শিরোনাম
◈ বাংলা-ইংরেজি মাধ্যমের কারিকুলামে সামঞ্জস্য আনা হবে: ববি হাজ্জাজ ◈ যেকোনও মূল্যে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হবে: স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী  ◈ বনানীতে ২০ বর্গফুট কবরের জায়গা ৪ কোটি টাকা, ফ্ল্যাটের দামের কাছাকাছি শেষ ঠিকানার খরচ ◈ ইউক্রেন যুদ্ধে ৫ লাখের বেশি রা‌শিয়ার সেনা সদস‌্য নিহত : ব্রিটিশ প্রতিরক্ষা প্রধান ◈ বিশ্ব ক্রীড়া র‍্যাংকিংয়ে ৪৮ ধাপ পতন, দক্ষিণ এশিয়ায় সবাইকে পেছনে ফেলে পিছিয়ে বাংলাদেশ ◈ বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের যুক্তরাষ্ট্রে এক সেমিস্টার পড়াশোনার সুযোগ, আবেদন ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ◈ মানুষের বর্জ্য শোধন করে সিমেন্টে মিশিয়ে কংক্রিট ৪২% বেশি শক্তিশালী করলেন ভারতীয় বিজ্ঞানীরা! ◈ কিশোরগঞ্জে গর্ভে থাকতেই সন্তান বিক্রির অভিযোগ, কটিয়াদীতে ৩ বছরে ৬০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায় ৪ শিশু বেচাকেনা! ◈ ভারতের সঙ্গে মতপার্থক্য হলে সামাল দেবে চীন! জিনপিং দিল্লি পৌঁছোনোর আগেই দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে মুখ খুললো বেজিং ◈ পশু জবাইয়ে কড়াকড়িতে পশ্চিমবঙ্গে মাংসের সংকট, কসাইখানা বন্ধে বিপাকে মাংস ব্যবসায়ীরা!

প্রকাশিত : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:০২ দুপুর
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০১:০২ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিশ্ব ক্রীড়া র‍্যাংকিংয়ে ৪৮ ধাপ পতন, দক্ষিণ এশিয়ায় সবাইকে পেছনে ফেলে পিছিয়ে বাংলাদেশ

ক্রিকেট ও ফুটবল ঘিরে দেশে উন্মাদনার কমতি নেই। বড় ম্যাচে দর্শক-সমর্থকদের আগ্রহও ব্যাপক। কিন্তু সামগ্রিক ক্রীড়া পারফরম্যান্সে এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না আন্তর্জাতিক র‍্যাংকিংয়ে। বরং বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। সূত্র: বণিক বার্তা প্রতিবেদন

ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস র‍্যাংকিংসের (ডব্লিউএসআর) সর্বশেষ প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বিশ্বের ২০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম। দক্ষিণ এশিয়ার নেপাল, শ্রীলংকা, পাকিস্তান এমনকি ভুটানের চেয়েও পিছিয়ে রয়েছে বাংলাদেশ। র‍্যাংকিংয়ে ভারতের অবস্থান ৪৬তম। পাকিস্তান ৮৯, নেপাল ১১৩ ও শ্রীলংকা ১২৬তম অবস্থানে রয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার ছোট দেশ ভুটানও বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে, তাদের অবস্থান ১৬৪তম।

গত কয়েক বছরের র‍্যাংকিং পর্যালোচনা করলেও বাংলাদেশের অবনমনের চিত্র স্পষ্ট হয়। ২০২৫ সালে অবস্থান ছিল ১২৭তম, ২০২৪ সালে ১২২তম, ২০২৩ সালে ১১৯তম, ২০২২ সালে ১২৩ ও ২০২১ সালে ১২৮তম। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে র‍্যাংকিংয়ে ৪৮ ধাপ নিচে নেমেছে বাংলাদেশ।

ক্রীড়াসংশ্লিষ্টদের মতে, এ অবনমন কোনো একটি প্রতিযোগিতা বা নির্দিষ্ট সময়ের ব্যর্থতার ফল নয়। বরং খেলোয়াড় তৈরির কাঠামো, প্রশিক্ষণ, অবকাঠামো, প্রতিভা অন্বেষণ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ঘাটতির সামগ্রিক প্রতিফলন এটি।

জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক শফিকুল হক হীরা বলেন, ‘আমি তো সমস্যা দেখছি সর্বত্র। আমাদের গ্রাসরুট থেকে শুরু করে খেলোয়াড় উঠে আসার যে ধাপগুলো আছে, সেখানে বড় গলদ দেখি। খেলোয়াড় বাছাই থেকে শুরু করে তাদের পরিচর্যা, বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি করতে যে ধরনের সুযোগ-সুবিধা তাদের দিতে হবে, সেটি কি আমাদের আছে?’

তার মতে, খেলোয়াড় তৈরির অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানও (বিকেএসপি) প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারছে না। সেখান থেকে হাতে গোনা কয়েকজন খেলোয়াড় উঠে আসছেন। প্রতিভাবানদের বিশ্বমানের পর্যায়ে গড়ে তুলতেও ব্যর্থতা রয়েছে।

শফিকুল হক হীরা বলেন, ‘আমাদের খেলোয়াড় তৈরির কারখানা হতে পারত যে বিকেএসপি, সেটি তো ঠিকমতো পারফর্ম করছে না। হাতে গোনা দু-একজন খেলোয়াড় সেখান থেকে বের হয়ে আসে। আর যারা মেধাবী, ভালো করার যোগ্যতা আছে, তাদের আমরা গড়তে পারি না ঠিকমতো। আমি তো আলিমের (সাবেক অ্যাথলেট কাজী আব্দুল আলিম) পর ভালো মানের কোনো অ্যাথলেট আসলে দেখিনি। তাই বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরি কিংবা বিশ্ব অঙ্গনে লড়াই করার মতো সক্ষমতা তৈরি করতে চাইলে এ জায়গাটি নিয়ে আমাদের অনেক কাজ করার আছে।’

ডব্লিউএসআরের র‍্যাংকিংটি মূলত বিভিন্ন দেশের সামগ্রিক ক্রীড়া পারফরম্যান্স মূল্যায়নের একটি গবেষণাভিত্তিক সূচক। ২০১৪ সাল থেকে প্রতি বছর প্রকাশিত এ র‍্যাংকিংয়ে জাতীয় অলিম্পিক কমিটি (এনওসি) রয়েছে—এমন দেশগুলোর ক্রীড়া পারফরম্যান্স বিবেচনায় নেয়া হয়। স্পোর্টঅ্যাকর্ড স্বীকৃত বিভিন্ন খেলার পাশাপাশি অপেক্ষাকৃত নতুন বা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি না পাওয়া, কিন্তু আন্তর্জাতিকভাবে জনপ্রিয় খেলাও এর আওতায় থাকে।

ক্রীড়া বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সমস্যার একটি বড় দিক হলো ক্রিকেটকেন্দ্রিকতা। ক্রিকেট ঘিরে দেশে দর্শক, পৃষ্ঠপোষকতা, সম্প্রচারস্বত্ব ও বাণিজ্যিক কার্যক্রমের মাধ্যমে একটি শক্তিশালী ক্রীড়া অর্থনীতি গড়ে উঠলেও অন্য খেলাগুলো সে সুযোগ পায়নি। ফলে ঐতিহ্যবাহী অনেক খেলা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে কিংবা প্রতিযোগিতা সক্ষমতা হারাচ্ছে। অথচ ক্রিকেটেও এখন পর্যন্ত বড় কোনো আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় কাঙ্ক্ষিত সাফল্য পায়নি বাংলাদেশ। ফলে একটি খেলাকে ঘিরে তৈরি হওয়া জনপ্রিয়তা সামগ্রিক ক্রীড়া উন্নয়নের বিকল্প হতে পারছে না।

দেশে ক্রীড়াসামগ্রী, টিকিট বিক্রি, সম্প্রচারস্বত্ব, পৃষ্ঠপোষকতা, বিজ্ঞাপন ও পণ্য বিপণনকে কেন্দ্র করে এরই মধ্যে বড় একটি ক্রীড়া অর্থনীতি তৈরি হয়েছে। বিভিন্ন বাজারের হিসাব অনুযায়ী, এর আকার বছরে ৫-৭ হাজার কোটি টাকা বা তারও বেশি হতে পারে। পেশাদার লিগ, আধুনিক অবকাঠামো, কার্যকর সম্প্রচার ব্যবস্থা এবং ক্রিকেটের বাইরে অন্যান্য খেলাকে বাণিজ্যিকভাবে বিকশিত করা গেলে এ বাজার আগামী কয়েক বছরে ১০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে ক্রীড়া অর্থনীতির এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে হলে শুধু দর্শক ও ভোক্তার আগ্রহকে পুঁজি করলেই হবে না বলে মনে করেন ক্রীড়াসংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, অলিম্পিকের বিভিন্ন ইভেন্টসহ অ্যাথলেটিকস, সাঁতার, শুটিং, আর্চারি, জিমন্যাস্টিকস, ভারোত্তোলন ও অন্যান্য খেলায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ, বয়সভিত্তিক প্রশিক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের কোচিং নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিভা খুঁজে বের করা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পৌঁছা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াকে নিতে হবে পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনার আওতায়।

বৈশ্বিক ক্রীড়ার প্রধান আসরগুলোর অন্যতম অলিম্পিক; যেখানে যুক্তরাষ্ট্র, চীন পরাশক্তি। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান অন্যতম সেরা দল। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতও অনেক সাফল্য পেয়ে আসছে। যদিও ১৯৮৪ সাল থেকে এ আসরে নিয়মিত অংশ নিলেও এখনো কোনো পদক জিততে পারেনি বাংলাদেশ। মূলত ‘ওয়াইল্ড কার্ড’ বা বিশেষ কোটায় অংশ নেন বাংলাদেশী ক্রীড়াবিদরা। এর মধ্যে ২০১৬ সালের রিও অলিম্পিকে গলফ খেলায় সরাসরি যোগ্যতা অর্জন করেছিলেন বাংলাদেশের সিদ্দিকুর রহমান। এছাড়া টোকিও ও প্যারিস অলিম্পিকে কিছু অ্যাথলেট অংশ নিলেও সরাসরি বা মেরিটের ভিত্তিতে খেলার সুযোগ পাননি।

এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস, সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ও ক্রিকেট বিশ্বকাপে অংশ নিয়ে যৎসামান্য সাফল্য এসেছে লাল-সবুজদের। এর মধ্যে এশিয়ান গেমসে এখন পর্যন্ত ১২টি পদক জিতেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে একটি স্বর্ণ, পাঁচটি রৌপ্য ও ছয়টি ব্রোঞ্জপদক। একমাত্র স্বর্ণপদকটি আসে ২০১০ সালের গুয়াংজু এশিয়ান গেমসে ক্রিকেট থেকে। অন্যদিকে কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলো নিয়ে আয়োজিত কমনওয়েলথ গেমসে মোট আটটি পদক জিতেছে বাংলাদেশ। যার মধ্যে দুটি স্বর্ণ, চারটি রৌপ্য ও দুটি ব্রোঞ্জপদক রয়েছে।

শুটিং এখন ঐতিহ্যর কঙ্কাল। তবে এর রয়েছে সোনালি অতীত। ২০১০ সালে সাউথ এশিয়ান (এসএ) গেমসে নারীদের ১০ মিটার এয়ার রাইফেলসে স্বর্ণ জেতেন শারমিন আক্তার রত্না। অলিম্পিকেও তিনি বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করেন। দেশের ক্রীড়াঙ্গনে সঠিক পরিকল্পনা জরুরি উল্লেখ করে শারমিন আক্তার রত্না বলেন, ‘দেশে ক্রিকেটকে যেভাবে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবং এখানে যে বিনিয়োগ করা হয়েছে সেটি অন্য কোনো খেলায় হয়নি। যার কারণে এসব খেলা মনোযোগ হারিয়েছে। এখন আর কেউ শুটিং, আর্চারি কিংবা দাবায় আসতে চান না। কিন্তু ক্রিকেটে আমরা এখনো খুব ভালো দল হয়ে উঠতে পারিনি। অলিম্পিকের মতো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে আমাদের প্রতিনিধিত্ব করতে হয় শুটিং, আর্চারি, কাবাডির মতো ক্রীড়ায়। কিন্তু এসব খেলায় আমরা অনেক পিছিয়ে রয়েছি। কারণ এখানে মনোযোগ কম এবং কেউ বিনিয়োগ করে না। আমাদের ভালো করতে হলে প্রয়োজন বিদেশী অভিজ্ঞদের নিয়ে আসা এবং পরিকল্পনা নির্দিষ্ট করা।’

শুটিং, আর্চারির মতো সুখবর নেই দাবায়ও। ২০০৮ সালে এনামুল হোসেন রাজীবের পর ১৮ বছর ধরে বাংলাদেশ নতুন কোনো গ্র্যান্ডমাস্টার (জিএম) পায়নি। একই সময়ে ভারতে জিএমের সংখ্যা ১৮ থেকে বেড়ে হয়েছে ৮৯। তরুণ ফাহাদ রহমান ও মনন রেজা অবশ্য এ পথে আছেন।

অন্যদিকে ‎‎গত ২৭ জুলাই গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসে বাংলাদেশের দ্রুততম মানব ইমরানুর রহমান ১০০ মিটার স্প্রিন্টে হিট থেকেই বাদ পড়েন। টুর্নামেন্টে অংশ নেয়া মোট ৭৩ স্প্রিন্টারের মধ্যে তিনি হয়েছেন ২৭তম। বৈশ্বিক কিংবা আঞ্চলিক আসরে এমনই চিত্র দেশের অ্যাথলেটিকসের।

এসব ক্রীড়ার পাশাপাশি পিছিয়ে পড়েছে ফুটবলও। বাংলাদেশে ফুটবলের স্বর্ণযুগ বলা হয় ১৯৯০-এর দশককে। সে সময় ঢাকায় আবাহনী-মোহামেডানের দ্বৈরথ ছিল তরুণদের ‘ক্রেজ’। ঢাকার ক্লাব ছাড়া ভারতের ক্লাবেও খেলতে যেতেন বাংলাদেশীরা। মোনেম মুন্না, আফজাল আহমেদ, কায়সার হামিদ কিংবা ইমতিয়াজ আহমেদ নকীবরা ছিলেন ফুটবলের তারকা। তবে বৈশ্বিক আসর হিসেবে প্রথমবারের মতো ২০০৩ সালে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ ফাইনালে মালদ্বীপকে হারিয়ে জয় পাওয়াই বাংলাদেশের একমাত্র সাফল্য। এছাড়া ১৯৯৯ ও ২০০৫ সালে রানার্সআপ হয় লাল-সবুজরা।

এর পর থেকে যেন হারিয়ে যেতে শুরু করে বাংলাদেশের ফুটবল। মান পড়ে যাওয়ায় দর্শকও হারাচ্ছে ফুটবল। বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার সর্বশেষ র‍্যাংকিংয়ে বাংলাদেশ পুরুষ দলের অবস্থান ১৮১তম। বিপরীতে জাতীয় নারী ফুটবল দলের অবস্থান ১০৭তম। নারীরা ২০২২ ও ২০২৪ সালে টানা দুবার সাফ উইমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপ চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৬ সালে তারা প্রথমবারের মতো এএফসি এশিয়ান কাপে খেলে ইতিহাস গড়ে। অথচ নারী ফুটবলারদের সুযোগ-সুবিধা ক্রিকেটারদের তুলনায় খুবই নগণ্য।

১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফি জয় ও ২০০০ সালে টেস্ট যাত্রার পর থেকে ক্রিকেটই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা। বাকি খেলা যেন ক্রমেই গৌরব হারিয়ে ফেলছে। যদিও ক্রিকেট থেকে এখনো আসেনি কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফি। অন্যদিকে স্বাধীনতার পর থেকে জাতীয়ভাবে হকি খেলা শুরু করলেও নেই কোনো বড় সফলতা। জুনিয়র পর্যায়ে কিছুটা সফলতা এলেও মূল দলে এখনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে যেতে পারেনি বাংলাদেশ। টার্ফের খেলা কিংবা সাফল্যের গল্প নয়, বরং ফেডারেশনে ক্ষমতার রেস কিংবা অভ্যন্তরীণ রাজনীতিই যেন সারা বছর সংবাদ শিরোনাম হয়ে থাকে।

দেশের ক্রিকেট ও ফুটবল ছাড়া অন্য খেলাধুলাকে এগিয়ে নিতে হলে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে মনে করেন সাবেক তারকা খেলোয়াড় ও হকি ফেডারেশনের যুগ্ম সম্পাদক আরিফুল হক প্রিন্স। তিনি বলেন, ‘বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে এভাবে পিছিয়ে যাওয়া উদ্বেগজনক। পিছিয়ে যাওয়ার মূল কারণ আমরা টার্গেটলেস এগোচ্ছি। আমাদের টার্গেটে আসতে হবে। কয়েকটি খেলাকে সিলেক্ট করে সেগুলোকে নিয়ে এগোতে হবে। তাহলে ভালো করা যাবে। খেলাধুলাকে অর্থনৈতিকভাবে অবদান রাখতে পারে এমন যোগ্য করতে হলে বিনিয়োগ করতে হবে। স্পোর্টস মানে ইনভেস্টমেন্ট। এটি সরকার এককভাবে পারবে না, আবার স্পন্সরের ওপর নির্ভর করলেও হবে না। দুই পক্ষকে সম্পৃক্ত করে ন্যূনতম ১০ বছরের পরিকল্পনা নিয়ে এগোতে হবে। তাহলে কিছু ফলাফল পাওয়া যেতে পারে। এছাড়া সম্ভব নয়।’

একসময় দেশে খেলাধুলার অন্যতম আকর্ষণ ছিল স্থানীয় পর্যায়ে অনুষ্ঠিত জেলা, উপজেলা, বিভাগ ও স্কুল পর্যায়ে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্ট। যেখান থেকে প্রতি বছর উঠে এসেছে খ্যাতিমান সব খেলোয়াড়। তবে গত দুই দশকে এ পাইপলাইন সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। নানা অব্যবস্থাপনা ও ভালো অবকাঠামোর অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে অনেক স্টেডিয়াম। কোনো কোনো স্টেডিয়াম তো এখন গরু-ছাগলের চারণভূমিতেও পরিণত হয়েছে! কোথাও বসছে হাটবাজার।

চট্টগ্রামের এমএ আজিজ স্টেডিয়ামটি ২০২৫ সালে ২৫ বছরের জন্য বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কাছে বরাদ্দ দেয়া হয়। এরপর সেখানে খেলাধুলা এখন কার্যত বন্ধ রয়েছে। একই অবস্থা বগুড়ার শহীদ চান্দু স্টেডিয়াম, নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা স্টেডিয়াম ও খুলনা বিভাগীয় স্টেডিয়াম। এসব স্টেডিয়ামে একসময় আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হলেও প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে অকেজো পড়ে আছে, নষ্ট হচ্ছে কোটি টাকার সম্পদ আর খেলার সুযোগ হারাচ্ছে কিশোর ও তরুণরা।

শহীদ চান্দু স্টেডিয়ামের ভেন্যু ব্যবস্থাপক জামিলুর রহমান বণিক বার্তাক বলেন, ‘২০০৬ সালের পর থেকে বগুড়ার স্টেডিয়ামে কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়নি। ২০২৩ সালে এ স্টেডিয়ামে ক্রিকেট ভেন্যু বাতিল করে বিসিবি। এরপর আর কোনো সংস্কারের উদ্যোগ নেয়া হয়নি।’

সাবেক অ্যাথলেট ও খ্যাতনামা ক্রীড়া সংগঠক নজরুল ইসলাম রুমি মনে করেন বাংলাদেশের ক্রীড়া এখনো পিছিয়ে থাকার কারণ প্রতিযোগিতার সক্ষমতার অভাব। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের ক্রীড়াক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমরা র‍্যাংকিং বা আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় নিজেদের অবস্থান নিয়ে যথেষ্ট চিন্তা করি না। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিলেও প্রতিযোগিতার পরিধি ও মান অনেক ক্ষেত্রেই সীমিত। বিশেষ করে জুনিয়র ও নারী পর্যায়ে কিছু সাফল্য থাকলেও সিনিয়র পর্যায়ে আমরা পিছিয়ে। আবার যেসব ইভেন্টে মেডেল পাই, তার অনেকগুলোতেই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা সীমিত। একই সঙ্গে কিছু কম প্রতিযোগিতার খেলায় সাফল্য পেলেই সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের ক্রীড়ার উন্নতি হয়েছে—এমন ধারণা থেকেও বেরিয়ে আসতে হবে।’

বাংলাদেশের ক্রীড়া জগতে গত কয়েক দশকে সফলতা না এলেও প্রতিটি ফেডারেশনকে রাজনৈতিকীকরণ করা হয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। ক্রিকেট, ফুটবল, হকিসহ প্রায় সব ক্রীড়া ফেডারেশনে দায়িত্ব পান রাজনৈতিক নেতারা। গত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের জুলাই পর্যন্ত সাত ধাপে ৪৭টি জাতীয় ক্রীড়া ফেডারেশনে অ্যাডহক কমিটি গঠন করা হয়েছিল। এতে ক্রীড়াঙ্গনজুড়ে অস্থিরতা ছিল। সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সিদ্ধান্তে এ বছর শুরুর দিকে ভারতে অনুষ্ঠিত টি-২০ বিশ্বকাপেও খেলতে যায়নি বাংলাদেশ। এতে দেশে-বিদেশে তীব্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়। আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল ও ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিসিআই) সঙ্গে সম্পর্কে ফাটল ধরার আতঙ্কও পেয়ে বসে টাইগার সমর্থকদের মধ্যে।

ডব্লিউএসআরের তথ্যমতে, অলিম্পিক ও নন-অলিম্পিক ক্রীড়ার র‍্যাংকিংয়ে বিশ্বের ২০২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৭৫তম এবং পয়েন্ট মাত্র ৩ হাজার ৪৩৮। যেখানে র‍্যাংকিংয়ে শীর্ষে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির পয়েন্ট ২ লাখ ৯৯ হাজার ৭১২! যুক্তরাষ্ট্রের পরে রয়েছে ইতালি, কানাডা, চীন, অস্ট্রেলিয়া, নরওয়ে, ফ্রান্স, জাপান, সুইডেন ও জার্মানি।

ওয়ার্ল্ড স্পোর্টস র‍্যাংকিংয়ে উন্নতি করতে চাইলে জাতীয় পর্যায়ের পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ের একাডেমি ও ফেডারেশনগুলো শক্তিশালী করার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করেন সাবেক ক্রীড়াবিদ রফিকুল ইসলাম কামাল। তিনি বলেন, ‘বিগত কয়েক দশকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ সেভাবে কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। বিশ্ব র‍্যাংকিংয়ে অবদান রাখতে হলে স্থানীয়ভাবে খেলোয়াড় তুলে আনতে হবে। সেজন্য জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, বিভিন্ন ক্রীড়ার ফেডারেশন, বিকেএসপি ও একাডেমিগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। এটি করা গেলে আন্তর্জাতিকভাবে কয়েক বছরের মধ্যে ভালো একটা ফলাফল দেখা যাবে।’

এ অবস্থায় জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মো. আমিনুল হক। তিনি বলেন, ‘ক্রিকেট ছাড়া অন্যান্য খেলা পিছিয়ে পড়ার বড় কারণ খেলোয়াড়দের ভবিষ্যৎ ও আর্থিক নিরাপত্তাহীনতা। তাই সরকার খেলাধুলাকে কেবল আনন্দ বা শখের জায়গায় না রেখে স্থায়ী পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছে। তাদের জন্য মাসিক ক্রীড়া ভাতার ব্যবস্থা করেছে। এর সঙ্গে যেসব খেলায় আন্তর্জাতিক বা অলিম্পিক পর্যায়ে বাংলাদেশের পদক জয়ের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে (যেমন শুটিং, আর্চারি, দাবা, হকি), সেগুলোকে অগ্রাধিকারের তালিকায় এনে “‍স্পেশাল অ্যাকশন প্ল্যান” নেয়া হচ্ছে। নতুন কুঁড়ি সেই পরিকল্পনারই একটি অংশ। এখান থেকেই ভবিষ্যতে বাংলাদেশকে প্রতিনিধিত্ব করার মতো অনেক খেলোয়াড় বের হবে।’

 

  • সর্বশেষ