মনিরুল ইসলাম : একটি চরিত্র দর্শকের মনে কতটা গভীর ছাপ ফেলবে, তা শুধু অভিনয় বা সংলাপের ওপর নির্ভর করে না। চরিত্রের পোশাক, রঙ, মেকআপ, চুলের বিন্যাস কিংবা ক্ষুদ্র একটি অলংকারও তার ব্যক্তিত্ব ও মানসিক অবস্থাকে স্পষ্ট করে তোলে। তাই বিশ্ব চলচ্চিত্রে কস্টিউম ও লুক ডিজাইন এখন আর কেবল সাজসজ্জার বিষয় নয়; এটি গল্প বলার এক শক্তিশালী শিল্পমাধ্যমে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশেও ধীরে ধীরে এই শিল্পমাধ্যমে গড়ে উঠছে নতুন এক প্রজন্ম। তাদের মধ্যেই উল্লেখযোগ্য একটি নাম ফারজানা এ্যানি, যিনি নান্দনিক লুক ডিজাইনের মাধ্যমে চরিত্রকে জীবন্ত করে তুলছেন পর্দায়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঈদসহ সারা বছরজুড়ে মুক্তি পাওয়া সিনেমা ও ওয়েব সিরিজগুলোতে ভিজ্যুয়াল উপস্থাপনায় এসেছে লক্ষণীয় পরিবর্তন। নির্মাতারা এখন চরিত্রভিত্তিক লুক ডেভেলপমেন্ট, কস্টিউম রিসার্চ এবং মুড বোর্ড তৈরিতে গুরুত্ব দিচ্ছেন। সেই ধারাবাহিকতায় এবারের ঈদে মুক্তিপ্রাপ্ত ওয়েব সিরিজ ‘ক্যাকটাস’-এ ফারজানা এ্যানির লুক ডিজাইন দর্শকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
এই সিরিজে মেহেজাবিন চৌধুরী, আরেফিন জিলানী ও প্রীতমের চরিত্রগুলোতে দেখা গেছে ভিন্নধর্মী ভিজ্যুয়াল নির্মাণ। প্রতিটি চরিত্রের জন্য আলাদা রঙ, টেক্সচার এবং স্টাইল ব্যবহারের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে স্বতন্ত্র এক নান্দনিকতা।
ফারজানা এ্যানির মতে, একজন লুক ডিজাইনারের কাজ শুধু শিল্পীকে সুন্দর দেখানো নয়; বরং চরিত্রের ভেতরের গল্পকে দৃশ্যমান করে তোলা। দর্শক যেন চরিত্রকে দেখেই তার মানসিক অবস্থা, জীবনধারা ও সামাজিক অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পান—সেই লক্ষ্যেই কাজ করেন তিনি।
তার লুক ডিজাইনে গথিক নান্দনিকতা, ডার্ক কালার প্যালেট, সমসাময়িক কে-পপ স্টাইল এবং আধুনিক ফ্যাশনের সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়। প্রতিটি চরিত্রের জন্য আলাদা মুড বোর্ড তৈরি করে দীর্ঘ পরিকল্পনার মধ্য দিয়ে তিনি গড়ে তোলেন চূড়ান্ত ভিজ্যুয়াল।
তবে এই কাজ মোটেও সহজ নয়। একটি পোশাক বাস্তবে যেমন দেখায়, ক্যামেরার আলো, ফ্রেমিং এবং কালার গ্রেডিংয়ের কারণে তার উপস্থাপন ভিন্ন হতে পারে। তাই পরিচালক, সিনেমাটোগ্রাফার, মেকআপ আর্টিস্ট এবং কস্টিউম টিমের সমন্বয়ে দীর্ঘ প্রস্তুতির প্রয়োজন হয়।
ফারজানা এ্যানির এই সৃজনশীল যাত্রা ইতোমধ্যে পেয়েছে স্বীকৃতিও। চরকি অ্যাওয়ার্ডসে ক্রিটিকস চয়েজ ক্যাটাগরিতে মনোনয়ন পাওয়ার পাশাপাশি বাইফা (BIFA) অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫-এ তিনি অর্জন করেছেন সেরা কস্টিউম ডিজাইনার সম্মাননা।
ব্যক্তিগত জীবনেও এ্যানি বিশ্বাস করেন, ফ্যাশনের আসল সৌন্দর্য স্বকীয়তায়। আর কাজের ক্ষেত্রে তিনি সবসময় নতুন ভাবনা, নতুন টেক্সচার এবং আন্তর্জাতিক মানের গবেষণাভিত্তিক লুক ডিজাইন নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আগ্রহী।
বাংলাদেশের বর্তমান চলচ্চিত্র ও ওয়েব কনটেন্টে যে নতুন ভিজ্যুয়াল ভাষা তৈরি হচ্ছে, তার পেছনে নীরবে কাজ করে যাচ্ছেন ফারজানা এ্যানির মতো শিল্পীরা। পর্দায় দর্শক যে চরিত্র দেখে মুগ্ধ হন, তার বড় একটি অংশই তৈরি হয় ক্যামেরার পেছনে—একজন দক্ষ লুক ও কস্টিউম ডিজাইনারের সৃজনশীল স্পর্শে।