শিরোনাম
◈ রাশিয়া-চীন ঘনিষ্ঠতায় বদলে যাচ্ছে শক্তির সমীকরণ, কী করবে যুক্তরাষ্ট্র? ◈ নারীর ৪ টুকরো মরদেহ উদ্ধার আদাবরে, পাওয়া যায়নি দুই পা ◈ বিয়ের অনুষ্ঠানে নাচতে ডেকে নৌকায় দুই নৃত্যশিল্পীকে দলবদ্ধ ধর্ষণ ◈ লোহিত সাগরে উত্তেজনা: হুথিদের বিরুদ্ধে বড় অভিযানের কথা ভাবছে সৌদি ◈ পানি বণ্টন চুক্তি: কারিগরি দল গঠন, ভারতকে শিগগিরই জানাবে সরকার ◈ মাস্তা‌নের হা‌তে মে‌সির রেকর্ড ব্রেক   ◈ ব্রিকসের মঞ্চে চীনা প্রেসিডেন্টের কড়া বার্তা ◈ শেখ হাসিনা ছিলেন বিশ্বের সেরা অভিনেত্রী: স্পিকার (ভিডিও) ◈ পুলিশের ঊর্ধ্বতন ৫ কর্মকর্তাকে বদলি  ◈ সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত নবম পে-স্কেল নিয়ে, আসছে বড় পরিবর্তন

প্রকাশিত : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৬ রাত
আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:০৬ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ভাল্বের ত্রুটি, সহসা উৎপাদনে আসছে না রূপপুর 

মনজুর এ আজিজ : দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র রূপপুর থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের দারপ্রান্তে এসেও আবারও পিছিয়ে পড়েছে কেন্দ্রটি। প্রথম ইউনিটের পরীক্ষায় টারবাইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভাল্বের ত্রুটি ধরা পড়ায় আটকে আছে পরবর্তী ধাপের কাজ। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভাল্বটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চুল্লির সফল ট্রায়াল সম্পন্ন করা যাচ্ছে না। ত্রুটি দূর করতে রাশিয়া থেকে আবার নতুন ভাল্ব তৈরি করে আনতে হবে। ফলে রূপপুরের প্রথম ইউনিট সহসায় উৎপাদনে আসতে পারছে না বলে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

সূত্র মতে, রাশিয়ার পক্ষ থেকে দ্বিতীয় ইউনিটের ভাল্ব খুলে প্রথম ইউনিটে স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাংলাদেশ এতে রাজি হয়নি। কারণ, একটি ইউনিটের ভাল্ব খুলে অন্য ইউনিটে লাগানো সঠিক প্রক্রিয়া নয়। তাই নতুন করে ভাল্ব তৈরি করে এনে প্রথম ইউনিটে স্থাপন করতে হবে। এদিকে প্রথম ইউনিটের পরীক্ষার কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষাও শুরু করা যাচ্ছে না। প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার পরই দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষার কাজ শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ প্রকল্পের আওতায় ১২০০ মেগাওয়াট করে দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয়এক্সপোর্ট।

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক ড. মো. কবীর হোসেন গণমাধ্যমকে বলেন, একটি পাওয়ারপ্লান্টের টেস্টিংয়ের সময় বিভিন্ন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে। এখন প্রথম ইউনিটের টেস্টিং চলছে। প্রথম ইউনিট চালু হলে দ্বিতীয় ইউনিটের টেস্টিং হবে।

তিনি বলেন, টেস্টিংয়ের সময় ভাল্বে সমস্যা দেখা দেয়। এটা নিয়ে আমরা দুই মাস ধরে কাজ করছি। 
কবে নাগাদ এই কেন্দ্রের একটি ইউনিট চালু পারে জানতে চাইলে তিনি জানান, যতক্ষণ পর্যন্ত না টেস্টিং শেষ হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত এটা বলা সম্ভব না। কারণ টেস্টিংয়ের সময় নানা সমস্যা দেখা দেয়। সেসব কাটিয়ে ওঠার পর একটি ইউনিট চালু করতে পারবো। তার আগে বলা সম্ভব না কবে নাগাদ এই কেন্দ্র চালু হবে।

এ বছরের নভেম্বরে চালু হওয়ার কথা ছিল প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমরা এ ধরনের কোনও কথা বলিনি। এটা আমাদের পক্ষে বলা সম্ভবও না।

প্রসঙ্গত, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের  সংশ্লিষ্ট একজন প্রকল্প কর্মকর্তা গত ২৬ আগস্ট গণমাধ্যমকে বলেছিলেন, আইডিয়াল প্রোগ্রাম যদি অনুসরণ করি, তাহলে আগামী নভেম্বরের মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদনে যেতে পারে বলে আশা করছি। কিন্তু শেষ মুহূর্তে কোনও পরীক্ষায় আটকে গেলে সময় আরও পেছাতে পারে।

বর্তমানে কেন্দ্রটির প্রেসারাইজার পাইলট অপারেটেড রিলেটেড ভাল্বের (পিওআরভি) জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে। সূত্রমতে, সেটি স্থাপনের পর ফিউশন রিঅ্যাকশন ঘটিয়ে পাওয়ার স্টার্টআপে যাওয়া যাবে। আবার পিওআরভি শেষে যখন ফিউশন রিঅ্যাকশন ঘটানো হবে, তখন সেই পরীক্ষাতেও কারিগরি ত্রুটি দেখা দিতে পারে। এক্ষেত্রে শিডিউল অনুযায়ী রূপপুরের কাজ সময়মতো শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছিলেন, এই ধাপে ফুয়েল লোডিং ও ফিজিক্যাল স্টার্টআপের কাজ শেষ করে ফিউশন রিঅ্যাকশন ঘটানো হবে। এতে এনার্জি বা তাপশক্তি তৈরি হবে। সেই তাপশক্তি স্টিমে রূপান্তর করে টারবাইন ঘোরানো হবে এবং টারবাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে। জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ দিতে হলে উৎপাদন ক্ষমতা অন্তত ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে হবে। এ পর্যায়ে যেতে বি-টু ধাপ এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলো সফলভাবে শেষ করা জরুরি। পুরো প্রক্রিয়া শেষ করতে দুই মাসের মতো সময় লাগতে পারে। ফলে নতুন ভাল্ব না বসাতে পারলে পরবর্তী কাজের অনিশ্চয়তা রয়েই যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চলতি বছর চালু হবে কিনা, সেই শঙ্কা তৈরি হয়েছে। কারণ, নভেম্বরের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে প্রথম ইউনিটের বর্তমান ত্রুটি এখনই দূর করতে হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে পরবর্তী পরীক্ষাগুলো সফল করতে হবে।

দ্বিতীয় ইউনিটের টেস্টিং শুরু হয়নি: রূপপুরে দুটি ইউনিট রয়েছে। বর্তমানে প্রথম ইউনিটের পরীক্ষার কাজ চলছে। দ্বিতীয় ইউনিটের পরীক্ষার কাজ এখনও শুরু হয়নি।

প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রথম ইউনিট চালু হওয়ার পর দ্বিতীয় ইউনিটের টেস্টিং শুরু হবে। ফলে প্রথম ইউনিটের উৎপাদনে যাওয়ার বিষয়টি দ্বিতীয় ইউনিটের কাজ শুরুর সঙ্গেও যুক্ত। একটি পাওয়ারপ্লান্ট চালুর আগে বিভিন্ন ধাপে পরীক্ষা করতে হয়। এসব পরীক্ষায় কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে তা সমাধান করে আবার পরীক্ষা করতে হয়। রূপপুরের ক্ষেত্রেও প্রথম ইউনিটের ভাল্বের ত্রুটির কারণে দ্বিতীয় ইউনিটের কাজও পিছিয়ে পড়ছে।

দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে জাতীয় গ্রিডে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহের মধ্য দিয়ে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের যুগে প্রবেশ করার কথা বাংলাদেশের। ভাল্ব ছাড়াও বিদ্যুতের দাম এবং পেন্ট ফুয়েল নিয়ে এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি।

পিডিবি জানায়, বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) সঙ্গে রূপুপুর প্রকল্প কর্তৃপক্ষ বিদ্যুতের দাম নির্ধারণে কয়েকবার বৈঠক করেছে। পিডিবি এ বিষয়ে রূপপুর কর্তৃপক্ষের কাছে কিছু তথ্য চেয়েছে। কিন্তু তারা এখনও পিডিবিকে সব তথ্য দেয়নি বলে একটি অনুষ্ঠানে অভিযোগ করেছেন পিডিবির চেয়ারম্যান নিজেই। জানা গেছে, প্রয়োজনীয় এই তথ্য না পেলে বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করতে পারবে না পিডিবি।

চুক্তির সময় প্রাথমিকভাবে ২০১৬ সালে রূপপুর প্রকল্পের প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছিল ৪ টাকা ৬৫ পয়সা। তবে সব খরচ বিবেচনা করে এখন তা ১০ টাকার আশপাশে থাকতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। রাশিয়া থেকে আনা জ্বালানি ইউরেনিয়াম পুড়ে যে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হবে, সেই পুড়ে যাওয়া অংশে তেজস্ক্রিয়তা থাকে।  চুক্তি অনুযায়ী সেটি ধ্বংস করার জন্য রাশিয়া নিজ ব্যবস্থাপনার দেশে নিয়ে যাবে। এ জন্য রাশিয়াকে কী পরিমাণ টাকা দিতে হবে—সেই বাণিজ্যিক চুক্তি এখনও হয়নি।

সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেছেন, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট থেকে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর সময় নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইউনিটটির দুটি সেফটি ভাল্বে ত্রুটি ধরা পড়ায় পরবর্তী ধাপের পরীক্ষা শুরু করা যাচ্ছে না। ফলে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা সম্ভব হবে কিনা, তা এখনই নিশ্চিত করে বলতে পারছে না সরকার।

মন্ত্রী বলেন, গত ২৮ এপ্রিল রূপপুরের প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিংয়ের আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিমূলক পরীক্ষা শুরু হয়। তখন চার থেকে ছয় মাসের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরুর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। পরীক্ষার বিভিন্ন ধাপের মধ্যে ‘বি’ স্টেজ শেষ হয়েছে। তবে দুটি সেফটি ভাল্বে সমস্যা দেখা দেওয়ায় ‘সি’ স্টেজে যাওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কবে নাগাদ ভাল্বের সমস্যা সমাধান হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা যাচ্ছে না বলে জানান ফকির মাহবুব আনাম। তিনি বলেন, ভাল্ব দুটি কেন কাজ করছে না, তা নির্ধারণে রাশিয়া থেকে বিশেষজ্ঞ দল আসবে। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ত্রুটির প্রকৃত কারণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। প্রকল্পের ডিজাইনারের মূল্যায়ন অনুযায়ী, ভাল্ব দুটি পুরোপুরি পরিবর্তন করার প্রয়োজন হতে পারে বলেও জানান মন্ত্রী।

এ ক্ষেত্রে দুটি বিকল্প বিবেচনায় রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটের জন্য বরাদ্দ থাকা ভাল্ব প্রথম ইউনিটে এনে স্থাপন করা, অথবা রুশ ভেন্ডরের মাধ্যমে নতুন ভাল্ব তৈরি করে দ্রুত সরবরাহের ব্যবস্থা করা। যে বিকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সেটিই বেছে নেওয়া হবে বলে জানান তিনি। এ কারণে প্রথম ইউনিট থেকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করা যাবে কিনা, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

  • সর্বশেষ