শিরোনাম
◈ বিদ্যুৎহীন সেন্টমার্টিন, ল্যাম্প-মোমবাতির আলোয় রাত কাটছে দ্বীপবাসীর ◈ কাপ্তাই লেকে পানির উচ্চতা বাড়ায় ৫ ইউনিটে বিদ্যুৎ উৎপাদন, মিলছে ১৭৯ মেগাওয়াট ◈ চট্টগ্রামে শনিবারের এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত ◈ নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নে আইএমএফের শর্ত কতটা চ্যালেঞ্জের? ◈ ডিসেম্বরে দেশে ফিরব, দলের নেতাদের সঙ্গে আদালতে আত্মসমর্পণ করব: রয়টার্সকে হাসিনা ◈ বন্যা পরিস্থিতি মোকাবিলায় ১০ নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ◈ গ্রামীণ স্বাস্থ্যসেবায় বড় উদ্যোগ: ৪১৮ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হবে ১০১ শয্যার, নতুন ১৩ উপজেলায় হাসপাতাল ◈ উগ্রবাদী কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত ‘ফাতাহ কমব্যাট সিস্টেম’ সম্পর্কে যা জানা যাচ্ছে ◈ টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে পাঁচ নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার ওপরে, কয়েক জেলায় বন্যা শঙ্কা ◈ জাপানের দিকে ধেয়ে আসছে শক্তিশালী টাইফুন ‘বাভি’, চরম সতর্কতা, ফ্লাইট বাতিল ও নিরাপদে সরানো হচ্ছে মানুষ

প্রকাশিত : ১০ জুলাই, ২০২৬, ০৮:০৮ রাত
আপডেট : ১০ জুলাই, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিতে তলিয়েছে নিম্নাঞ্চল, সুফল মেলেনি ৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্পের

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: টানা চার দিনের বৃষ্টিতে খুলনা মহানগরীর অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও তারও বেশি পানি জমে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র জলাবদ্ধতা। এতে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, রিকশা ও ইজিবাইকচালকসহ নগরবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত খুলনা আবহাওয়া অফিস ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে। এর ফলে নগরীর টুটপাড়া, রয়েল মোড়, মিস্ত্রিপাড়া, আহসান আহমেদ রোড, খানজাহান আলী সড়ক, বাস্তুহারা, বাইতিপাড়া, চানমারী, লবণচরা, রূপসা নতুন বাজারসহ অধিকাংশ নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে গেছে।

খুলনা আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মিজানুর রহমান জানান, মঙ্গলবার থেকে শুক্রবার সকাল ৯টা পর্যন্ত ১৮৪ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে ১ জুলাই মাত্র ৩০ মিলিমিটার বৃষ্টিতেই নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল।

পানি নামার পথ নেই

মোল্লাপাড়া এলাকার বাসিন্দা ইলিয়াস হোসেন বলেন, “বৃষ্টি হলেই রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়। ড্রেন নিয়মিত পরিষ্কার না করায় ময়লা-আবর্জনায় ভরে থাকে। ফলে ড্রেনের নোংরা পানি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।”

৬ নম্বর ওয়ার্ডের কবীর বটতলা এলাকার বাসিন্দা আলমগীর শেখ বলেন, “এবার যতবার বৃষ্টি হচ্ছে, ততবারই বাড়ির নিচতলায় পানি উঠছে। আগে একদিনে পানি নেমে যেত, এখন সাত-আট দিন পর্যন্ত জমে থাকে।”

তিনি অভিযোগ করেন, প্রায় এক বছর আগে এলাকার রাস্তা ও ড্রেন প্রায় তিন ফুট উঁচু করে নির্মাণ করা হলেও বাড়ির পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই বাড়ির উঠান ও নিচতলা পানিতে তলিয়ে যাচ্ছে।

আলমগীর শেখ বলেন, “রাস্তা ও ড্রেন উঁচু হওয়ায় বাড়িগুলো এখন নিচু হয়ে গেছে। পানি বের হওয়ার পথ পাচ্ছে না। এতে ঘরের মেঝে, দেয়াল ও আসবাবপত্র ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দুর্গন্ধ ছড়ানোর পাশাপাশি মশার উপদ্রবও বেড়েছে।”

ব্যবসা-বাণিজ্যেও প্রভাব

নগরীর ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাস্তুহারা কাঁচাবাজারের মুদি দোকানি আব্দুর রব বলেন, “একটু বৃষ্টি হলেই বাজার ডুবে যায়। ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়ে। পাশের বড় ড্রেনটির সংস্কার কাজ দীর্ঘদিন ধরে চলছে। কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগও কমছে না।”

৭ নম্বর ওয়ার্ডের কাশিপুর চৌরাস্তা এলাকার ইজিবাইকচালক ছোটন গাজী বলেন, “আজ সকালে গাড়ি নিয়ে বের হয়ে বিপদে পড়েছি। ইঞ্জিনে পানি ঢুকে গাড়ি বন্ধ হয়ে গেছে। গ্যারেজে রেখে বাড়ি ফিরতে হয়েছে।”

৮২৩ কোটি টাকার প্রকল্প, তবুও জলাবদ্ধতা

খুলনা সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, ২০১৮-১৯ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় ৮২৩ কোটি টাকার মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এর আওতায় খাল খনন, ড্রেন নির্মাণ ও বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন কাজ সম্পন্ন হয়।

তবে নাগরিকদের অভিযোগ, অপরিকল্পিত ড্রেনেজ ব্যবস্থা, নকশাগত ত্রুটি, ধীরগতির উন্নয়ন কাজ এবং বিভিন্ন স্থানে রাস্তা উঁচু করায় জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। বরং অনেক এলাকায় বাড়িঘর রাস্তার তুলনায় নিচু হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টির পানি ও ড্রেনের নোংরা পানি ঘরে ঢুকে পড়ছে।

নাগরিক সমাজের উদ্বেগ

খুলনার নারী নেত্রী অ্যাডভোকেট শামীমা সুলতানা শিলু বলেন, “খাল সংকুচিত হওয়া, নদী-খাল ভরাট, জলাধার দখল এবং জোয়ারের সময় রূপসা নদীর পানি শহরে ঢুকে পড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গত রাতের বৃষ্টিতে আমার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাঁচটি শ্রেণিকক্ষ হাঁটুসমান পানিতে তলিয়ে গেছে।”

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, “বৃষ্টি হলেই খুলনা ডুবে যায়। উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও জলাবদ্ধতার পুরোনো সমস্যা থেকে নগরবাসী মুক্তি পায়নি।”

কেসিসির ব্যাখ্যা

কেসিসি কর্মকর্তারা বলছেন, রূপসা ও ভৈরব নদীর তলদেশ উঁচু হয়ে যাওয়ায় জোয়ারের সময় শহরের পানি দ্রুত নামতে পারে না। ফলে বৃষ্টির সময় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার চলমান উন্নয়ন কাজের কারণেও অনেক স্থানে পানি নিষ্কাশন ব্যাহত হচ্ছে।

প্রকল্প পরিচালক ও খুলনা সিটি করপোরেশনের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোহাম্মদ মাসুদ করিম বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতায় বিভিন্ন ব্যাসার্ধের ১৪৭ কিলোমিটার দীর্ঘ ১৬৯টি ড্রেন নির্মাণ করা হয়েছে। সবগুলোই ঢাকনাযুক্ত ড্রেন।”

কেসিসির প্রধান কনজারভেন্সি কর্মকর্তা মো. আনিসুর রহমান বলেন, “আমরা নিয়মিত ড্রেন পরিষ্কার করছি। তবে টানা বৃষ্টির কারণে আপাতত কাজ ব্যাহত হচ্ছে।”

খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, “নগরের জলাবদ্ধতা সমস্যার স্থায়ী সমাধানে পরিকল্পিতভাবে কাজ করা হচ্ছে। প্রাকৃতিক খাল ও জলাশয় সংরক্ষণ এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়নে সমন্বিত কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে সমস্যার কারণগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।”

তবে নগরবাসীর প্রশ্ন—বছরের পর বছর ধরে শত শত কোটি টাকা ব্যয় করেও কেন সামান্য বৃষ্টিতেই খুলনা নগরী পানির নিচে চলে যায়? সেই প্রশ্নের উত্তর এখনও অধরাই রয়ে গেছে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়