২০২৬ বিশ্বকাপের কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। আর এই মাহেন্দ্রক্ষণকে সামনে রেখে ফুটবলপ্রেমীদের নজর এখন বিশ্বকাপের দীর্ঘ ৯৬ বছরের ইতিহাসের দিকে। ১৯৩০ থেকে ২০২২ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত ২২টি আসরের পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করে তৈরি করা হয়েছে ‘অলটাইম র্যাঙ্কিং’। যেখানে সবার ওপরে অবস্থান করছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। সাম্প্রতিক সাফল্যে এ তালিকার শীর্ষ তিনে জায়গা করে নিয়েছে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাও।
বিশ্বকাপের র্যাঙ্কিং করা হয়েছে একটি অভিন্ন পয়েন্ট পদ্ধতির মাধ্যমে। যেখানে সব আসরের জন্য জয়ের ক্ষেত্রে ৩ পয়েন্ট এবং ড্রয়ের জন্য ১ পয়েন্ট ধরা হয়েছে। এই ঐতিহাসিক র্যাঙ্কিংয়ে প্রথমে বিবেচনায় আসে মোট পয়েন্ট। যদি দুই দলের পয়েন্ট সমান হয়, তাহলে দ্বিতীয় টাইব্রেকার হিসেবে ব্যবহৃত হয় গোল ব্যবধান, অর্থাৎ গোল করেছে কত এবং হজম করেছে কত, তার পার্থক্য। এরপরও সমতা থাকলে দেখা হয় মোট গোলের সংখ্যা।
চলুন এক নজরে দেখে নিই সেরা পাঁচ দল-
(১) অপ্রতিদ্বন্দ্বী ‘সেলেসাও’রা : ব্রাজিলই একমাত্র দল, যারা বিশ্বকাপের প্রতিটি আসরে অংশ নিয়েছে। ১১৪ ম্যাচে ২৪৭ পয়েন্ট নিয়ে তারা তালিকার ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাঁচবার শিরোপা জয়ের পাশাপাশি তাদের গোল করার হার এবং ধারাবাহিকতা তাদেরকে ইতিহাসের সবচেয়ে সফল দলে পরিণত করেছে। ২০২৬ আসরে তারা অংশ নিতে যাচ্ছে নিজেদের টানা ২৩তম বিশ্বকাপে।
২০০২ সালের পর আর ট্রফি না জিতলেও বিশ্বকাপের অলটাইম র্যাঙ্কিংয়ের টেবিলে এখনো শীর্ষে রয়েছে ব্রাজিল দল। তারা ১১৪ ম্যাচে ৭৬ জয়, ১৯ ড্র ও ১৯ হারে মোট ২৪৭ পয়েন্ট তাদের। আর এই পথে ব্রাজিল করেছে ২৩৭ গোল এবং তাদের গোল ব্যবধান +১২৯। এ ছাড়া তারা জিতেছে পাঁচটি বিশ্বকাপ। ১৯৫৮ বিশ্বকাপে প্রথম শিরোপা জেতে তারা। এরপর ১৯৬২, ১৯৭০, ১৯৯৪ এবং ২০০২ সালে বিশ্বকাপ জেতে ‘সেলেসাও’রা।
(২) জার্মানির ধারাবাহিকতা: অলটাইম র্যাঙ্কিংয়ের দ্বিতীয় স্থানে আছে জার্মানি। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের দিক থেকে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে তারা। পশ্চিম জার্মানি ও একীভূত জার্মানির রেকর্ড মিলিয়ে ২০২২ পর্যন্ত তারা খেলেছে ২০টি বিশ্বকাপে। ১১২ ম্যাচে তাদের ২২৫ পয়েন্ট। বিশ্বকাপে তাদের ধারাবাহিক সাফল্যের প্রমাণ চারবার চ্যাম্পিয়ন হওয়া। জার্মানি প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ১৯৫৪ সালে। এরপর ১৯৭৪, ১৯৯০ এবং ২০১৪ সালে ট্রফি জেতে তারা। এ ছাড়া জার্মানি মোট আটবার ফাইনাল খেলেছে, যা তাদের বিশ্বকাপ ইতিহাসের সবচেয়ে ধারাবাহিক সফল দলগুলোর একটি করে তুলেছে।
(৩) আর্জেন্টিনার উত্থান: বিশ্বকাপের সর্বকালের পয়েন্ট তালিকায় তৃতীয় স্থানে রয়েছে আর্জেন্টিনা। ৮৮ ম্যাচে তারা ৪৭ জয়, ১৭ ড্র ও ২৪ হারে সংগ্রহ করেছে ১৫৮ পয়েন্ট। আর্জেন্টিনা করেছে ১৫২ গোল এবং তাদের গোল ব্যবধান +৫১। আর্জেন্টিনার তিন শিরোপা এসেছে ১৯৭৮, ১৯৮৬ ও ২০২২ বিশ্বকাপে। এ ছাড়া সব মিলিয়ে মোট ছয়বার ফাইনাল খেলার কৃতিত্ব তাদেরকে ইতিহাসের সেরা দলগুলোর অন্যতম হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের সংখ্যার হিসাবেও আর্জেন্টিনা ইতিহাসে তৃতীয় স্থানে, ১৮টি বিশ্বকাপে অংশ নিয়েছে তারা। ‘আলবিসেলেস্তেরা’ প্রথম বিশ্বকাপ খেলে ১৯৩০ বিশ্বকাপে। তবে তারা ১৯৩৮, ১৯৫০, ১৯৫৪ ও ১৯৭০ সালের আসরে অংশ নেয়নি। এরপর ১৯৭৪ থেকে ২০২২ পর্যন্ত প্রতিটি বিশ্বকাপেই নিয়মিতভাবে খেলেছে আর্জেন্টিনা। ফলে ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নিলে আর্জেন্টিনার মোট বিশ্বকাপ উপস্থিতি দাঁড়াবে ১৯-এ।
(৪) ইতালির পতন: আর্জেন্টিনার চেয়ে বিশ্বকাপ জেতায় এগিয়ে থাকলেও অলটাইম পয়েন্ট তালিকায় চতুর্থ স্থানে আছে ইতালি। টানা দুবার বিশ্বকাপের মূল পর্বে কোয়ালিফাই করতে না পারা তাদের জন্য বড় ক্ষতি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ১৮ আসরে অংশ নিয়ে ৮৩ ম্যাচে ৪৫ জয় নিয়ে সংগ্রহ করেছে ১৫৬ পয়েন্ট, যা আর্জেন্টিনার চেয়ে মাত্র ২ পয়েন্ট কম। ইতালির গোল ব্যবধানও +৫১। ইতালির চারটি বিশ্বকাপ এসেছে ১৯৩৪, ১৯৩৮, ১৯৮২ এবং ২০০৬ বিশ্বকাপে।
(৫) দুরন্ত ফ্রান্স: তালিকার ৫ নম্বরে আছে দুবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্স। গত সাত আসরের মধ্যে চারবার ফাইনালে খেলে তারা বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের নতুন শক্তির জানান দিচ্ছে। মোট ১৬ আসরে অংশ নিয়ে ৭৩ ম্যাচে তারা ৩৯ জয় নিয়ে সংগ্রহ করেছে ১৩১ পয়েন্ট, আর তাদের গোল ব্যবধান +৫১। ফ্রান্স নিজেদের প্রথম বিশ্বকাপ জেতে ১৯৯৮ সালে। এরপর দ্বিতীয় বিশ্বকাপটি তারা হাতে তোলে ২০১৮ সালে। এ ছাড়া ২০০৬ ও ২০২২ সালে ফাইনালে গিয়ে হেরে যায় তারা।
বিশ্বকাপের ইতিহাস বলে, কেবল ট্রফি জয়ই নয়, বরং দীর্ঘ সময় ধরে মাঠের লড়াইয়ে টিকে থাকাই একটি দলকে মহিমান্বিত করে। আর সেই হিসেবে আগামী ২০২৬ বিশ্বকাপেও যে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা-জার্মানির এই লড়াই এক অন্যমাত্রা যোগ করবে সেটা আর না বললেও চলে।