শিরোনাম
◈ ঢাকার কাছে ভূমিকম্পের উৎস, বড় ঝুঁকির আশঙ্কা কতটুকু? ◈ পর্যটক ও বাসিন্দাদের জন্য ‘সিভিলিটি গাইডবুক’ আনছে দুবাই ◈ লাল কার্ডের পর এবার ৫ ম্যাচ নিষিদ্ধ কাতারের মিডফিল্ডার ◈ এবার মাজারের অর্থ নিয়ে ডিসি সারওয়ারের কল রেকর্ড ভাইরাল ◈ তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের ফল মিলবে আগামী মাসেই:: শ্রমমন্ত্রী ◈ উপদেষ্টা জাহেদ ইস্যুতে ভারতের ব্যাখ্যা ‘সন্তোষজনক নয়’ : ঢাকা ◈ টেস্ট খেল‌তে জিম্বাবুয়ে গে‌লো বাংলা‌দেশ ক্রিকেট দল  ◈ কুরআনের আয়াত নিয়ে ‘ঠাট্টা-বিদ্রুপসহ ভুল ব্যাখ্যার অভিযোগ: সংসদে মুখোমুখি সরকারি ও বিরোধীদল ◈ ‘শুল্কমুক্ত সুবিধা মিলেছে, তবু চীনের বাজারে কেন পিছিয়ে বাংলাদেশের রপ্তানি?’ ◈ সতর্কসীমায় তিস্তা-ধরলা-দুধকুমারের পানি, বন্যা ঝুঁকিতে কয়েক জেলা

প্রকাশিত : ০৪ এপ্রিল, ২০১৮, ০৭:৫৫ সকাল
আপডেট : ০৪ এপ্রিল, ২০১৮, ০৭:৫৫ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাউনিয়া খাল মিরপুরের নাভি, অথচ…

নিজস্ব প্রতিবেদক : ভাসানটেক। নামেই অনুমান করা যায়, একদা এই অঞ্চলটি ছিল জলাধার। এখন সেখানে জলাধারের অস্তিত্ব না থাকলেও একটি খাল আছে। এই খালের পাড়েই ভূমি মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দরিদ্র বস্তিবাসীর জন্য গড়ে তোলা হয়েছে ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প। প্রকল্প এলাকার খালপাড়েই আছে একটি সরকারি স্কুল ও কলেজ। ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প এবং প্রকল্প এলাকার ওই স্কুল ও কলেজ দখল করে নিয়েছে খালটির বেশ কিছু অংশ। খাল দখলের অভিযোগ রয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের নামেও।

ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের এই পাড়ে রয়েছে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের একটি ভবন। মিরপুর ১৩ নম্বর, বাইশটেকি ও ভাসানটেকের মিলনস্থলের যেখানটায় সরকারি প্রতিষ্ঠান দুটি খাল দখল করেছে, তারই মাঝামাঝি একটি স্থানে খালের বুকে দেখা গেল জনৈক আবদুল মালেক গংয়ের নামে জমির মালিকানাসংবলিত সাইনবোর্ড। সরকারি দখলের এমন সুযোগ ব্যবহার করছে আরও অনেক দখলদার। তারা দখল করে নিচ্ছে ওই খালের অনেক জায়গা।

ভাসানটেক এলাকায় খালটিকে ভাসানটেক খাল বলা হলেও এটি আসলে বাউনিয়া খালের সম্প্রসারিত অংশ এবং সংযুক্ত রয়েছে ইব্রাহিমপুর খালের সঙ্গে। খালটি মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে ভাসানটেক, মাটিকাটা, মানিকদী, বালুঘাট হয়ে আশুলিয়ার তুরাগে গিয়ে মিলেছে। খালটির একটি শাখা বাইশটেকি হয়ে প্যারিস রোড খাল নামেও পরিচিত।

ওয়াসার তথ্যানুযায়ী, মিরপুর ১৪ নম্বর বাসস্ট্যান্ডের পাশ থেকে বাউনিয়া খালের শুরু। প্রায় আট কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এই খালের মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে জয়নগর পর্যন্ত এক হাজার ১৮২ মিটারের মতো অংশের মালিক জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ। বাকিটুকুর মালিক ওয়াসা। ওয়াসার হিসাবে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত খালটির প্রস্থ হওয়ার কথা ৬০ ফুট।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, এ খালের বর্তমান প্রশস্ততা কোথাও কোথাও তিন থেকে পাঁচ ফুট পর্যন্ত হয়ে গেছে। ১৪ নম্বর বাসস্ট্যান্ড-লাগোয়া ওয়াসার পানির পাম্পের পেছন থেকে সামনে বাগানবাড়ি বস্তির শেষ পর্যন্ত খালের দুই পাড় বাঁধাই করা এবং এ এলাকায় খালের প্রস্থও বেশ। তবে জায়গায় জায়গায় ফেলা ময়লা-আবর্জনা এবং মাটি-বালুতে ভরে যাওয়ায় গভীরতা খুবই কম।

পুলিশ স্টাফ কলেজের পাশ দিয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) তৈরি করা রাস্তাটি খাল পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সেখানে খাল পার হওয়ার জন্য একটি সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে ডিএনসিসির। ওই এলাকায় দেখা যায়, খালের ওপর অসংখ্য টংঘর। নিচ দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ময়লা পানি। সেখান থেকে কিছুদূর গিয়ে মিরপুর ১৩ নম্বর, বাইশটেকি ও ভাসানটেকের মিলনস্থলের একপাশে রূপসী প্রো-অ্যাকটিভ ভিলেজ আবাসন প্রকল্প এবং অন্যপাশে ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প। অদূরে বাইশটেকিতে ভাসানটেক সরকারি কলেজ ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়।

রূপসী প্রো-অ্যাকটিভ ভিলেজ আবাসন প্রকল্প ও ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের মাঝামাঝি এলাকায় খালের প্রশস্ততা অনেক কম, বড়জোর ১০-১৫ ফুট হতে পারে। রূপসী প্রো-অ্যাকটিভ ভিলেজ থেকে নির্মাণসামগ্রীর উচ্ছিষ্ট গিয়ে পড়ছে খালের ভেতর। এখানে খালের ভেতর বেশ কিছু কংক্রিটের খুঁটি দেখা যায়। বহুতল ভবন তৈরির জন্য যেভাবে পাইলিং করে খুঁটি পোতা হয়, এগুলো সে রকমই। পুরোদস্তুর বহুতল ভবন তোলার অবকাঠামো যাকে বলে।

কারা এই অবকাঠামোগুলো নির্মাণ করেছে- জানতে চাইলে খালপাড়ের এক চা দোকানি জানালেন, এগুলো ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের কাজ। খালের যে বাঁকে চায়ের দোকানটি, সেখান থেকে একটু দক্ষিণ-পূর্ব দিকে একটি ঘুণ্টিঘরের মতো রয়েছে। দোকানি বললেন, ওই ঘুণ্টিঘরে ভাসানটেক প্রকল্পের পাহারাদাররা থাকেন। তবে ওই এলাকা ঘুরে দেখার সময় ওখানে কোনো পাহারাদারের সাক্ষাৎ মেলেনি।

ভাসানটেক প্রকল্প থেকে ভাসানটেক স্কুল ও কলেজ ফেলে খালটি পূর্ব বাইশটেকি বালুর মাঠ হয়ে গেছে জয়নগরের দিকে। জয়নগরেই গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের ফ্ল্যাট নির্মাণ প্রকল্পের কাজ চলছে। এখানে খালটির প্রস্থ সরু নালার আকৃতি পেয়েছে। এ নিয়ে ওয়াসার পক্ষে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে চিঠি চালাচালি চলছে অনেক দিন ধরে। গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান বরাবর ওয়াসার পাঠানো চিঠিতে বলা হয়েছে, ২০০৭ সালে ওয়াসা গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে খালের জমি বুঝে পায়। কিন্তু জয়নগর অংশে প্রায় ১১৫ মিটার জায়গা জলমগ্ন থাকায় তখন তা বুঝে নেওয়া যায়নি। এখন এ অংশে ছোট নালা দিয়ে পানি প্রবাহিত হয়। ২০১৬ সালে জাতীয় গৃহায়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সভাপতিত্বে জরুরি সভা হলেও সমাধান হয়নি। ওয়াসার এমন চিঠির উত্তরে গৃহায়ন কর্তৃপক্ষ ওয়াসাকে এক চিঠিতে জানিয়েছে, ওই এলাকায় কোনো খাল নেই। নিচু এলাকা দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো, পানিপ্রবাহের ওই এলাকাকে খাল মনে করা হয়েছে। ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প বরাবর পাঠানো আরেক চিঠিতে ওয়াসা বলেছে, প্রকল্পের উন্নয়নকাজ করায়, অর্থাৎ মাটি ভরাট ও আরসিসি কলাম নির্মাণ করায় খালের প্রশস্ততা হ্রাস পেয়েছে।

ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব শামস আল মুজাদ্দিদ বলেন, ভাসানটেক প্রকল্পের জমির পরিমাণ ৪৮ দশমিক ৯ একর। তার কাছে প্রকল্পের যে ম্যাপ আছে, সেখানে কোথাও খালের জমি নেই। কিন্তু বিভিন্ন সময় এটা নিয়ে অভিযোগ উঠছে। এ ব্যাপারে তিনি এসি ল্যান্ড, ঢাকা ওয়াসা, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনকে চিঠি দিয়ে জানিয়েছেন। এমনকি প্রয়াত মেয়র আনিসুল হককে ব্যক্তিগতভাবেও বিষয়টি বলেছিলেন। তার ধারণা, ভাসানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের পাশে বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠান ফ্ল্যাট তৈরি করছে এবং তাদের জায়গার মধ্যে খাল ঢুকে গেছে। তারাই হয়তো খালের জায়গায় ভবন নির্মাণ করেছে। ভাসানটেক সরকারি স্কুল ও কলেজ নির্মাণের জন্য খালের কোনো জায়গা ব্যবহার করা হয়েছে কি-না জিজ্ঞেস করা হলে উত্তরে তিনি বলেন, বিষয়টি তার জানা নেই।

ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র-২ মো. জামাল মোস্তফা বলেন, বাউনিয়া খাল মিরপুরের নাভি। মিরপুরের সব খাল এর সঙ্গে সংযুক্ত এবং এটিই মিরপুরের পানি বইয়ে তুরাগ নদে নিয়ে যায়। এই খালটির মূল সমস্যা মিরপুর ১৪ নম্বর থেকে জয়নগর পর্যন্ত। এই অংশে সরকারি দুই প্রকল্পের কারণে খাল সংকীর্ণ হয়ে গেছে এবং এ দুই প্রকল্পের কারণে দখলে উৎসাহিত হচ্ছে সাধারণ দখলদাররাও। খালটিকে অন্তত ৬০ ফুট প্রশস্ত করতে না পারলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট, পুরনো এয়ারপোর্ট, ইব্রাহিমপুর, কাফরুলসহ মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা স্থায়ী রূপ নেবে। তার মতে, বাউনিয়া খালের সব শাখা-প্রশাখা মুক্ত করে খালটির তুরাগের সংযোগ স্থাপন করতে হবে।

ঢাকার যে ২৬টি খাল এখনও সচল করা সম্ভব বলে মনে করছে গবেষণা প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড জিওগ্রাফিক্যাল ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস), বাউনিয়া খাল তার একটি। সিইজিআইএস ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা দূর করতে করণীয় নির্ধারণে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও বিশ্বব্যাংকের পক্ষে ২০১৫-১৬ সালে গবেষণা করেছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে ঢাকা বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) রিভিউ কমিটিতে এ গবেষণা প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। এরপর এ নিয়ে আর কোনো কথা শোনা যায়নি। প্রতিবেদনে দখলের কারণে বর্তমানে পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন মিরপুর এলাকার খালগুলোকে যুক্ত করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মিরপুর এলাকার সব খাল সংযুক্ত হলে বাউনিয়া খালের দৈর্ঘ্য হবে ১৪ দশমিক ৪ কিলোমিটার। সূত্র : সমকাল

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়