শিরোনাম
◈ ধৃষ্টতা সকল সীমা ছাড়িয়েছ’; অভিনেত্রী শাওনকে নিয়ে তাজুল ইসলামের ক্ষোভ ◈ উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন, ভালো চাকরির ফাঁদে বিদেশে গিয়ে সাইবার স্ক্যামে বাধ্য, দেশে ফিরলেন ৩৭ বাংলাদেশি ◈ জুনের প্রথম ১০ দিনে দেশে রেমিট্যান্স এসেছে ১২০ কোটি ৩১ লাখ মার্কিন ডলার ◈ দক্ষিণ আফ্রিকায় ঢুকতে গিয়ে বিপাকে ৯ বাংলাদেশি, মিলল ভুয়া পাসপোর্ট-ভিসার প্রমাণ ◈ বিশ্বকাপে দ‌ক্ষিণ কো‌রিয়ার দারুণ সূচনা ◈ আদ্-দ্বীনের হাসপাতাল নয়, বাতিল হয়েছে প্যাথলজি সেন্টারের লাইসেন্স: দাবি আইনজীবী শিশির মনিরের ◈ স্বাস্থ্য খাত ধ্বংস ও হামে শিশুমৃত্যুর জন্য ড. ইউনূসের বিচার চাইলেন শেখ হাসিনা ◈ ‌বিশ্বকা‌পে ব্রাজিল বনাম মর‌ক্কো ম্যাচের রেফা‌রি দেহব্যবসায় জড়িত মামলার আসা‌মি স্লাভকো ভিনচিচ ◈ আ‌মে‌রিকার বিরু‌দ্ধে যুদ্ধ ব‌ন্ধে ইরান এখন পর্যন্ত চুক্তির বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়‌নি ◈ ফুটবল বিশ্বকাপের মধ্যেই আজ থে‌কে শুরু হ‌চ্ছে আরো এক বিশ্বকাপ

প্রকাশিত : ১০ এপ্রিল, ২০২৬, ০৩:১৪ দুপুর
আপডেট : ১২ জুন, ২০২৬, ০৭:০০ সকাল

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

জ্বালানির বাজারে গুজব, উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড়!

মহসিন কবির: মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ থাকলেও মানুষের মনে আতঙ্ক রয়েছে। মানুষের মনে আতঙ্ক ট্রাম্পের প্রতি বিশ্বাস নেই, যেকোনো সময় সংঘাত হতে পারে। সরকার বার বার জ্বালানির সংকট নেই বললেও কোনো কাজে আসছে না।  জ্বালানি তেল নেওয়ার জন্য অ্যাপ চালু করা হয়েছে। 

হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা, ইরানে হামলার পর বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে অনিশ্চয়তার খবরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। কিন্তু সরেজমিন উঠে এসেছে ভিন্ন চিত্র—ডিপোতে মজুত আছে, আমদানি চলমান, তেল পাম্পগুলোতে সরবরাহও স্বাভাবিক। তবুও রাজধানী থেকে জেলা শহর—প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন, উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড়। বাস্তব সংকটের চেয়ে বড় হয়ে উঠেছে গুজব, আতঙ্ক আর অতিরিক্ত মজুতের প্রবণতা। ফলে জ্বালানি খাতে তৈরি হয়েছে এক ‘কৃত্রিম চাপ’, যেখানে সরবরাহ নয়— মানুষের ভয়ই হয়ে উঠেছে সবচেয়ে বড় সংকট। সংশ্লিষ্ট একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র, তেলের বর্তমান মজুতের তথ্য বিশ্লেষণ, মাঠপর্যায়ের তথ্য ও সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণে এমনই চিত্র উঠে এসেছে।

জানা গেছে, দেশে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোলের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। আমদানি কার্যক্রমও চলছে নিয়মিতভাবে। কোথাও বড় ধরনের ঘাটতি নেই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজব ও মানুষের আতঙ্ক—এ দুইয়ের সমন্বয়েই সাময়িকভাবে কিছু এলাকায় অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

তথ্য বলছে, বর্তমানে দেশে ডিজেল মজুত রয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার ৬৪৪ টন। আরও ১ লাখ ৩৮ হাজার টন আসবে ৩০ এপ্রিলের মধ্যে। অকটেন মজুত আছে ১০ হাজার ৫০০ টন। ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে আরও ৭১ হাজার ৫৪৩ টন। এ ছাড়া ১৬ হাজার টন রয়েছে পেট্রোলের মজুত। আরও ৩৬ হাজার টন ৩০ এপ্রিলের মধ্যে আসবে।

পর্যাপ্ত সরবরাহের পরও দীর্ঘ লাইন: রাজধানীর বেশ কয়েকটি পেট্রোল পাম্পে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে—এসব পাম্পে আগের চেয়ে দেড়গুণ জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হলেও দীর্ঘ হচ্ছে লাইন। জনমনে আতঙ্কের কারণে হঠাৎই বেড়েছে চাহিদা। পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা গেছে, রাজধানীর আসাদগেটের সোনার বাংলা সার্ভিস সেন্টারে গত নভেম্বররে অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে ৬ লাখ ৩০ হাজার লিটার, ডিসেম্বরে ৬ লাখ ৭ হাজার ৫০০ লিটার। এ ছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারিতে ৬ লাখ ৩৬ হাজার লিটার। অন্যদিকে মার্চে দেওয়া হয়েছে ৯ লাখ ৪০ হাজার ৫০০ লিটার। একই ফিলিং স্টেশনে নভেম্বরে পেট্রোল দেওয়া হয়েছে ৩৬ হাজার লিটার, ডিসেম্বরে ৪০ হাজার ৫০০ লিটার, জানুয়ারিতে ৩৬ হাজার লিটার হলেও মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৭২ হাজার লিটারে।

একই পাম্পে নভেম্বরে ডিজেল সরবরাহ করা হয় ১ লাখ ৫৭ হাজার ৫০০ লিটার, ডিসেম্বরে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ লিটার, জানুয়ারিতে ১ লাখ ১২ হাজার ৫০০ লিটার। অন্যদিকে মার্চে সরবরাহ বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৫৩ হাজারে। অন্যদিকে মহাখালীর চন্দ্রা মাহজাবিন সার্ভিস সেন্টারে নভেম্বরে অকটেন সরবরাহ করা হয় ৫৮ হাজার ৫০০ লিটার, ডিসেম্বরে ৬১ হাজার ৫০০ লিটার, জানুয়ারিতে ৬০ হাজার লিটার এবং মার্চে সরবরাহ করা হয়েছে ৫৭ হাজার লিটার। অন্যদিকে একই পাম্পে নভেম্বরে ডিজেল সরবরাহ করা হয় ৮ লাখ ৪১ হাজার ৫০০ লিটার, ডিসেম্বরে ১০ লাখ ৪৭ হাজার, জানুয়ারিতে ৯ লাখ ৪৮ হাজার ও মার্চে সরবরাহ করা হয় ৯ লাখ ১৫ হাজার লিটার।

অন্যদিকে গাজীপুরের বোর্ডবাজারের জমজম ফিলিং স্টেশনে নভেম্বরে অকটেন সরবরাহ করা হয় ৩৬ হাজার লিটার, ডিসেম্বরে ৩৬ হাজার লিটার, জানুয়ারিতে ৩১ হাজার ৫০০ লিটার ও মার্চে তা দ্বিগুণ বেড়ে দাঁড়ায় ৬৩ হাজার লিটার। অন্যদিকে একই পাম্পে নভেম্বরে ডিজেল সরবরাহ করা হয় ৩ লাখ ২৮ হাজার ৫০০ লিটার, ডিসেম্বরে ৩ লাখ ৬৯ হাজার লিটার, জানুয়ারিতে ৪ লাখ ৫০০ লিটার ও মার্চে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩ লাখ ৬০ হাজার লিটারে।

এ ছাড়া রাজধানীর শাহবাগের মেঘনা মডেল সার্ভিস সেন্টারে গত জানুয়ারিতে অকটেন সরবরাহ করা হয় ৮ লাখ ২৫ হাজার লিটার, পেট্রোল সরবরাহ করা হয় ৮০ হাজার লিটার। ডিসেম্বরে অকটেন সরবরাহ করা হয় ৭ লাখ ৮০ হাজার লিটার ও পেট্রোল ৮২ হাজার লিটার। অন্যদিকে মার্চে সরবরাহ কিছুটা কমেছে। মার্চ মাসে এ পাম্পে অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে ৭ লাখ ১৪ হাজার লিটার ও পেট্রোল ৬৫ হাজার ৫০০ লিটার। এ ছাড়া মতিঝিলের টয়েনবি সার্কুলার রোডের পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশন ও সার্ভিস সেন্টারে গত ডিসেম্বরে অকটেন ৪৯ হাজার ৫০০ লিটার ও ৫৮ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল সরবরাহ করা হয়।

অন্যদিকে মার্চে একই পাম্পে অকটেন ৪৫ হাজার লিটার ও ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে ৬৩ হাজার লিটার। অন্যদিকে নারায়ণগঞ্জের মদনপুরের আকিব ফিলিং স্টেশনে গত ডিসেম্বরে অকটেন সরবরাহ করা হয়েছে ২২ হাজার ৫০০ লিটার ও ৮৫ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল সরবরাহ করা হয়। অন্যদিকে একই পাম্পে গত মার্চে বাড়িয়ে অকটেন ৩০ হাজার লিটার ও ডিজেল সরবরাহ করা হয় ১ লাখ ২৩ হাজার লিটার। রাজধানীর তেজগাঁওয়ের ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশনে গত ডিসেম্বরে ১৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন ও ২ লাখ ২৯ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে। একই পাম্পে মার্চে অকটেন সরবরাহ করা হয় ১৩ লাখ ৮৬ হাজার লিটার ও ডিজেল সরবরাহ ছিল ৩ লাখ ১৫ হাজার লিটার।

তিনটি অয়েল কোম্পানির দৈনিক সরবরাহ: পদ্মা অয়েল পিএলসি থেকে গত ৪ এপ্রিল ৩ হাজার ৬১৬ মেট্রিক টন ডিজেল সরবরাহ করা হয়। একই সময়ে ৩৬৯ মেট্রিক টন অকটেন ও ৪২৬ মেট্রিক টন পেট্রোল সরবরাহ করা হয়েছে। মেঘনা পেট্রোলিয়াম লিমিটেড থেকে গত ৪ এপ্রিল ৪ হাজার ৪৮৯ মেট্রিক টন ডিজেল, ৪২৭ মেট্রিক টন অকটেন ও ৪৬০ মেট্রিক টন পেট্রোল সরবরাহ করা হয়েছে। একই দিনে যমুনা অয়েল কোম্পানি লিমিটেড থেকে ডিজেল সরবরাহ করা হয়েছে ৩ হাজার ২৩৯ মেট্রিক টন, অকটেন ৩০৪ মেট্রিক টন ও ৪২৬ মেট্রিক টন পেট্রোল সরবরাহ করা হয়েছে।

তথ্য বলছে, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে মাসের প্রতিদিন ডিপো খোলা রেখে জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হচ্ছে। অন্যদিকে, যুদ্ধের আগের মাসে মাত্র ২২ দিন জ্বালানি তেল সরবরাহ করা হয়।

তথ্যমতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ডিজেলবাহী দুটি জাহাজ থেকে জ্বালানি তেল খালাস হচ্ছে। যেখানে ৬১ হাজার ৪১৭ মেট্রিক টন তেল রয়েছে। এ ছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরের পথে আছে অকটেনবাহী একটি জাহাজ। গতকাল জাহাজটি বন্দরে ভেড়ার কথা ছিল। সেখানে মোট ২৫ হাজার মেট্রিক টন অকটেন রয়েছে। এ ছাড়া চলতি মাসে ১৭টি জাহাজে জ্বালানি তেল আসার কথা রয়েছে। তবে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত পরিস্থিতির কারণে তিনটি ডিজেলবাহী জাহাজে ৯০ হাজার মেট্রিক টন, দুটি অকটেনবাহী জাহাজে ৫০ হাজার মেট্রিক টন, দুটি ফার্নেস অয়েলবাহী জাহাজে ৫০ হাজার মেট্রিক টন, একটি জেটফুয়েলবাহী জাহাজে ১৩ হাজার মেট্রিক টন এবং একটি ডিজেল ও জেটফুয়েলবাহী কম্বো জাহাজে ১৮ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল ও ১৫ হাজার মেট্রিক টন জেটফুয়েল সরবরাহের নিশ্চয়তা পাওয়া গেছে। অর্থাৎ, সর্বমোট ৯টি জাহাজ আসার নিশ্চয়তা রয়েছে।

অবশিষ্ট ৮টি জাহাজের (সাতটি ডিজেলবাহী এবং একটি ডিজেল ও জেটফুয়েলবাহী) মধ্যে দুটি জাহাজের পণ্য Force Majure (যুদ্ধ, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মহামারি ইত্যাদি কারণে চুক্তির শর্ত পালন করা অসম্ভব হয়ে পড়ে) করেছে; বাকিগুলো নিশ্চিতকরণ প্রক্রিয়াধীন। এ ছাড়া যুদ্ধের কারণে চুক্তি অনুযায়ী নিয়মিত পার্সেল সরবরাহ কিছু কিছু ক্ষেত্রে Force Majure এবং বিলম্বিত সরবরাহের কারণে সরবরাহ ধারা বজায় রাখার লক্ষ্যে সরাসরি ক্রয় প্রক্রিয়ায় একাধিক পার্সেল আমদানির পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের। এ ছাড়া চলতি মাসে ভারতের আসামে অবস্থিত নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে ২৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানি করা হবে।

বিপিসির অধীনে ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে মজুত: সূত্রমতে, গত ৫ এপ্রিল মজুত ছিল ৩৮ হাজার মেট্রিক টন (ডেডস্টকসহ)। ব্যবহারযোগ্য মজুত ৫ হাজার মেট্রিক টন। তা ছাড়া, সিঙ্গেল পয়েন্ট মুরিং (এসপিএম) প্রকল্প থেকে ৪ হাজার মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল সংগ্রহের ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ডেডস্টক থেকে ক্রুড অয়েল উত্তোলনের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী, মার্চ মাসে নির্ধারিত দুটি কার্গো যুদ্ধের কারণে হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করতে পারেনি।

এ প্রেক্ষাপটে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে ১ লাখ মেট্রিক টন ক্রুড অয়েল দ্রুততম সময়ে আনার জন্য এরই মধ্যে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি অনুমোদন করেছে। শিগগির ক্রুড পাওয়া গেলে ইআরএলের উৎপাদন অব্যাহত রাখা যাবে। এ ছাড়া নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে মে মাসের প্রথম সপ্তাহ নাগাদ সৌদি আরবের ইয়ানবু বন্দর থেকে বিকল্প পথে ১ লাখ মেট্রিক টনের একটি কার্গো এসে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া চলেছে।

কয়েকটি পাম্পের সরেজমিন চিত্র: মিরপুর ইসিবি চত্বর এলাকার সবচেয়ে বড় তেলের পাম্প সুমাত্রা ফিলিং এবং এলপিজি স্টেশন। ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় ২৭৯/৩/জি মানিকদীতে পাম্পটি অবস্থিত। রাজধানীর অন্যান্য ফুয়েল স্টেশনের মতো এই পাম্পেও দীর্ঘ সারিতে তেলের জন্য মানুষের অপেক্ষা। গত মঙ্গলবার এ এলাকা সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, পাম্প থেকে তেল নিতে আসা মোটরসাইকেল ও গাড়ির সারি অন্তত দেড় কিলোমিটার দূরের ইসিবি চত্বর ছাড়িয়ে গেছে। তেল নিতে অপেক্ষমাণ আনুমানিক আট থেকে নয়শ গাড়ির সারি।

প্রচণ্ড রোদে পুড়েও তেলের আশায় মানুষ যানবাহন নিয়ে ঠায় দাড়িয়ে। কথা হয় মিরপুর ১১ এলাকার ইলেকট্রনিকস পণ্যের ব্যবসায়ী রুবেল হোসেনের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘তেল নেওয়া একটা যুদ্ধে পরিণত হয়েছে। সকাল ১০টায় এসে প্রায় আড়াই ঘণ্টা সিরিয়ালে থেকে তেল পেয়েছি।’ অন্য এক বাইক চালক তরিকুল শুভ জানান আক্ষেপের কথা। তিনি বলেন, ‘এমন অনেকে রয়েছেন, যারা একসময় উবার চালাতেন। কিন্তু এখন বাইক চালানো বাদ দিয়ে তেল নিয়ে বিক্রি করছেন। সারাদিন পাম্পে লাইনে বসে থাকেন।’

পাম্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সিরিয়াল লম্বা হলেও তারা সবাইকে তেল দেওয়ার চেষ্টা করছেন। তবে মানুষ এখন সংকটের ভয়ে হয়তো তেল মজুত করছেন। কিছু মানুষ বারবার তেল নিতে পাম্পে আসেন। সুমাত্রা ফিলিং এবং এলপিজি স্টেশনের করপোরেট সেলস অফিসার নোমান বলেন, ‘মিরপুর এলাকায় সবচেয়ে বড় স্টেশনের একটি সুমাত্রা ফিলিং এবং এলপিজি স্টেশনে সব সময় ভিড় থাকে। আমরা অকটেন ও ডিজেল বিক্রি করে থাকি। আমাদের পেট্রোল সার্ভিস নেই। বৈশ্বিক সংকটের কারণে রাজধানীর অন্যান্য স্টেশনের তুলনায় আমাদের এখানে ভিড় বেড়েছে।

তবে পাম্পে তেল থাকা অবস্থায় আমরা কাউকে না করিনি।’ জ্বালানি তেলের সরবরাহ ঠিক থাকলেও কেন এই ভিড়—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বাঙালি এমন এক জাতি, কালকে কেয়ামত শুনলে আজকে বাজারে কাফনের কাপড়ের সংকট দেখা দেবে। দেশে তেল সংকট হতে পারে—এই গুঞ্জনে কিছু মানুষ হয়তো অতিরিক্ত তেল নিচ্ছে। গ্যাসচালিত গাড়িও তেল নিতে আসে। আমরা যতটা পারি এসব বিষয়ে সন্দেহ হলে তাদের নিবৃত্ত করার চেষ্টা করি। এর বাইরে তো আমরা কিছু করতে পারি না।’

বঙ্গভবনের সামনে টয়েনবি সার্কুলার রোডে রয়েছে পূর্ণিমা ফিলিং অ্যান্ড সার্ভিস স্টেশন। বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্ট পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক জানিয়েছেন, এ ফিলিং স্টেশন থেকে ১২০টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের যানবাহনে তেল সরবরাহ করা হয়। তবে স্টেশনটিতে শুধু অকটেন ও ডিজেল পাওয়া যায়। পেট্রোল বিক্রি হয় না। গতকাল বুধবার বিকেলে সরেজমিন দেখা গেছে, পূর্ণিমা ফিলিং স্টেশনের সামনে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার, বাস, পিকআপসহ অর্ধশতাধিক যানবাহনের সারি। ফিলিং স্টেশনের প্রবেশ মুখে ব্যারিকেড। পাম্পের ভেতরে গাড়িতে শুধু ডিজেল সরবরাহ করা হচ্ছে। কর্মচারীরা জানান, পাম্প থেকে এখন শুধু ডিজেল বিক্রি হচ্ছে। অকটেন নেই।

রাত ৯টায় গাড়ি আসবে, তখন অকটেন দেওয়া যাবে। পাম্প কর্তৃপক্ষ জানায়, গত জানুয়ারি থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত মেঘনা পেট্রোলিয়াম থেকে এক লাখ ৭৫ হাজার ৫০০ লিটার ডিজেল ও এক লাখ ৩০ হাজার ৫০০ লিটার অকটেন আনা হয়েছে। গতকাল ফিলিং স্টেশনটিতে ৯ হাজার ৮২ লিটার ডিজেল ও এক হাজার ৩০২ লিটার অকটেন সমাপনী মজুত ছিল। প্রতিষ্ঠানটির ডিপো পরিচালক আবুল কাশেম চৌধুরী বলেন, ‘আমরা এই ফিলিং থেকে ১২০টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের যানবাহনে তেল সরবরাহ করে থাকি। এ ছাড়া ব্যক্তিমালিকানাধীন যানবাহনেও তেল দেওয়া হয়। ফিলিং স্টেশনে তেল আসামাত্রই তা বিক্রি করা হয়।’

পাম্পের একাধিক কর্মচারী জানালেন, সরবরাহ আগের মতোই, কিন্তু ক্রেতাদের চাহিদা বেশি। এমন অনেকেই আছেন, যারা দিনে দুবার তেল নিচ্ছেন। আবার অনেক প্রাইভেটকার গ্যাস এবং ডিজেলে চললেও তারা এখন কেবল ডিজেল নিচ্ছেন। অথচ আগে শুধু বিশেষ প্রয়োজনে ডিজেল ব্যবহার করতেন।

মহাখালীর চন্দ্রা মাহজাবিন (সিএম) সার্ভিস স্টেশন সরেজমিন দেখা গেছে, দূরপাল্লার বাসগুলো লম্বা লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে তেলের জন্য। এই স্টেশনে ফুয়েল ডিসপেন্সারের পাঁচটি মেশিন থাকলেও বন্ধ রয়েছে চারটি। বাকি একটিতে শুধু ডিজেল দেওয়া হচ্ছে। এই স্টেশনে দুটি অকটেন দেওয়ার ফুয়েল ডিসপেন্সার থাকলেও অকটেন না থাকার কারণে তা বন্ধ রাখা হয়েছে। তেল না থাকায় বাইক ও প্রাইভেটকারের লাইন বা ভিড় ছিল না। মাঝে মাঝে কিছু বাইক ও প্রাইভেটকার অকটেন নিতে এসে ফিরে যেতে দেখা গেছে। এই ফিলিং স্টেশনে তিনটি তেল আনার গাড়ি স্টেশনেই রাখা আছে।

মহাখালী চন্দ্র মাহজাবিন (সিএম) সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র ম্যানেজার মো. শামীম সরকার গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘আমাদের ফিলিং স্টেশনে সরকারি নিয়ম মেনে তেল দেওয়া হয়। এখানে ডিজেলের চাহিদা বেশি। বেশিরভাগ তেল দেওয়া হয় দূরপাল্লার বাস ও উত্তর সিটি করপোরেশনকে। এসব গাড়ি আমাদের আগের কাস্টমার। তবে অকটেনের অভাব আছে। নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসে বা তারও আগে প্রতিদিন আমাদের চাহিদা ছিল ৩ থেকে ৪ হাজার লিটার।

তখন সারা দিন অকেটেন বিক্রির করার পর এক থেকে দেড় হাজার লিটান তেল থেকে যেত। এখন আগের পরিমাণেই তেল দেওয়া হয়, তিন থেকে পাঁচ ঘণ্টার মধ্যেই তা শেষ হয়ে যায়। অকটেন সাধারণত বেশি নেয় বাইক ও প্রাইভেটকার। চাহিদা বেশি থাকায় আমাদের পক্ষ থেকে বেশি অকটেন চাওয়া হলেও দেওয়া হচ্ছে না। তাই অকটেনে সংকট আছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়