচারে পৌত্তলিকতার প্রভাব কি ভারতীয় সংস্কৃতির অবদান? সপ্তম শতকে আরব ভূমিতে ইসলামের আবির্ভাবে আরব জীবনের গতিকে বেগবান করে তোলে। যার প্রভাব তাদের বৈষয়িক কর্মকাণ্ডে চাঞ্চল্য সৃষ্টি করে। ফলে খলিফা ওমরের সময়েই জল ও স্থল উভয় পথে ভারতের উদ্দেশে রাজনৈতিক কর্মতৎপরতা শুরু হয়। আর অষ্টম শতকে মুহাম্মদ বিন কাসিমের সিন্ধু বিজয় ছিল সে উদ্যোগেরই ফল। (তারা চাঁদ, অনুবাদ : করুণাময় গোস্বামী, ভারতীয় সংস্কৃতিতে ইসলামের প্রভাব, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮, পৃ. ২৬) যদিও এর রাজনৈতিক প্রভাব ফলপ্রসূ ছিল না, কিন্তু সাংস্কৃতিক প্রভাব ছিল কালোত্তীর্ণ।

সাংস্কৃতিক সম্পর্কের মধ্যে সুলতান মাহমুদের বার বার ভারত আক্রমণ ভাঙনের সুর সৃষ্টি করে। কিন্তু বৈষয়িক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে গেলে দেখা যায় সুলতান মাহমুদ ভারতে মুসলিম রাজ্য প্রতিষ্ঠার অন্যতম অগ্রদূত। যা মুহাম্মদ ঘুরীর ও বখতিয়ার খলজীর রাজনৈতিক তৎপরতায় চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। তাই আরবদের ভাগ্যকে স্বীকার করে নিয়ে বলতে হয় ভরতবর্ষে রাজনৈতিকভাবে মুসলিম আধিপত্য বিস্তারের কৃতিত্ব তুর্কীদের, আরবদের নয়।

মালাবার উপকূল বয়ে তারা চীনের পথে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করতেন। (মুহিউদ্দীন খান, প্রাক্তন, পৃ.-৩৪১) এবং তৎকালীন বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলীয় বন্দরগুলোতে এসে চন্দন কাঠ, হাতির দাঁত ও দন্ত নির্মিত বিভিন্ন আসবাবপত্র, মসলা, মূর্তি, কাপড় ইত্যাদি ক্রয় এবং জাহাজ বোঝাই করে নিজেদের দেশে নিয়ে যেতেন। (এম. নাজির আহমদ, ‘বাংলাদেশে ইসলামের আগমন’, মাসিক পৃথিবী, ঢাকা : জানুয়ারি, ১৯৯৭, পৃ ৩০) এ সম্পর্কে খালিক আহমেদ নিযামী বলেন :

India’s relation with the Arab world go back to hoary past long before the rise of Islam, there was brisk commercial contact between India and Arabia and the Arab traders carried Indian goods to the European markets by way of Egypt and Szria. Elphinstone has rightly observed that from the days of Joseph to the days of Marco Polo and Vasco de Gama the Arabs were the captains of Indian commerce. There were large number of Arab colonies on the western coast of India and many India settlements in the Arab countries. Ubull, for instance, was known as Ard-ul-Hind on account of the large number of Indians who inhibited that region. When Islam spread and the Arabs got converted to Islam, these colonies continued to flourish as before. The Indian rajas appointed Muslim judges, known as hunurman, to decide their cases and provided all facilities to them to organize their community life. Commercial contact led to cultural relations and while large number of Arab navigational and other terms were adopted by the Indians. Indian customs, institutions and practices found their way to Arabia, Philologists have traced three Sanskrit words misk (Musk), Zanjabil (Ginger) and kafur (Camphor) in the Quran.(কে. এ. নিযামী : ড. মুহাম্মদ যাকী সম্পাদিত Arab acconts of India গ্রন্থের ভূমিকা।)

উপমহাদেশের সরবতক নামক জনৈক শাসক রসুল (সা.)-এর নিকট ভারত বর্ষের এক পাত্র ‘যানযাবিল’ বা আদ্রকসহ বেশকিছু উপহার-উপঢৌকন পাঠিয়েছিলেন বলে হজরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) কর্তৃক বর্ণিত একটি হাদিসে উল্লেখ রয়েছে। হাদিসটির অনুবাদ এরূপ :

According to a narration by abu Sayed khudri (R.) Sarbatak king of kunj (India) sent an earthen ware full of gingers to prophet Muhammad (Sm.) as presents. It is also reported that Hazrat Muhammad (Sm.) sent Hudhayfa, Usama and Suhayb to the king inviting him to accept Islam. Sarbatak embraced Islam. He also said, “I saw the prophet’s face. First in Macca, then in Madina, He was middle statured and very handsome.(অধ্যাপক আবদুল গফুর, ‘মহানবীর যুগে উপমহাদেশ’, অগ্রপথিক, সীরাতুন্নবী (সা.) সংখ্যা, (ঢাকা : ই.ফা.বা. ২৭ অক্টোবর, ১৯৮৮, পৃ-৫৩।)

নির্ভরযোগ্য ইতিহাস থেকে প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী বিপ্লবের প্রথম কয়েক বছরে নবুয়ত ও প্রথম খলিফার আমলে না হলেও দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর ফারুক (রা.)-এর খিলাফতকালে বিশ্বনবীর পাঁচজন মহাত্মা সাহাবিও উপমহাদেশে আগমন করেছেন। (মাওলানা মুহাম্মদ আবদুর রহীম, হাদিস সঙ্কলনের ইতিহাস, পৃ.-৪৫৭) ২৩-৪০ হিজরির মধ্যেই পাক-ভারতের পশ্চিম উপকূল পর্যন্ত ওই মুসলিম প্রচারক ও মুজাহিদ বাহিনী পৌঁছেছিলেন বলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়। (মাওলানা নূর মোহাম্মদ আ’জমী, হাদিসের তত্ত্ব ও ইতিহাস, ঢাকা : এমদাদীয়া লাইব্রেরী, ১৯৯২, ৪র্থ সংস্করণ, পৃ.-১৩৫) এ সময় যে পাঁচজন সাহাবির ভারত আগমনের সন্ধান পাওয়া যায় তারা হলেন : (১) হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ইতবান (রা.), (২) হজরত আসেম ইবনে আমর আততামীমী (রা.), (৩) হজরত সুহার ইবনে আল-আবদী (রা.), (৪) হজরত সুহাইল ইবনে আদী (রা.), (৫) হজরত হাকাম ইবনে আবিল আস আছ ছাকাফী (রা.)। (ডক্টর মোহাম্মদ এছহাক, ইলমে হাদিসের ভারতীয় উপমহাদেশের অবদান, অনুবাদ-হাফেজ মাওলানা মুহাম্মদ জাকারিয়া, ঢাকা : ই.ফা.বা. ১৯৯৩, ১ম সংস্করণ, পৃ.-৮)

লেখক : সাবেক অধ্যক্ষ সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া ঢাকা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত