বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। সম্প্রতি দুইদিনের ঢাকা সফরে এসেছিলেন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ক্রিকেট বোর্ডের চেয়ারম্যান সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভি। কয়েক দিন ধরেই এই সফরকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বেশ আলোচনা চলছে।
আটই মে, শুক্রবার, ঢাকার মিরপুরে বাংলাদেশ-পাকিস্তান ক্রিকেট সিরিজের প্রথম টেস্ট খেলার দিন তিনি ঢাকায় পৌঁছান।
শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তাকে স্বাগত জানিয়েছেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব আসাদ আলম সিয়াম ও ক্রিকেট বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নিজামউদ্দিন।
ওইদিনই বিকেলে ঢাকায় একটি পাঁচতারা হোটেলে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাত করেন বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং পরদিন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ।
এ সময় দুই দেশের মধ্যে মাদকদ্রব্য ও সাইকোট্রপিক উপাদানের অবৈধ পাচার এবং অপব্যবহার রোধে একটি সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষরিত হয়েছে।
পাকিস্তান ও বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা নিজ নিজ দেশের পক্ষে এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন রাজা নাকভির এই ঢাকা সফর আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।
এটি কেবল "গুডউইল ভিজিট বা রাজনৈতিক ভিজিট না" বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্য, পশ্চিম এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র কেন্দ্রিক রাজনীতিতে পাকিস্তান এখন ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস এর অধ্যাপক সাহাব এনাম খানের মতে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই সফর খুবই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক রাজনীতিতে পাকিস্তান এখন ফ্যাক্টর হয়ে দাঁড়িয়েছে।
"পরিবর্তিত পরিস্থিতি যেখানে মিডল ইস্ট, ইরান, চীন এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে কেন্দ্র করে নতুন যে ভূ-কৌশলগত অবস্থান তৈরি হয়েছে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে, সেটাও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। সুতরাং সবদিক মিলিয়ে পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণ করাটা অর্থনীতি ও স্থিতিশীলতার দিক থেকে দেখা প্রয়োজন" বলেন অধ্যাপক খান।
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর নিয়ে কৌতুহল কেন?
পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক সবসময়ই বেশ স্পর্শকাতর বলে বিবেচিত হয়।
একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে দেশটির সাথে সম্পর্ক রক্ষায় বেশিরভাগ সময়ই বাংলাদেশকে সচেতন থাকতে দেখা গেছে।
বিশেষ করে গত ১৭ বছর আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে ঘিরে দুই দেশের সম্পর্ক বেশ শীতল ছিল।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পরে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে অবশ্য দুই দেশের সম্পর্কে মোড় ঘুরতে দেখা গেছে।
আবার পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল।
সেসময় থেকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীসহ একাধিক মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বাংলাদেশ সফর এবং যোগাযোগ বাড়াতে দেখা গেছে।
পরবর্তীতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন পাকিস্তানের পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বিশেষ উদ্যোগ বিষয়ক মন্ত্রী আহসান ইকবাল চৌধুরী।
এর আগে, ডিসেম্বরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর দেশটির স্পিকার সরদার আয়াজ সাদিক ঢাকায় এসে তারেক রহমানের সাথে দেখা করে সমবেদনা জানান।
এরইমধ্যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে পাকিস্তান।
বিবিসি বাংলাকে অধ্যাপক খান বলেন, "এই মুহূর্তে পাকিস্তান ওয়েস্ট এশিয়া অর্থাৎ ইরান, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকেন্দ্রিক যে মধ্যস্থতায় আছে এবং সেই সাথে আফগানিস্তানের সাথে তাদের সম্পর্কের যে টানাপোড়েন চলছে এবং চীনের সাথে তাদের যে একটা গভীর সম্পর্ক আছে, এই প্রত্যেকটাকেই এই সফরটা রিফ্লেক্ট করে।"
আবার জঙ্গিবাদকে কেন্দ্র করে পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা ঝুঁকি রয়েছে। ফলে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের স্বাক্ষরিত এমওইউর কারণে দুই দেশের সম্পর্কে আস্থা ও স্বচ্ছতা তৈরি হবে।
"এই ধরনের এমওইউ থাকা মানে পারস্পরিক সম্পর্কের মধ্যে অনেক বেশি ট্রান্সপারেন্সি তৈরি হচ্ছে। যেটা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি" বলেন অধ্যাপক খান।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে নতুন ক্ষেত্র তৈরির জন্য বাংলাদেশকে 'প্রাগমেটিক চিন্তা' করতে হবে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তারা বলছেন, বাংলাদেশের বর্তমান সরকারকে ভারতের সাথে সম্পর্কন্নয়োনের ক্ষেত্রে আন্তরিক দেখা গেছে।
সেক্ষেত্রে ভারত-পাকিস্তানের যে ঐতিহাসিক সম্পর্কের পরম্পরা, সেটি বাংলাদেশ-ভারতের দূরত্ব আরো বাড়াবে কিনা- এমন প্রশ্নও তৈরি হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক খান মনে করেন, কোনো একটা পার্টিকুলার দেশের প্রিজম থেকে দেখাটা বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে ভুল হবে।
"বাংলাদেশের জন্য ভারত যেরকম গুরুত্বপূর্ণ পাকিস্তানও আঞ্চলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এবং পাকিস্তানের সাথে মধ্যপ্রাচ্য, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের জন্য যে সম্পর্ক সেটাও বাংলাদেশের জন্য বিবেচ্য, খুবই বিবেচ্য" বলেন অধ্যাপক খান।
যেসব সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যে শুক্রবার যে সমঝোতা স্মারক বা এমওইউ স্বাক্ষর হয়, সেটির আওতায় দুই দেশ মাদক পাচার এবং মাদক সংক্রান্ত অর্থ পাচার রোধে একে অপরকে প্রয়োজনীয় তথ্য আদান-প্রদান এবং কারিগরি সহায়তা করবে।
বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছিল, এই স্মারকের আওতায় মাদক অপরাধে জড়িত সন্দেহভাজন ব্যক্তি, পাচারকারী সংস্থা এবং পাচারের নতুন পদ্ধতি ও রুট সম্পর্কে নিয়মিত গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় করবে দুই দেশ।
ওই অনুষ্ঠানের পরে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরো বাড়বে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, "প্রাসঙ্গিকভাবে উভয় দেশের সম্পর্কের বিষয়ে কথা হয়েছে, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক এবং আমাদের ডিপ্লোমেটিক যে রিলেশনশিপ এগুলো তো সাধারণভাবেই আলোচনা হয়। আমাদের একটা ফ্রেন্ডলি রিলেশনশিপ আছে ইন বিটুইন আওয়ার কান্ট্রিজ। এটা আরো উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে।"
ওই বৈঠকে, ফৌজদারি অপরাধের তদন্তে দ্রুত তথ্য ও সাক্ষ্য বিনিময়ের লক্ষ্যে 'মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স ইন ক্রিমিনাল ম্যাটারস' চুক্তির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে বলেও জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এর ফলে আন্তঃসীমান্ত অপরাধ দমন এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মধ্যে সহযোগিতা আরও সুদৃঢ় হবে বলে মনে করছে বাংলাদেশ।
এছাড়া অপরাধীরা যাতে এক দেশ থেকে অন্য দেশে পালিয়ে বিচার এড়াতে না পারে, সেজন্য সন্ত্রাসবাদ ও আর্থিক অপরাধসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে কার্যকর প্রত্যর্পণ ব্যবস্থা নিয়ে দুই দেশের কথা হয়েছে বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ।