মনিরুল ইসলাম : মানসিক স্বাস্থ্যসেবাকে সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসার লক্ষ্যে ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’ চালু করেছে ড্রিম রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের (ডিআরডিএফ) উদ্যোগ ‘মনোকথা’। মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আবেগজনিত বিভিন্ন সমস্যা মোকাবিলায় নিয়মিত মানসিক যত্ন এবং প্রয়োজনের সময় সহায়তা পাওয়ার সুযোগ তৈরির উদ্দেশ্যে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আজ শুক্রবার ৯ অক্টোবর আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’-এর উদ্বোধন করা হয়। অনুষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মনোবিজ্ঞানী, গবেষক, শিক্ষক, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও গণমাধ্যমকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন।
ডিআরডিএফের সভাপতি ও শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মীর মোহাম্মদ আলীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ মনোবিজ্ঞান সমিতির (বিপিএ) সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. শামসুদ্দিন ইলিয়াস। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য মানুষের সামগ্রিক সুস্থতার অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটি কেবল ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য ইস্যু।
তিনি বলেন, প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ মানসিক চাপ, উদ্বেগ, একাকিত্ব ও আবেগজনিত সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। কিন্তু সামাজিক সংকোচ, সচেতনতার অভাব এবং প্রয়োজনীয় সেবা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য না থাকায় অনেকেই সহায়তা নিতে আগ্রহী হন না। কেউ কেউ প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে দূরে থাকেন। তাই ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজের সামগ্রিক উন্নয়নে মানসিক স্বাস্থ্যকে যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে মনোকথার কার্যক্রম, লক্ষ্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা তুলে ধরেন মনোবিজ্ঞানী ও গবেষক তানজীম জামান। তিনি বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া বর্তমান সময়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
মনোবিজ্ঞানী ও মেন্টর হৃদয় ইফতেখার ইফতি ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’-এর পরিচিতি তুলে ধরেন। তিনি কার্ডটির প্রয়োজনীয়তা, এর মাধ্যমে পাওয়া সুবিধা এবং মানুষের মানসিক সুস্থতার নিয়মিত যত্ন নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এর সম্ভাব্য ভূমিকা ব্যাখ্যা করেন।
অনুষ্ঠানে মনোকথা ও কেয়ার কার্ডের কার্যক্রম নিয়ে একটি ভিডিও প্রদর্শন করা হয়। পরে অনুষ্ঠিত আলোচনায় অংশ নেন পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মী আমিনুর রসুল বাবুল, ক্লিনিক্যাল সাইকোলজিস্ট ও এইচআরডিসির পরিচালক জিয়ানুর কবীর, সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর মো. সামসুজ্জামান মোল্লা (ইমন), মনোবিজ্ঞানী তারিন তাবাসসুম এবং সাইকোসোশ্যাল কাউন্সেলর সুলতান ভূইয়াসহ অন্যরা।
সভাপতির বক্তব্যে মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, শারীরিক স্বাস্থ্যের মতো মানসিক স্বাস্থ্যেরও নিয়মিত যত্ন প্রয়োজন। মানসিক সংকট তীব্র হওয়ার আগেই সমস্যা শনাক্ত করা এবং প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে অনেক ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কার্যকরভাবে মোকাবিলা করা সম্ভব।
তিনি বলেন, এ জন্য মানুষের কাছে সহজে গ্রহণযোগ্য, নির্ভরযোগ্য ও সাশ্রয়ী মানসিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে হবে। একই সঙ্গে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রচলিত নেতিবাচক ধারণা ও সামাজিক সংকোচ দূর করাও জরুরি।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সামাজিক পরিসরে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো প্রয়োজন। বিশেষ করে তরুণদের মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
তারা বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে খোলামেলা আলোচনা এবং প্রয়োজনের সময় পেশাদার সহায়তা নেওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা জরুরি। পাশাপাশি মানসিক স্বাস্থ্যসেবার পরিধি বাড়ানো, জনসচেতনতা তৈরি এবং তরুণদের জন্য সহায়তামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’-এর আনুষ্ঠানিক মোড়ক উন্মোচন। এ সময় বক্তারা আশা প্রকাশ করেন, উদ্যোগটি মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর পাশাপাশি নিয়মিত মানসিক যত্ন নেওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখবে।
আয়োজকরা জানান, মানুষের মানসিক সুস্থতার নিয়মিত যত্ন নিশ্চিত করতেই ‘মনোকথা কেয়ার কার্ড’ চালু করা হয়েছে। ভবিষ্যতে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি, সহায়তা কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং সাধারণ মানুষের জন্য আরও সহজলভ্য সেবা নিশ্চিত করতে কাজ করবে মনোকথা।