অপরাধ দমনে সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে পুলিশ সদর দপ্তরের গঠিত আটটি উপকমিটি সংঘটিত অপরাধ, সাইবার অপরাধ, মাদক, অবৈধ অস্ত্র ও রাজনৈতিক সহিংসতা মোকাবিলায় সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। এসব উদ্যোগের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে ধীরে ধীরে স্বস্তি ফিরতে শুরু করেছে।
এর আগে দেশজুড়ে খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, সশস্ত্র হামলা, রাজনৈতিক সহিংসতা ও গণপিটুনির ঘটনায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা বেড়েছিল। আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে অপরাধী চক্রের সংঘাত, আন্ডারওয়ার্ল্ডের তৎপরতা, টার্গেট কিলিং এবং পুলিশের ওপর হামলার ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছিল। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশের সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ায় এখন সেই উদ্বেগ অনেকটাই কমতে শুরু করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে পুলিশ সদর দপ্তর সাংগঠনিকভাবে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানো, মাঠপর্যায়ের দুর্বলতা চিহ্নিত করা এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদারে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলামকে সভাপতি করে গঠিত ওই কমিটির অধীনে আটটি উপকমিটি কাজ করছে।
উপকমিটিগুলো সংগঠিত অপরাধ ও গ্যাং, সাইবার ও আর্থিক অপরাধ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সন্ত্রাসবাদ, অবৈধ অস্ত্র ও মাদক, সীমান্ত নিরাপত্তা, পুলিশের অপারেশনাল সক্ষমতা, প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং, প্রশিক্ষণ ও কমিউনিটি পুলিশিং নিয়ে সুপারিশ তৈরি করছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা জানান, আগের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে মাঠপর্যায়ের প্রধান চ্যালেঞ্জগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ প্রতিরোধ, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা নির্ধারণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত আইজিপি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম বলেন, আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। মাঠপর্যায়ের চ্যালেঞ্জ পর্যালোচনা এবং পুলিশের সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়ে নানা কাজ হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তর, মানবাধিকার সংগঠন ও বিভিন্ন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত বছর খুন, ছিনতাই, ডাকাতি, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতন, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং গণপিটুনির ঘটনায় মানুষের মধ্যে উদ্বেগ বেড়েছিল।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে সারা দেশে ১ হাজার ১৪২টি হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত প্রায় সাড়ে তিন হাজার হত্যা মামলা হয়। চলতি বছরের মার্চে ৩১৭টি, এপ্রিলে ২৮৮টি এবং মে মাসে ৩১০টি হত্যা মামলা হয়েছে।
সম্প্রতি রাজধানীতে প্রকাশ্য দিবালোকে একাধিক সশস্ত্র হামলার ঘটনাও ঘটে। এসব ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় আনা হয়েছে। গত ১২ জুন রামপুরায় শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াসিন খান ওরফে কাইল্লা পলাশকে গুলি করা হয়। পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সদর দপ্তরের ক্রাইম ম্যানেজমেন্ট বিভাগের ডিআইজি আবু সুফিয়ানের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উপকমিটি কাজ করছে। তারা নিয়মিত সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করছে। অপরাধের ধরন, সংগঠিত অপরাধী চক্র ও গ্যাংয়ের কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন করে করণীয় নির্ধারণ করছে কমিটি। গত ২২ জুন থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
পুলিশের জনবল ও অপারেশনাল সক্ষমতা বাড়াতে আরেকটি কমিটি মাঠপর্যায়ে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা পর্যালোচনা করে প্রস্তাব তৈরি করছে। অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ও জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের জনবল, সরঞ্জাম ও সক্ষমতা প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করছে তারা।
সাইবার অপরাধ দমনে সিআইডির সাইবার পুলিশ সেন্টারের ডিআইজির নেতৃত্বে গঠিত কমিটি সাইবার অপরাধ, অনলাইন জালিয়াতি, হয়রানি ও হুমকি মোকাবিলার কৌশল নির্ধারণ করছে। বিশেষ করে সাইবার ও আর্থিক অপরাধ তদন্তে ফরেনসিক ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করছে কমিটি।
রাজনৈতিক সহিংসতা, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদ মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া নিশ্চিত করতে পাঁচ সদস্যের আরেকটি কমিটি কাজ করছে। প্রযুক্তিনির্ভর পুলিশিং বাড়াতে গঠিত ছয় সদস্যের কমিটি স্মার্ট ট্র্যাকিং ব্যবস্থা, বডি-ওর্ন ক্যামেরা ও অনলাইন জিডিসহ আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে।
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও মানব পাচার প্রতিরোধ এবং সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারের কৌশল নিয়েও একটি কমিটি কাজ করছে। এ ছাড়া মানবাধিকার, জবাবদিহি ও নৈতিকতাকে গুরুত্ব দিয়ে আধুনিক প্রশিক্ষণ কাঠামো তৈরির জন্য একটি কমিটি এবং পুলিশ, জনপ্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে কমিউনিটি পুলিশিং শক্তিশালী করার জন্য আরেকটি কমিটি কাজ করছে।
পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চকে গোয়েন্দা তথ্যের নেটওয়ার্ক শক্তিশালী করা এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে তথ্য আদান-প্রদান আরও কার্যকর করার কৌশল নির্ধারণের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এদিকে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাতেও কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। পুলিশের তথ্যমতে, গত বছর নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে প্রায় ২২ হাজার মামলা হয়েছিল, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ বেশি। চলতি বছরে এ পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত দেশে এক হাজারের বেশি নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, পুলিশ কঠোর হলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে রাখা সহজ হয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নমনীয় অবস্থানের সুযোগ নিয়ে অপরাধীরা অপরাধ করেও সহজে পার পাওয়ার ধারণা পোষণ করে। পুলিশের জবাবদিহি ও পেশাদারির ঘাটতিই পরিস্থিতিকে জটিল করে তোলে। উৎস: বিডি-প্রতিদিন।