মনিরুল ইসলাম : বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ৭ নভেম্বর একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দিন। ১৯৭৫ সালের এই দিনে সংঘটিত সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান দেশের রাজনৈতিক গতিপথে বড় ধরনের পরিবর্তন আনে। নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, সামরিক অভ্যুত্থান ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে বিশেষ তাৎপর্য নিয়ে স্থান করে নেয়।
জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে প্রকাশিত এক বিশ্লেষণধর্মী নিবন্ধে এভাবেই ৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেছেন ড. মারুফ মল্লিক। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রকাশিত নিবন্ধে তিনি দিনটিকে বাংলাদেশের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
নিবন্ধে বলা হয়, ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর দেশ নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সংকটের মুখে পড়ে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ, অর্থনৈতিক স্থবিরতা, একদলীয় বাকশাল ব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংঘাত দেশের পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। এর মধ্যে ১৯৭৫ সালের ৩ নভেম্বর তৎকালীন সেনাপ্রধান খালেদ মোশাররফের নেতৃত্বে অভ্যুত্থানের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তোলে।
এ প্রেক্ষাপটে ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন তৎকালীন সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমান, কর্নেল আবু তাহের এবং খালেদ মোশাররফ। নিবন্ধের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, সিপাহি ও জনতার সমর্থনে জিয়াউর রহমান ঘটনাপ্রবাহের কেন্দ্রীয় চরিত্রে পরিণত হন। এর মধ্য দিয়ে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়।
ড. মারুফ মল্লিকের মতে, ওই সময় জিয়াউর রহমানের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা ও গ্রহণযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। তাঁর নেতৃত্বে পরবর্তী সময়ে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পরিসর সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
নিবন্ধে আরও উল্লেখ করা হয়, জিয়াউর রহমানের শাসনামলে অর্থনীতিতে বেসরকারি উদ্যোগ ও বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ, বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার কার্যক্রম সম্প্রসারণ এবং ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের বিকাশে নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়। পাশাপাশি বাকশালের সময় বিলুপ্ত হওয়া আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নিজস্ব পরিচয়ে রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়।
লেখকের বিশ্লেষণে, রাজনৈতিক বিভাজন দূর করে বিভিন্ন পক্ষকে জাতীয় উন্নয়নের ধারায় সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টাও ছিল ওই সময়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে নিবন্ধে বলা হয়েছে, সত্তরের দশকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক অস্থিরতা বিরাজ করছিল। লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে সামরিক শাসকদের উত্থান ঘটছিল। এমন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে জিয়াউর রহমানের আবির্ভাব এবং পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনকে লেখক স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের বলে উল্লেখ করেছেন।
নিবন্ধে জিয়াউর রহমানের মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার কথাও তুলে ধরা হয়েছে। স্বাধীনতার ঘোষণা প্রদান ও রণাঙ্গনে নেতৃত্ব দেওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি মানুষের মধ্যে যে আস্থা অর্জন করেছিলেন, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহে তা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল বলে মত দিয়েছেন লেখক।
সব মিলিয়ে ড. মারুফ মল্লিকের বিশ্লেষণে, ৭ নভেম্বর কেবল একটি দিনের অভ্যুত্থান নয়; বরং বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও রাষ্ট্রীয় বিকাশের ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাঁক। তাঁর মতে, এই দিনের মধ্য দিয়ে দেশের মানুষ নতুন রাজনৈতিক পথের সন্ধান পেয়েছিল এবং জাতীয় ঐক্যের প্রশ্নটি আবারও সামনে চলে এসেছিল।
উল্লেখ্য, ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাবলি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এখনো নানা রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ব্যাখ্যার বিষয়। দিনটি জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পরিচিত।