মস্তিষ্কের কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারে এমন ‘নন-ইনভেসিভ’ সেন্সর তৈরি করে ক্যালিফোর্নিয়ার কোম্পানি সোনেরা। কোম্পানিটির সহপ্রতিষ্ঠাতাদের একজন সায়ীফ সালাহউদ্দিন একজন বাংলাদেশি আমেরিকান।
এ বছরের শুরুতে স্টার্টআপটিকে কিনে নিয়েছে শীর্ষ প্রযুক্তি কোম্পানি অ্যাপল।
সোনেরার প্রযুক্তি মস্তিষ্ক ও পেশির তৈরি চৌম্বকীয় কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারে বলে প্রতিবেদনে লিখেছে অ্যাপলবিষয়ক সংবাদমাধ্যম অ্যাপলইনসাইডার। এতে শরীরে কোনো ক্ষত বা সুচ ফোটানোর প্রয়োজন হয় না।
এর আগে চিন্তার মাধ্যমে অ্যাপল ভিশন প্রো নিয়ন্ত্রণের সম্ভাবনা দেখানো হলেও সেই পরীক্ষায় ব্যবহারকারীর মাথায় একটি যন্ত্র বসাতে হয়েছিল।
কোম্পানিটির সহপ্রতিষ্ঠাতা নিশিতা ডেকা ২০২০ সালে বলেছিলেন, তাদের লক্ষ্য ছিল মস্তিষ্কের ছবি তোলার প্রযুক্তিকে আরও বহনযোগ্য ও সাশ্রয়ী করে তোলা।
বার্কলিতে শুরু
নিশিতা ডেকা ও ডমিনিক লাবানোস্কি ২০১৮ সালে ইউনিভার্সিটি অফ ক্যালিফোর্নিয়া, বার্কলিতে শিক্ষার্থী থাকা অবস্থায় কোম্পানিটি শুরু করেন। সেখানকারই অধ্যাপক সায়ীফ এবং তিনি ছিলেন ডমিনিক লাবানোস্কি’র পিএইচডি গবেষণা তত্ত্বাবধায়ক।
শুরুতে কোম্পানিটির নাম ছিল সোনেরা ম্যাগনেটিকস। ২০২৩ সালে কোম্পানিটি ১ কোটি ১০ লাখ ডলার অর্থায়ন পায়।
সোনেরার প্রথম পণ্য ছিল পেশির কার্যকলাপ শনাক্ত করার জন্য তৈরি এস১ চিপ। কোম্পানিটির দাবি, চিপটি মস্তিষ্কের চৌম্বকীয় কার্যকলাপ শনাক্ত করতে পারে। একই প্রযুক্তি কৃত্রিম অঙ্গ নিয়ন্ত্রণ এবং ভোক্তা পর্যায়ের পরিধানযোগ্য যন্ত্রেও ব্যবহার করা যেতে পারে।
বাংলাদেশি-আমেরিকান গবেষক সায়ীফ
সায়ীফ সালাহউদ্দিন ২০০৩ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের পারডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। চৌম্বকীয় সেন্সর ও সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি নিয়ে তার গবেষণার সঙ্গে সোনেরার প্রযুক্তিরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বিজ্ঞান ও প্রকৌশলে তার গবেষণার স্বীকৃতি এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেও। ২০১৬ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা তাকে ‘প্রেসিডেনশিয়াল আর্লি ক্যারিয়ার অ্যাওয়ার্ড ফর সায়েন্টিস্টস অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স’ সম্মাননা দেন।
প্রারম্ভিক ক্যারিয়ারের বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সর্বোচ্চ সম্মান হিসেবে বিবেচিত এই পুরস্কার সায়ীফ সালাহউদ্দিনকে তার গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে দেওয়া হয়।
এই অ্যাপল কী কাজে লাগাতে পারে
এই প্রযুক্তির সম্ভাব্য একটি ব্যবহার হতে পারে ভবিষ্যতের অ্যাপল ওয়াচ। নির্দিষ্ট কিছু স্নায়ু-পেশিজনিত সমস্যার অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণে এ ধরনের সেন্সর ব্যবহার করা যেতে পারে বলে উঠে এসেছে অ্যাপল ইনসাইডারের প্রতিবেদনে।
একইসঙ্গে, শরীরে কোনো যন্ত্র বসানো ছাড়াই মস্তিষ্কের সংকেত শনাক্ত করা গেলে চিন্তার মাধ্যমে যন্ত্র নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও প্রযুক্তিটি কাজে লাগতে পারে। অ্যাপলের বিভিন্ন যন্ত্রে এমন সুবিধা যুক্ত হলে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা থাকা ব্যবহারকারীদের জন্যও তা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের গুরুত্বপূর্ণ অধিগ্রহণের তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, অ্যাপল ২০২৬ সালের মে মাসে সোনেরা অধিগ্রহণ করে। তবে অ্যাপল বা সোনেরা কেউই অধিগ্রহণের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেয়নি। এর মধ্যে সোনেরার ওয়েবসাইটও বন্ধ হয়ে গেছে।
তিনি বলেন, “আমরা আরও সাশ্রয়ী, দ্রুত পদ্ধতি ব্যবহার করে মস্তিষ্কের কার্যকলাপ শনাক্ত করার চেষ্টা করছি, যেগুলোর কার্যক্ষমতাও উচ্চমানের থাকবে।”
ডেকা আরও বলেন, “এটাই আমাদের মূল লক্ষ্য। আমরা এক ধরনের কার্যকরী ইমেজিং করি, অর্থাৎ মস্তিষ্কের কার্যকলাপ সরাসরি শনাক্ত করি।”
সোনেরার প্রযুক্তিতে বৈদ্যুতিক সংকেতের বদলে চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করা হয়। বৈদ্যুতিক সংকেত মাথার খুলির মধ্য দিয়ে যাওয়ার সময় দুর্বল হয়ে যায়। ফলে চৌম্বকীয় সংকেত শনাক্ত করার এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে আরও কার্যকর চিন্তা-নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্তি তৈরিতে কাজে লাগতে পারে।
সূত্র: বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম