শিরোনাম
◈ বাংলাদেশি শ্রমিকদের জন্য ওয়ার্ক পারমিট-ভিসা বন্ধ করল লাওস ◈ কূটনৈতিক টানাপোড়েন অব্যাহত, ঢাকার পরবর্তী হাইকমিশনারের নিয়োগে ভারতের সম্মতি মেলেনি! ◈ যুক্তরাষ্ট্রে হামের প্রকোপ, পেনসিলভেনিয়ায় চার জ‌নের মৃত্যু ◈ মক্কার কাছে হুতিদের ড্রোন হামলার চেষ্টা, ভূপাতিত করল সৌদি ◈ এল‌চের বিরু‌দ্ধে রিয়াল মাদ্রিদের সৌভাগ‌্যপ্রসুত জয়  ◈ এক সপ্তা‌হে ৩‌টি প্রী‌তি ম‌্যাচ খেল‌তে মা‌ঠে নাম‌ছে আর্জেন্টিনা ◈ ইমরান খানের সমর্থনে অস্ট্রেলিয়ার ৭ প্রাক্তন ক্রিকেট অ‌ধিনায়ক, সরকারের কাছে মানবিক পদক্ষেপের আর্জি  ◈ জিন্নাহর ছবি ছেঁড়া ও গোলাম আযমের ছবি টাঙানোয় ক্ষুব্ধ ডাকসু, ‘মব’ উল্লেখ করে বিচার দাবি নেতাদের ◈ স্থানীয় নির্বাচনে মুখোমুখি জামায়াত-এনসিপি, ১১ দলীয় জোটে কি প্রভাব পড়বে? ◈ ঢাবির জগন্নাথ হলের পাশে পরপর দুই ককটেল বিস্ফোরণ

প্রকাশিত : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ১২:৪৯ দুপুর
আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:০৫ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভারতে মুসলিমদের জায়গা আছে, কিন্তু ‘মুসলিম সত্তা’র জায়গা কতটা?

একজন মুসলিম হচ্ছেন জনসংখ্যার একটি পরিসংখ্যানিক অস্তিত্ব, আর ‘মুসলিম সত্তা’ হলো একটি পুরো সভ্যতার উপস্থিতি। প্রথমটি কেবল একটি ধর্মবিশ্বাসের মানুষদের বোঝায়; কিন্তু দ্বিতীয়টির মধ্যে রয়েছে ইতিহাস, স্মৃতি, ভাষা, সাহিত্য, কবিতা, সঙ্গীত, শিল্প, স্থাপত্য, খাদ্যাভ্যাস, পোশাক, রীতিনীতি এবং চিন্তাধারা—যার মাধ্যমে প্রায় এক হাজার বছর ধরে মুসলিম জীবনধারা ভারতের গড়ে ওঠার ইতিহাসের সাথে অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে গেছে।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘ (আরএসএস)-এর কৌশল হলো মুসলিমদের থেকে এই 'মুসলিম সত্তা'কে আলাদা করা। এই প্রক্রিয়াটি বেশ সূক্ষ্ম; কারণ বাস্তবিকভাবে ভারত থেকে ২০ কোটি বা ২০ লাখেরও বেশি মুসলিমকে তাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে তাদের রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাহীন, প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দৃশ্যপট-হীন এবং সামাজিকভাবে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা সম্ভব। এর মাধ্যমে তারা একটি সামাজিক গোষ্ঠী হিসেবে থেকে গেলেও, ভারতের জাতীয় পরিচয়ের উপাদান হিসেবে এই ‘মুসলিম সত্তা’র গুরুত্ব ক্রমশ হ্রাস পাবে।

advertisement

আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের গত ২৯ আগস্ট নিউ ইয়র্কের মন্তব্যটি এই প্রেক্ষাপটেই খতিয়ে দেখা দরকার। সেখানে তিনি বলেছিলেন, "যদি কোনো হিন্দু মনে করে যে ভারতে কোনো মুসলিমের থাকা উচিত নয়, তবে সে আর হিন্দু থাকে না।" তিনি আরও যোগ করেন, এক হিন্দু বিশ্বাস করে যে "সব পথই একই লক্ষ্যে নিয়ে যায় এবং প্রতিটি মানুষের মর্যাদা রয়েছে।"

উপর ওপর দেখলে এটি একটি ইতিবাচক সুর পরিবর্তন বলে মনে হতে পারে। কিন্তু ভাগবত এটি নাগপুর বা দিল্লিতে দাঁড়িয়ে বলেননি; বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে আরএসএস তাদের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে এবং নিজেদের ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদী হিসেবে না দেখিয়ে একটি সাংস্কৃতিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলন হিসেবে উপস্থাপন করতে আগ্রহী।

advertisement

তবে ভারতের ভেতরের বাস্তবতার সাথে তাঁর কথার কোনো মিল নেই। ভারতে মুসলিমরা মোট জনসংখ্যার ১৪ শতাংশেরও বেশি হওয়া সত্ত্বেও ৫৪৩ জন লোকসভা সদস্যের মধ্যে মাত্র ২৪ জন (৪.৪%) মুসলিম, যাদের কেউই ক্ষমতাসীন এনডিএ জোটের নন। ২০২২ সালের পর থেকে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভায় কোনো মুসলিম মন্ত্রী নেই। রাজ্য বিধানসভাগুলোতে মুসলিম বিধায়কের সংখ্যা ২০১৩ সালের ৩৩৯ থেকে কমে বর্তমানে প্রায় ২৫৫-এ নেমে এসেছে। ভারতের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপতির পদ বা উপ-রাষ্ট্রপতির পদে এখন আর কোনো মুসলিম নেই, অথচ অতীতে এই পদগুলোতে মুসলিম প্রতিনিধি ছিলেন। একইভাবে উচ্চপর্যায়ের সরকারি আমলাতন্ত্রেও মুসলিমদের উপস্থিতি অত্যন্ত ক্ষীণ।

অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রেও এই বর্জন স্পষ্ট। ২০০৬ সালের ঐতিহাসিক 'সাচার কমিটি'র প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মুসলিমরা জনসংখ্যার ১৩.৪% হলেও এলিট প্রশাসনিক ক্যাডারে মাত্র ৩%, উচ্চপদস্থ পুলিশ সেবায় ৪% এবং কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীতে মাত্র ৩.২% প্রতিনিধিত্ব করে। দুই দশক পর, রাজনৈতিক ক্ষমতা থেকে তাদের দূরত্বের সাথে সাথে এই ব্যবধান আরও গভীর হয়েছে।

advertisement

তাই ভাগবতের "মুসলিমরা ভারতে থাকতে পারে" শীর্ষক আশ্বাসটি মূল ও কঠিন প্রশ্নটিকে এড়িয়ে যায়। আসল প্রশ্ন হলো—আরএসএস যে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’-এর কল্পনা করে, তাতে কি এই ঐতিহাসিক ‘মুসলিম সত্তা’র কোনো জায়গা রয়েছে?

আরএসএস-এর সাংগঠনিক শক্তি হলো কৌশলগত ধৈর্য। তারা কয়েক দশকের পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করে। একসময় ভারতের মূলধারার বহুত্ববাদী ব্যবস্থার বাইরে থাকা এবং তিনবার নিষিদ্ধ হওয়া এই সংগঠনটি ধীরে ধীরে প্রান্তিক অবস্থান থেকে একদম মূল ক্ষমতায় এসে পৌঁছেছে।

কোনো আনুষ্ঠানিক নিষেধাজ্ঞা ছাড়াই কীভাবে একটি ভাষার রূপ পরিবর্তন বা সংকোচন করা যায়, তার বড় উদাহরণ উর্দু। ভারতীয় উপমহাদেশে বিকশিত উর্দু ভাষাটি ভারতীয় কবিতা, সাহিত্য ও সঙ্গীতের এক বিশাল ভাণ্ডার হয়ে উঠেছিল। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম প্রধান স্লোগান "ইনকিলাব জিন্দাবাদ"-ও ছিল উর্দু। কিন্তু দেশভাগের পর উর্দুকে কেবল মুসলিমদের এবং আরও ক্ষতিকরভাবে পাকিস্তানের ভাষা হিসেবে চিহ্নিত করা হতে থাকে।

কবিতা, চলচ্চিত্র এবং জনপ্রিয় সঙ্গীতে বেঁচে থাকলেও সরকারি লাইফ থেকে এই ভাষার লিপি দৃশ্যত হারিয়ে যেতে বসেছে। ২০০০-এর দশকের শুরুতে দিল্লির ঐতিহাসিক জামে মসজিদ থেকে গলিবের বাসস্থান 'বল্লি মারান'-এর দিকে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করেছিলাম, মসজিদের নামাজের সময়সূচিও উর্দুর বদলে দেবনাগরী (হিন্দি) লিপিতে লেখা। অর্থাৎ, গালিবের নিজের পাড়াতেই এমন এক প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে যারা তাঁকে পড়তে বাধ্য হচ্ছে অন্য এক লিপির মাধ্যমে।

আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইরফান হাবিবকে উর্দুর এই অবক্ষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছিলাম। তাঁর ব্যাখ্যাটি ছিল সহজ—উর্দুর ওপর পাকিস্তান সৃষ্টির পেছনে ভূমিকা রাখার তকমা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কোনো ভাষা যখন শিক্ষাগত বা অর্থনৈতিক সুযোগ দেওয়া বন্ধ করে দেয়, তখন পরিবারগুলো একসময় তাদের সন্তানদের তা শেখানো বন্ধ করে দেয়।

একই ঘটনা ঘটছে ভারতের মুসলিমদের ইতিহাসের ক্ষেত্রেও। প্রায় এক হাজার বছরের মুসলিম ঐতিহ্যকে একবারে মুছে ফেলা না গেলেও, জাতীয় স্মৃতিতে এর অবস্থানকে খাটো ও বিকৃত করা যাচ্ছে। স্কুলের পাঠ্যপুস্তক থেকে দিল্লির সুলতানি আমল ও মুঘল সংক্রান্ত ইতিহাস বাদ বা হ্রাস করা হয়েছে। ইতিহাসকে ভারতের নিজস্ব জটিল গঠনের অংশ হিসেবে না দেখিয়ে ক্রমশ ‘আক্রমণকারী’ ও ‘বহিরাগত’ হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।

এখানে একটি স্পষ্ট স্ববিরোধিতা রয়েছে। ভারতের উপনিবেশ-বিরোধী আলোচনায় ব্রিটিশদের আসার আগের ভারতকে ‘সোনার পাখি’ বা বিশ্বের অন্যতম অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসেবে স্মরণ করা হয়। অথচ সেই সমৃদ্ধির বেশিরভাগ সময়ই ছিল সুলতানি ও মুঘল আমল। কেউ একই সাথে ব্রিটিশদের ধ্বংস করা সেই সম্পদের কথা বলবেন, আবার যে সভ্যতার অধীনে সেই সম্পদ গড়ে উঠেছিল তাকে ‘বহিরাগত’ বলে প্রত্যাখ্যান করবেন—এটি হতে পারে না।

একবার ইতিহাস থেকে মুসলিম শাসনকে আলাদা করে দিলে, মুসলিম সংস্কৃতি ভারতের অংশ না হয়ে ভারতের ওপর ‘ঘটে যাওয়া’ একটি ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়। তখন তাদের উত্তরসূরিরা নাগরিক হিসেবে থাকলেও, তাদের ঐতিহ্যটি এই রাষ্ট্রের কাছে ‘বিদেশি’ হয়ে পড়ে।

তবে কোনো সমাজকে একক ছাঁচে ফেলার এই চেষ্টা কেবল একটি সংখ্যালঘুর ওপর থেমে থাকে না। চিন্তাধারার সীমানা যখন ছোট হতে শুরু করে, তখন তা সার্বিক স্বাধীন চিন্তাকেও সংকুচিত করে।

সম্প্রতি আহমেদাবাদের একটি স্কুলে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাইয়ের "আই অ্যাম মালালা" এবং অ্যান ফ্রাঙ্কের "দ্য ডায়েরি অফ আ ইয়ং গার্ল" বই দুটি পাঠ্যতালিকায় রাখার কারণে চাপ সৃষ্টি করা হয়। পরবর্তীতে ছাত্র, শিক্ষক ও নাগরিকরা যখন এগুলো নিয়ে প্রকাশ্য পাঠের আয়োজন করেন, তখন হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর বাধার মুখে পড়েন।

একক সংস্কৃতির এই আগ্রাসন শেষ পর্যন্ত ভেতরের দিকেই আঘাত করে, যার প্রধান শিকার ভারতের মেধা ও চিন্তার বহুত্ববাদ। যে ভারতীয় সভ্যতা হাজার বছর ধরে নানা দর্শন, বিশ্বাস ও মতবাদের সহাবস্থান এবং বিতর্কের মধ্য দিয়ে গড়ে উঠেছিল, তা আজ নিজেরই এক সংকীর্ণ সংজ্ঞায় বন্দি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে।

এই জোরপূর্বক অভিন্নতা কেবল সংখ্যালঘুদেরই ছোট করে না; চূড়ান্ত বিচারে তা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজকেও মেধা ও চিন্তায় দরিদ্র করে তোলে।

সূত্র: ইনকিলাব 

  • সর্বশেষ