শখের বশে বা কাজের প্রয়োজনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ধরনের কৃত্রিম ছবি তৈরি করেন অনেকেই। একটিমাত্র কমান্ড বা প্রম্পট লিখে ছবি বা লেখা তৈরির সুযোগ থাকায় এআই চ্যাটবট ব্যবহারের চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। কিন্তু এই প্রযুক্তির আড়ালে লুকিয়ে আছে এক নীরব সমস্যা। এআই চ্যাটবটগুলোর কার্যক্রম পরিচালনার কাজে ব্যবহৃত ডেটা সেন্টারগুলোর তাপমাত্রা ঠান্ডা রাখতে প্রতিদিন প্রচুর পানির অপচয় হচ্ছে। বিশ্বের নানা প্রান্তে এ নিয়ে একাধিকবার বিক্ষোভও হয়েছে। তারপরও বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলেছে ডেটা সেন্টারের সংখ্যা।
ডেটা সেন্টারগুলোতে থাকা শক্তিশালী প্রসেসরগুলো কাজের কারণে অত্যন্ত গরম হয়ে ওঠে। অতিরিক্ত কাজের সময় প্রসেসরগুলোর ভেতরের তাপমাত্রা ১৭৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে। এই তাপ শোষণ করার জন্য ডেটা সেন্টারগুলো মূলত পানির ওপর নির্ভর করে। মানুষের শরীরের ঘাম যেভাবে শরীর ঠান্ডা রাখে, ঠিক একইভাবে বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ডেটা সেন্টার ঠান্ডা করা হয়।
এআই ব্যবহারে ঠিক কতটুকু পানি খরচ হয়, তা নিয়ে প্রযুক্তি বিশ্বে নানা ধরনের মত রয়েছে। এক গবেষণায় দাবি করা হয়েছে, একটি ছোট ই–মেইল লিখতে বা একটি প্রম্পটের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য ৫০০ মিলিলিটার পানি খরচ হয়। তবে প্রযুক্তি উন্নত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই চিত্র বদলে গেছে। গুগল জানিয়েছে তাদের জেমিনাই চ্যাটবটের একটি মাঝারি দৈর্ঘ্যের প্রম্পটের নির্দেশ বাস্তবায়নের জন্য মাত্র পাঁচ ফোঁটা পানি খরচ হয়। পরিমাণ কম মনে হলেও বিশ্বজুড়ে এআই ব্যবহারের ব্যাপক বৃদ্ধির কারণে এই ফোঁটা ফোঁটা পানিই বিশাল অঙ্কে রূপ নেয়। এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয়ের শক্তি সিস্টেম বিশেষজ্ঞ ফেংকি ইউ এবং তাঁর দল জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ডেটা সেন্টারগুলো বার্ষিক ৭৩১ বিলিয়ন থেকে ১ হাজার ১২৫ বিলিয়ন লিটার পানি খরচ করতে পারে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ পরিমাণটি নিউইয়র্ক সিটির বার্ষিক পানীয় সরবরাহের সমান।
এআই দিয়ে ছবি তৈরি করতে কতটা পানি ব্যবহৃত হচ্ছে তা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে। স্থপতি ও আলোকচিত্রী ফওজিয়া জাহান বলেন, এআই দিয়ে ছবি তৈরি কোনো অদৃশ্য জাদু নয়। এর পেছনে কাজ করে বিশাল ডেটা সেন্টার, শক্তিশালী কম্পিউটার ও গ্রাফিকস প্রসেসর। এসব যন্ত্র চালাতে প্রয়োজন বিপুল বিদ্যুৎশক্তি। আবার ডেটা সেন্টারের সার্ভারগুলো প্রচণ্ড তাপ উৎপন্ন করে। সেগুলো ঠান্ডা রাখতে প্রয়োজন হয় আরও শক্তি এবং অনেক ক্ষেত্রে প্রচুর পানি।
শুধু বিদ্যুৎ ও পানিই নয়, এআই প্রযুক্তি ব্যবস্থার পেছনে রয়েছে বিশাল অবকাঠামো। কম্পিউটার চিপ ও অন্যান্য যন্ত্র তৈরিতে প্রয়োজন হয় নানা ধরনের খনিজ ও প্রাকৃতিক সম্পদ। খনিজ উত্তোলন থেকে শুরু করে যন্ত্র উৎপাদন, পরিবহন এবং শেষ পর্যন্ত তা ফেলে দেওয়া প্রতিটি ধাপেরই রয়েছে পরিবেশগত প্রভাব। তবে এআই দিয়ে ছবি তৈরি করে আমরা পরিবেশের বড় ক্ষতি করে ফেলছি, এমন সরল সিদ্ধান্তে যাওয়া ঠিক হবে না। একটি ছবির শক্তি ও পানির ব্যবহার তুলনামূলকভাবে সামান্য হতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষ যখন প্রতিদিন অসংখ্য ছবি, ভিডিও ও অন্যান্য আধেয় বা কনটেন্ট তৈরি করছে, তখন সম্মিলিত চাহিদার পরিমাণ বড় হয়ে ওঠে।
ডেটা সেন্টারগুলো চালানোর জন্য প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদনেও অনেক পানি খরচ হয়। এমনকি কয়লা বা গ্যাস পুড়িয়ে টারবাইন ঘোরানোর পর বাষ্প ঠান্ডা করতে প্রচুর পানি লাগে। আর তাই বিশেষজ্ঞরা সৌর ও বায়ুবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের ওপর জোর দিচ্ছেন। এতে পানির ব্যবহার শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা সম্ভব। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোও হাত গুটিয়ে বসে নেই। অ্যামাজন, মাইক্রোসফট ও গুগলের মতো বড় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন লিকুইড কুলিং বা তরল শীতলীকরণ পদ্ধতি ব্যবহার করছে। এই পদ্ধতিতে পাইপের ভেতর পানি বা তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণকারী রাসায়নিক চালিয়ে সরাসরি প্রসেসর ঠান্ডা করা হয়। ফলে পানির অপচয় হয় না। বাইরে আবহাওয়া খুব গরম বা আর্দ্র হলে পাইপের চারপাশে সামান্য জল বাষ্পীভূত করে ঠান্ডা করার পদ্ধতি চালু করা হয়।
এনভিডিয়ার কর্মকর্তা জোশ পার্কার জানান, নতুন প্রজন্মের প্রসেসরগুলো অনেক বেশি তাপমাত্রায় কাজ করতে পারে। ফলে ঐতিহ্যগত পদ্ধতির চেয়ে অনেক গরম পানি দিয়েও এগুলো ঠান্ডা করা সম্ভব। অতিরিক্ত তাপপ্রবাহ ছাড়া ফ্যানের বাতাস দিয়েই এখন ডেটা সেন্টার ঠান্ডা রাখা যায়। এ ছাড়া যন্ত্রাংশ সরাসরি ঠান্ডা তরলে ডুবিয়ে রাখার নিমজ্জন কুলিং পদ্ধতি নিয়েও পরীক্ষা চলছে।
সূত্র: নবেল ম্যাগাজিন