এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি : বিশ্ব ঐতিহ্যের অনন্য প্রাকৃতিক বিস্ময় সুন্দরবন আবারও রক্তাক্ত হলো বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নিয়োজিত বনরক্ষীদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনায়। বন বিভাগের অভিযানে আটক এক হরিণ শিকারিকে ছিনিয়ে নিতে সংঘবদ্ধ দুর্বৃত্তরা বনরক্ষীদের ওপর হামলা চালিয়েছে। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন দুই বনরক্ষী। এ ঘটনায় উপকূলজুড়ে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বুধবার (১৩ মে) দুপুরে বাংলাদেশ পুলিশ এর অধীন শরণখোলা থানা এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পাথরঘাটার চরদুয়ানী ইউনিয়নের কালিয়ারখাল এলাকায় এ হামলার ঘটনা ঘটে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ এর শরণখোলা রেঞ্জের চরখালী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল জাবেরের নেতৃত্বে বনরক্ষীদের একটি দল মঙ্গলবার বিকেলে সুন্দরবনের চরখালী বনাঞ্চলের শুয়োরগুড়ি এলাকায় নিয়মিত টহলে যায়। এ সময় বনরক্ষীরা বনের গভীরে একদল হরিণ শিকারির উপস্থিতি টের পান।
বনরক্ষীদের উপস্থিতি বুঝতে পেরে শিকারিরা দ্রুত ঘটনাস্থলের অদূরে নোঙর করা একটি ট্রলারে উঠে লোকালয়ের দিকে পালানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি বুঝে বনরক্ষীরাও ট্রলার নিয়ে তাদের ধাওয়া করেন। দীর্ঘ ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার একপর্যায়ে শিকারিরা কালিয়ারখাল এলাকায় পৌঁছে লোকালয়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে।
পরে বনরক্ষীরা ওই এলাকার চিহ্নিত হরিণ শিকারি কুদ্দুস রাজা (৩০)কে আটক করতে সক্ষম হন। কিন্তু আটক শিকারিকে নিয়ে ফেরার সময় তার স্বজন ও সহযোগীরা সংঘবদ্ধ হয়ে বনরক্ষীদের ওপর অতর্কিত হামলা চালায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলাকারীরা ধারালো অস্ত্র নিয়ে বনরক্ষীদের লক্ষ্য করে এলোপাতাড়ি কোপাতে থাকে।
হামলায় চরখালী ফরেস্ট টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আল জাবের ও বন বিভাগের নৌকাচালক অপূর্ব কুমার সাহা গুরুতর আহত হন। একপর্যায়ে হামলাকারীরা আটক শিকারি কুদ্দুস রাজাকে ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত পালিয়ে যায়।
ঘটনার পর আহত দুই বনরক্ষীকে উদ্ধার করে শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ ভর্তি করা হয়। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন বলে জানা গেছে।
এ ঘটনায় বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চরম উদ্বেগ বিরাজ করছে। বনরক্ষীরা বলছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তারা প্রতিনিয়ত সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু সংঘবদ্ধ শিকারি চক্রের এমন হামলা তাদের নিরাপত্তাকে বড় প্রশ্নের মুখে ফেলেছে।
বাংলাদেশ বন বিভাগ এর কর্মকর্তারা জানান, সুন্দরবনে হরিণ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা এবং বনজ সম্পদ লুটের সঙ্গে জড়িত অপরাধী চক্রগুলো দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বন বিভাগের অভিযান অব্যাহত রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা রেঞ্জ কর্মকর্তা (এসিএফ) মো. শরিফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, বনরক্ষীদের ওপর হামলার ঘটনায় থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী অভিযান চালাচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশ এর শরণখোলা থানার অফিসার ইনচার্জ মো. শামিনুল হক বলেন, বনরক্ষীদের ওপর হামলার ঘটনায় মামলা রেকর্ড করা হয়েছে। হামলায় জড়িতদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
পরিবেশ ও বন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন রক্ষা করতে হলে বনরক্ষীদের নিরাপত্তা ও আধুনিক সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে বনাঞ্চলকেন্দ্রিক অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর ও সমন্বিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহল।