সাবমেরিন আবিষ্কারের ইতিহাস খুবই চমকপ্রদ। আমাদের কাছে সাবমেরিন আধুনিক যুদ্ধজাহাজ হিসেবে পরিচিত। শত বছরের বেশি সময় ধরে বহু দেশের নৌবাহিনীতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে সাবমেরিন। তবে মানুষের কল্পনায় সাবমেরিনের ধারণা জন্ম নিয়েছিল বহু বছর আগেই। পানির নিচে লুকিয়ে চলতে পারে, এমন নৌযান তৈরির কল্পনাই ধীরে ধীরে বাস্তবে রূপ নেয়, আবিষ্কার হয় সাবমেরিন।
সাবমেরিন এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেন তা খুব গোপনে চলতে পারে এবং কারও নজরে না পড়ে। এই কারণেই আধুনিক সামরিক সাবমেরিন সাগরের অনেক গভীরে লুকিয়ে থেকে শত্রুর ওপর নজরদারি করতে পারে এবং গোপনে সামরিক অভিযান পরিচালনায় সক্ষম। তবে সাবমেরিন কেবল যুদ্ধের জন্যই তৈরি করা হয়েছে, বিষয়টি এমন নয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে সাবমেরিন। সাগরের গভীরতম অংশে গিয়ে তথ্য সংগ্রহ, ডুবে যাওয়া জাহাজ উদ্ধার ও দুর্ঘটনায় আটকে পড়া মানুষ উদ্ধারকাজেও সাবমেরিন ব্যবহার করা হয়।
সাবমেরিন বলতে এখন আমরা যেসব বিশাল, শক্ত ধাতব যন্ত্র কল্পনা করি, শুরুতে তা মোটেও এমন ছিল না। প্রথম দিকের সাবমেরিন ছিল ছোট, কাঠের তৈরি এবং দেখতে অনেকটাই সাধারণ। সময়ের প্রয়োজনে ধীরে ধীরে অত্যাধুনিক, বিশালকায় ও শক্তিশালী সাবমেরিনে রূপ নিয়েছে।
আদি সাবমেরিন
পানির নিচে চলতে পারে এমন জলচর যানের ধারণা খুবই পুরোনো। এসব নিয়ে এমন কিছু গল্প আছে যা ইতিহাস দিয়ে পুরোপুরি প্রমাণ করা যায় না। মুঘল কবি আমির খসরুর এক সচিত্র লেখায় উল্লেখ আছে, খ্রিষ্টপূর্ব ৩৩২ সালে টাইরনগর অবরোধের সময় আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ‘ডাইভিং বেলে’ চড়ে সাগরতলে নেমেছিলেন।
১৫৭৮ সালে সাবমেরিনের প্রাথমিক নকশা তৈরি করেন উইলিয়াম বৌর্ন নামে এক ইংরেজ। তবে সাবমেরিনটি আদৌ তৈরি করা হয়েছিল কি না তা নিশ্চিত জানা যায় না। সেটি ছিল চামড়ায় মোড়ানো চারদিকে আবদ্ধ কাঠের নৌকার নকশা। তখনকার হিসেবে এটি ছিল জটিল প্রযুক্তির; যেখানে স্ক্রু, অ্যাডজাস্টেবল প্লাঞ্জার অর্থাৎ পরিমাণমতো পানিতে নামানোর যন্ত্র ও ক্র্যাংক সেটের ব্যবহার ছিল।
১৬২০ সালে ডাচ্ উদ্ভাবক কর্নেলিস ড্রেবেল প্রথম সাবমেরিন তৈরি করেন। ইংল্যান্ডের রাজা জেমসের (প্রথম) পৃষ্ঠপোষকতায় তৈরি এই সাবমেরিন টেমস নদীতে চালানো হয়। দিকনির্দেশনার জন্য এতে বৈঠা ব্যবহার করা হয়। ১৬২০ থেকে ১৬২৪ সালের মধ্যে এর আরও উন্নত দুটি সংস্করণ লন্ডনের টেমস নদীতে পরীক্ষা করা হয়।
এসব সাবমেরিন তখনকার তুলনায় খুবই আধুনিক ছিল, সময়ের বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের সীমাকে ‘অনেকটা ছাড়িয়ে গিয়েছিল’ বলা যায়। পানির গভীরতা মাপার জন্য পারদভিত্তিক যন্ত্র ব্যবহার করেন ড্রেবেল। সাবমেরিনের ভেতরে রাসায়নিক পদ্ধতিতে অক্সিজেন সরবরাহের ব্যবস্থাও করেছিলেন তিনি।
সেই শতকের শেষ দিকে ফরাসি প্রকৌশলী ডানি পাপাঁ দুটি ধাতব সাবমেরিন তৈরি করেন। এর কিছুদিনের মধ্যেই ইউরোপজুড়ে বহু উদ্ভাবক সাবমেরিনের নকশা বানিয়ে পেটেন্ট বা স্বত্ব নিতে শুরু করেন। সাবমেরিন যে ভবিষ্যতে সামরিক কাজে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে, তা তখন সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
অষ্টাদশ ও উনবিংশ শতকের সাবমেরিন
১৭২০ সালে রুশ সম্রাট পিটার দ্য গ্রেটের আদেশে প্রথম সামরিক সাবমেরিন তৈরি করেন ইয়েফিম নিকোনভ। খুব সন্তর্পণে শত্রুর জাহাজের কাছে গিয়ে আক্রমণে সক্ষম করে নকশাটি তৈরি করা হয়। এতে এয়ারলকও ছিল অর্থাৎ সাগরের ওপরে উঠে সাবমেরিনের উপরিভাগ দিয়ে বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থা ছিল। তবে ১৭২৫ সালে পিটারের মৃত্যুর কারণে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।
১৭৭৬ সালে ‘দ্য টার্টল’ নামে আমেরিকায় প্রথম সাবমেরিন তৈরি হয়। ইতিহাসে অন্যতম আলোচিত সাবমেরিন এটি। সাফল্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সাবমেরিনের ইতিহাসে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
১৮০০ সালে আমেরিকার প্রকৌশলী রবার্ট ফুলটনের নকশায় তৈরি ফরাসি সাবমেরিন ‘নটিলাস’ প্রথম সফল যুদ্ধ সাবমেরিন হিসেবে পরিচিতি পায়।
এরপর পুরো উনবিংশ শতকজুড়ে রাশিয়া, ফ্রান্স, জার্মানি ও আমেরিকায় পরীক্ষামূলক সাবমেরিন তৈরি হতে থাকে। ১৮৩৭ সালে ‘সুবমারিনো হিপোপোতামো’ নামে লাতিন আমেরিকায় প্রথম সাবমেরিন তৈরি হয়। ইকুয়েডরে এর সফল পরীক্ষা হয়। তবে সরকারি আগ্রহের অভাবে প্রকল্পটি বাতিল হয়ে যায়।
১৮৫০ সালে বাভারিয়ান উদ্ভাবক ও প্রকৌশলী ভিলহেল্ম বাউয়ার ‘ব্রান্টটাউখার (Brandtaucher)’ নামের সাবমেরিন তৈরি করেন। এর উদ্দেশ্য ছিল জার্মানির ওপর ডেনমার্কের আরোপিত নৌ অবরোধ ভাঙা। তবে অর্থায়নের সীমাবদ্ধতার কারণে ব্রান্টটাউখারকে মূল পরিকল্পনার চেয়ে ছোট ও সীমিত সক্ষমতার সাবমেরিনে পরিণত হয়। এ কারণেই সাবমেরিনটি ব্যর্থ হয় এবং শেষ পর্যন্ত ডুবে যায়। তবে তিনজন ক্রুর সবাই নিরাপদে বেরিয়ে আসতে সক্ষম হন। পরে সাবমেরিনটি উদ্ধার করা হয়। এটি সবচেয়ে পুরোনো সাবমেরিন হিসেবে সংরক্ষিত আছে।
১৮৬৩ সালে, ফরাসিরা প্রথম এমন একটি সাবমেরিন নির্মাণ করে যার চলাচলের জন্য মানবশক্তির ওপর নির্ভর করতে হতো না। ‘প্লঁজখ (Plongeur)’ নামের এই সাবমেরিন সংকুচিত বায়ু ব্যবহার করে চালিত হতো। তবে এর নিয়ন্ত্রণ বেশ কঠিন ছিল এবং এর চালনক্ষমতাও খুব একটা ভালো ছিল না।
১৮৬৪ সালে ‘ইকতিনেও–২ (Ictineo II)’ সাগরে নামানো হয়। কাতালান উদ্ভাবক নার্সিস মোন্তুরিওল নির্মিতি এই সাবমেরিন শুরুতে মানবশক্তিচালিত ছিল। ১৮৬৭ সালে এটিকে সংস্কার করে এতে কমবাসন ইঞ্জিন সংযোজন করা হয়। এর ফলে এটি জ্বালানি তেল পুড়িয়ে উৎপাদিত শক্তিচালিত বিশ্বের প্রথম সাবমেরিনে পরিণত হয়।
আমেরিকার গৃহযুদ্ধে ইউনিয়ন অর্থাৎ অখণ্ড আমেরিকার পক্ষে শিল্পবান্ধব রাজ্যসমূহ এবং কনফেডারেসি অর্থাৎ কৃষি ও দাসব্যবস্থাভিত্তিক রাজ্যসমূহ-উভয় পক্ষই সাবমেরিন ব্যবহার করে। যুদ্ধে ইউনিয়ন জয়ী হলেও কনফেডারেসির সাবমেরিন এইচএল হানলি প্রথমবারের মতো শত্রুর জাহাজ ডুবিয়ে সক্ষমতার প্রমাণ দেয়।
১৮৬৩ ও ১৮৬৬ সালের মধ্যে জার্মান-আমেরিকান প্রকৌশলী জুলিয়াস এইচ ক্রোল দ্য এক্সপ্লোরার নামের সাবমেরিন বানান। এটি আধুনিক সুবিধার প্রথম সাবমেরিন।
এই সময়েই ব্যাটারি, কমবাসন ইঞ্জিন ও স্টিম ইঞ্জিন ব্যবহার করে সাবমেরিন প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে যায়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরুর সময় সব বড় বড় শক্তিধর দেশের নিজস্ব সাবমেরিন বহর ছিল এবং যুদ্ধের সময় সেগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
দুই বিশ্বযুদ্ধে সাবমেরিন
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের শুরুতে ব্রিটেনের ছিল ৭৪টি সাবমেরিন। তখন তাদেরটাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাবমেরিন বহর। অন্যদিকে জার্মানির ছিল মাত্র ২০টি সাবমেরিন। কিন্তু জার্মান ইউ বোটস নৌযুদ্ধে নতুন অধ্যায় শুরু করে। তারা মিত্রশক্তির নৌবহরের ব্যাপক ক্ষতিসাধন করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে জার্মানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ইউ বোটকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়। তারা ‘ওলফপ্যাক’ নামে নতুন কৌশল কাজে লাগায়। এই কৌশলে স্বল্পসংখ্যক ইউ বোট শত্রুর ওপর নজর রাখে এবং প্রয়োজন হলে বেশিসংখ্যক ইউ বোট ডেকে এনে একসঙ্গে হামলা চালায়। আমেরিকানরাও প্রশান্ত মহাসাগরে জাপানিদের বিরুদ্ধে সাবমেরিন ব্যবহার করে বড় ধরনের সাফল্য অর্জন করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সাবমেরিন
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর পরমাণু যুগে প্রবেশ করে বিশ্ব। তখন দুই প্রধান পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্র আর সোভিয়েত ইউনিয়ন স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে; প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে প্রযুক্তির ব্যাপক অগ্রগতি হয়। পরমাণু শক্তির ইঞ্জিনচালিত সাবমেরিন মাসের পর মাস পানির নিচে থাকতে পারে এবং পরমাণু অস্ত্রও বহন করতে পারে। এমনকি পানির নিচেই এই সাবমেরিন থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব।
আধুনিক সামরিক সাবমেরিনগুলো আকারে বেশ বড়। রাশিয়ার টাইফুন ক্লাস বিশ্বের সবচেয়ে বড় সাবমেরিন, এর দৈর্ঘ্য প্রায় ১৭৫ মিটার আর প্রস্থ ২৩ মিটার।
বিশ্ব রাজনীতি ক্রমশ উত্তপ্ত হচ্ছে, সামরিক সাবমেরিনের গুরুত্ব আরও বাড়ছে। সাবমেরিন চালানোর কাজ জটিল। তাই মাঝে মাঝে দুর্ঘটনাও ঘটে। ২০০০ সালে রাশিয়ার সাবমেরিন কার্সক ব্যারন সাগরে ডুবে যায়। এতে ১১৮ জন ক্রু মারা যান। এটি এখন পর্যন্ত ইতিহাসের সবচেয়ে বড় দুর্ঘটনা।
তবে সাবমেরিন শুধু যুদ্ধের অস্ত্র নয়, বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ২০১৯ সালে ভিক্টর ভেসকোভো নিজের তৈরি সাবমেরিন ‘ডিএসভি লিমিটিং ফ্যাক্টর’ চালিয়ে সাগরের গভীরতম অংশ (৩৫,৮৪৯ ফুট) মারিয়ানা ট্রেঞ্চে যান। এটি এখন পর্যন্ত সবচেয়ে গভীর ডুব।
১৯৬০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য একই কাজ করেছিলেন ডন ওয়ালশ ও জ্যাক পিকার্ড। ২০১২ সালে পরিচালক জেমস্ ক্যামেরন তার ‘ডিপসি চ্যালেঞ্জার’ নিয়ে সাগরতলে। আর সাগরতলের গভীরতম জায়গায় প্লাস্টিকের ব্যাগ পেয়েছিলেন ভেসকোভো।
সাবমেরিন আধুনিক যুদ্ধ ও বিজ্ঞানের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ভবিষ্যতের যুদ্ধে এগুলো হবে আরও সূক্ষ্ম, শক্তিশালী ও দ্রুতগামী; অস্ত্র হিসেবে হবে আরও ভয়ংকর। বিজ্ঞানের কাজে নতুন শক্তিশালী উপকরণ আর উন্নত যন্ত্র ব্যবহার করে সাবমেরিন সমুদ্রের গভীরতম অংশে পৌঁছাবে এবং এমন জায়গায় যাবে, যেখানে মানুষ আগে কখনো যায়নি।
সূত্র: আজকের পত্রিকা