মনিরুল ইসলাম : বিএনপির সমমনা রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ১২ দলীয় জোটে তীব্র অসন্তোষ এখন প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে আয়োজিত নৈশভোজকে কেন্দ্র করে জোটের ভেতরে যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছিল, তা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে জোটের শীর্ষ নেতারা প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী দল (পিএনপি) এবং বাংলাদেশ এলডিপিকে (বিলুপ্ত) জোট থেকে বহিষ্কারের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে। তবে এই সিদ্ধান্ত এখনও চূড়ান্ত হয়নি বলে জানা গেছে। শিগগিরই ১২ দলী জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। ওই বৈঠকে এসব বিষয় নিয়ে চূড়ান্ত আলোচনা হবে।
জোট সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, আগামী এক-দুই দিনের মধ্যেই জরুরি বৈঠক ডেকে এ সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হতে পারে। এরপর সংবাদ সম্মেলন বা লিখিত বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বিষয়টি জনসম্মুখে আনা হবে।
নৈশভোজ ঘিরে বিতর্কের সূত্রপাত
গত ২০ জুলাই রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধানমন্ত্রীর আয়োজিত নৈশভোজে জোটভুক্ত দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়। তবে ওই অনুষ্ঠানে কিছু বিতর্কিত ব্যক্তির উপস্থিতি নিয়ে জোটের ভেতরে ব্যাপক ক্ষোভ তৈরি হয়। বিশেষ করে বাংলাদেশ এলডিপির একজন যুগ্ম মহাসচিব পরিচয়ে ‘কামাল প্রধান’ নামে এক ব্যক্তির আমন্ত্রণপত্র পাওয়া এবং তার অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণের চেষ্টা ব্যাপক প্রশ্নের জন্ম দেয়।
জোট নেতাদের অভিযোগ, ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রতারণা, জালিয়াতি, ভূমিদস্যুতা, মানবপাচার ও চাঁদাবাজিসহ একাধিক গুরুতর মামলা রয়েছে। এমনকি কিছু মামলায় তিনি দণ্ডপ্রাপ্ত বলেও দাবি করা হয়। ফলে কীভাবে এমন একজন বিতর্কিত ব্যক্তি সরকারি নৈশভোজের আমন্ত্রণ পেলেন—তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনেও আলোচনা শুরু হয়েছে।
জোটের ভেতরে ক্ষোভ ও প্রতিক্রিয়া
জোটের দায়িত্বশীল নেতারা বলছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে গড়ে ওঠা এই প্ল্যাটফর্মের ভাবমূর্তি এ ঘটনায় মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে। তাদের মতে, বিতর্কিত ও প্রশ্নবিদ্ধ ব্যক্তিদের উপস্থিতি শুধু জোটের বিশ্বাসযোগ্যতাকেই আঘাত করেনি, বরং মাঠপর্যায়ের কর্মীদের মধ্যেও বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করেছে।
জোটের সমন্বয়ক শামসুদ্দিন পারভেজ জানিয়েছেন, বিএনপির পক্ষ থেকে প্রতিটি দলকে নির্দিষ্টসংখ্যক প্রতিনিধির নাম দিতে বলা হয়েছিল। সেই অনুযায়ী তালিকা পাঠানো হলেও পরবর্তীতে বিতর্কিত ব্যক্তির অন্তর্ভুক্তি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। বিষয়টি জোটপ্রধানের নজরে আনা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর অবস্থান নেওয়ার নির্দেশ দেন।
পিএনপির বিরুদ্ধেও অভিযোগ
শুধু এলডিপিই নয়, পিএনপির চেয়ারম্যান ফিরোজ মো. লিটনের বিরুদ্ধেও ‘বিগত সরকারের ঘনিষ্ঠতা’র অভিযোগ উঠেছে। তার কিছু ছবি ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা তৈরি হয়েছে, যা জোটের ভেতরে আরও অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
যদিও ফিরোজ মো. লিটন দাবি করেছেন, তিনি পূর্বে একটি সংলাপে অংশ নিলেও কোনো নির্বাচনে অংশ নেননি এবং তার অবস্থান ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে।
জাতীয় পার্টি (কাজী জাফর)-এর চেয়ারম্যান মোস্তফা জামাল হায়দার আজ সোমবার বিকালে আলাপকালে জানান, শিগগিরই ১২ দলীয় জোটের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। এতে জোটের ভেতরের সমস্যা নিয়ে আলোচনা হবে। আলোচনায় জোটের ২ দল নিয়ে যেসব অভিযোগ আলোচিত হচ্ছে তা নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
এদিকে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ১২ দলীয় জোট এক ধরনের সংকটময় মোড়ে দাঁড়িয়ে আছে। জোটের নেতারা মনে করছেন, শৃঙ্খলা ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা বজায় রাখতে কঠোর সিদ্ধান্ত নেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। তাই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে জোটের কাঠামোতে নতুন করে পরিবর্তন আসতে পারে।
জরুরি বৈঠকের পর জোট নেতৃত্ব কতটা দৃঢ়ভাবে তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে এবং এতে জোটের ভবিষ্যৎ কোন দিকে মোড় নেয়।