মনিরুল ইসলাম : আগামী শিক্ষাবর্ষ থেকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির পাঠ্যবইয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), রোবোটিক্স, মেশিন লার্নিং ও সাইবার সিকিউরিটির মতো আধুনিক প্রযুক্তিভিত্তিক বিষয়গুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ, উদ্ভাবনী ও কর্মসংস্থানমুখী করে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর দিকনির্দেশনায় এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা ও প্রাথমিক ও গণশিক্ষা উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন।
আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর বিজয় সরণিস্থ নভোথিয়েটারে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আয়োজনে ‘বাংলাদেশ ইনোভেশন ফেয়ার ২০২৬’-এর প্লেনারি সেশনে তিনি এ তথ্য জানান।
স্টেম শিক্ষায় জোর, বাস্তবমুখী দক্ষতা গড়ে তোলার লক্ষ্য
মাহ্দী আমিন বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে টিকে থাকতে হলে স্টেম (বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল ও গণিত) শিক্ষাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু মাধ্যমিক নয়, উচ্চশিক্ষা পর্যায়েও স্টেম শিক্ষার সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
তার ভাষায়, “স্টেমের চারটি উপাদান একে অপরের পরিপূরক। এগুলোর সমন্বয়ের মাধ্যমে বিশ্বমানের মানবসম্পদ, উদ্যোক্তা এবং কর্মসংস্থানমুখী নাগরিক তৈরি সম্ভব।”
কারিগরি শিক্ষা হবে বাধ্যতামূলক
নতুন শিক্ষাক্রমে ষষ্ঠ শ্রেণি থেকেই কারিগরি শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে এবং তা পর্যায়ক্রমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বাধ্যতামূলক করা হবে। এর মাধ্যমে সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হবে বলে জানান তিনি।
এছাড়া প্রাথমিক স্তরে চতুর্থ শ্রেণিতে ‘স্পোর্টস’ ও ‘কালচার’ এবং ষষ্ঠ শ্রেণিতে ‘লার্নিং উইথ হ্যাপিনেস’ নামে নতুন বিষয় যুক্ত করার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন।
থিওরি নয়, প্র্যাকটিসে জোর
দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এখনো তাত্ত্বিক জ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগের মধ্যে ব্যবধান রয়েছে উল্লেখ করে মাহ্দী আমিন বলেন, “শুধু সনদ নয়, বাস্তব দক্ষতা অর্জন জরুরি। থিওরি ও প্র্যাকটিসের সমন্বয়ই শিক্ষার্থীদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির ভিত্তি গড়ে দেবে।”
এ কারণে কারিকুলামকে আধুনিক ও বাস্তবমুখী করতে সংস্কার কার্যক্রম চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
বিশ্ববিদ্যালয়–শিল্প খাতের সমন্বয়ে জোর
দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় ও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত প্রায় আড়াই হাজার প্রতিষ্ঠান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শিক্ষাব্যবস্থাকে বাস্তব জীবনের সঙ্গে যুক্ত করতে ইন্ডাস্ট্রি–অ্যাকাডেমিয়া সমন্বয় জরুরি।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা বাড়লে সেখান থেকেই উদ্ভাবন, স্টার্টআপ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে—এমন প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।
অ্যালামনাই ও গবেষণায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি
মাহ্দী আমিন বলেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অ্যালামনাই নেটওয়ার্ককে এখনো পূর্ণভাবে কাজে লাগানো হয়নি। আন্তর্জাতিক মানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো অ্যালামনাই এনডাউমেন্ট, গবেষণা সহায়তা ও সিএসআর ফান্ডকে কাজে লাগিয়ে শক্তিশালী ইকোসিস্টেম গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘সেন্টার অব এক্সিলেন্স’ গড়ে তোলার নির্দেশনার কথাও জানান, যা প্রযুক্তি হস্তান্তর, গবেষণা, ইন্টার্নশিপ ও ক্যারিয়ার উন্নয়নে ভূমিকা রাখবে।
ব্রেন ড্রেন থেকে ব্রেন সার্কুলেশন
তিনি বলেন, বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশি তরুণরা দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে। তাদের জন্য দেশে উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা গেলে ‘ব্রেন ড্রেন’ কমিয়ে ‘ব্রেন সার্কুলেশন’ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সরকারি-বেসরকারি খাতের যৌথ উদ্যোগে প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষার বিস্তার ঘটলে ভবিষ্যতে দেশীয় স্টার্টআপ ও ‘ইউনিকর্ন’ তৈরির পথ সুগম হবে বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
উদ্ভাবনী অর্থনীতির ভিত্তি গড়ার প্রত্যয়
‘স্টেম ফর আ ফিউচার-রেডি বাংলাদেশ’ শীর্ষক এই সেশনে আরও উপস্থিত ছিলেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের শিক্ষা প্রধান এস কিয়াং কোসহ সংশ্লিষ্টরা।
সার্বিকভাবে, নতুন শিক্ষাক্রমে প্রযুক্তিভিত্তিক দক্ষতা, কারিগরি শিক্ষা এবং গবেষণার সমন্বয়ের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষম করে তোলাই সরকারের মূল লক্ষ্য বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
স্টেম ফর আ্য ফিচার-রেডি বাংলাদেশ: বিল্ডিং দ্য ব্যাকবোন অব দ্য ইনোভেটিভ ইকোনোমি' শীর্ষক এই সেমিনারের সঞ্চালনা করেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মোঃ আনোয়ার হোসেন। আলোচনায় আরো অংশ নেন, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ, ইউনেস্কো ঢাকা অফিসের শিক্ষা প্রধান এস কিয়াং কো, দেশের শীর্ষ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা তানভীর মোহাম্মদ, ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইউনিভার্সিটি-আইইউবির উপাচার্য অধ্যাপক ড. ম. তামিম প্রমুখ।