শিরোনাম
◈ জর্ডানে মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের হামলা, ব‌্যাপক ক্ষয় ক্ষ‌তি ◈ আওয়ামী লীগে শেখ সেলিমকে নিয়ে আলোচনা কেন? ◈ ইন্টার মিলান‌কে হা‌রি‌য়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে শুভ যাত্রা রিয়াল মা‌দ্রিদের ◈ পো‌র্তো‌কে হা‌রি‌য়ে চ্যাম্পিয়নস লিগে শুভ সূচনা ম্যানচেষ্টার সিটির ◈ জোটে ছাড় না পাওয়ার পর সিটি নির্বাচনে এনসিপির নতুন পরিকল্পনা ◈ লাখ লাখ টাকা বকেয়া, পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে বাবরদের প্রাক্তন কোচ গি‌লেস‌পি! ◈ দেশে সারের সংকট নেই, তবু হট্টগোল কেন? ◈ ভেনিসে বাঁধনকে হেনস্তা-হামলা, অভিযুক্তদের কয়েকজনের পরিচয় শনাক্ত ◈ মক্কা চুক্তিতে ইরান: রাশিয়ার প্রস্তাবে নতুন নিরাপত্তা সমীকরণ ◈ বেনজীরকে ফেরাতে তৎপর সরকার, ২২ সেপ্টেম্বরের আগেই যাবে নতুন নথি : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

প্রকাশিত : ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৪৬ সকাল
আপডেট : ০৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৯:৪৬ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নামাজ ও প্রার্থনার সময় মস্তিষ্কে যে পরিবর্তন ঘটে

প্রথম আলো : আধুনিক নিউরোসায়েন্স বা স্নায়ুবিজ্ঞান এক যুগান্তকারী সত্য উন্মোচন করেছে। ব্রেন স্ক্যানের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন যে প্রার্থনার সময় মানুষের মস্তিষ্কে যে গভীর রূপান্তর ঘটে, তা কোনো অলীক ভ্রম নয়; বরং এটি সম্পূর্ণ বস্তুনিষ্ঠ ও শারীরিক বাস্তবতা।

বিশেষ করে নামাজ বা প্রার্থনায় নিমগ্ন থাকাকালে মানব মস্তিষ্ক কীভাবে স্রষ্টার সঙ্গে এক জীবন্ত সংলাপে যুক্ত হয়, তা আধুনিক গবেষণায় বিশদভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের টমাস জেফারসন ইউনিভার্সিটি হসপিটালের স্নায়ুবিজ্ঞানী ডা. অ্যান্ড্রু নিউবার্গ দীর্ঘকাল ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষ ও সংশয়বাদীদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন।

তিনি ক্ষতিকর প্রভাবহীন বিশেষ তেজস্ক্রিয় উপাদান প্রয়োগ করে ‘স্পেক্ট’ (এসপিইসিটি–সিঙ্গেল-ফোটন এমিশন কম্পিউটেড টমোগ্রাফি) স্ক্যান প্রযুক্তির মাধ্যমে মুসলিম ইমাম, ক্যাথলিক নান, তিব্বতি সন্ন্যাসী এবং ঈশ্বরের অস্তিত্বে অবিশ্বাসী ধ্যানমগ্ন ব্যক্তিদের মস্তিষ্ক গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেন।

এই গবেষণায় মস্তিষ্কের দুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অংশ—‘ফ্রন্টাল লোব’ এবং ‘প্যারাইটাল লোব’-এ অভাবনীয় পরিবর্তন লক্ষ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্রের টমাস জেফারসন ইউনিভার্সিটি হসপিটালের স্নায়ুবিজ্ঞানী ডা. অ্যান্ড্রু নিউবার্গ দীর্ঘকাল ধরে ধর্মপ্রাণ মানুষ ও সংশয়বাদীদের মস্তিষ্কের কার্যকারিতা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেন।

ফ্রন্টাল লোব: মানব মস্তিষ্কের সিইও

মানব মস্তিষ্ক মূলত ছয়টি প্রধান অংশে বিভক্ত; যার মধ্যে কপাল বা সম্মুখভাগের ঠিক পেছনে অবস্থিত ‘ফ্রন্টাল লোব’ হলো সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটি সমগ্র মস্তিষ্কের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জায়গা জুড়ে থাকে।

মানুষের বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এই অংশটি সবার শেষে পূর্ণাঙ্গভাবে বিকশিত হয় এবং বয়োবৃদ্ধকালে এর কার্যক্ষমতাই সর্বপ্রথম হ্রাস পেতে শুরু করে।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় ফ্রন্টাল লোব হলো মস্তিষ্কের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও)। মানুষের সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, আবেগ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতিশক্তি সংরক্ষণ, গভীর মনোযোগ এবং ব্যক্তিত্ব নির্ধারণে এই অংশটি মুখ্য ভূমিকা পালন করে।

সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিষয় হলো, একজন মানুষ যখন অন্য কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সশরীরে সরাসরি অর্থপূর্ণ কথা বলে বা সক্রিয়ভাবে কারো কথা শোনে, তখন এই ফ্রন্টাল লোব অত্যন্ত সচল হয়ে ওঠে।

প্রার্থনায় ফ্রন্টাল লোবে প্রতিফলন

ডা. নিউবার্গের গবেষণায় যখন একজন উপাসনাকারীর প্রার্থনারত অবস্থার স্পেক্ট স্ক্যান করা হয়, তখন দেখা যায় যে প্রার্থনাকালে মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোব এবং ভাষা নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে (ল্যাঙ্গুয়েজ) রক্তপ্রবাহ ও স্নায়বিক সক্রিয়তা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণের ফলাফল অত্যন্ত বিস্ময়কর। স্ক্যানের চিত্র স্পষ্ট করে দেয় যে, একজন মানুষ যখন কায়মনোবাক্যে আল্লাহর কাছে দোয়া করে বা নামাজে দাঁড়িয়ে কোরআন পাঠ ও মোনাজাত করে, তখন তার মস্তিষ্ক এটিকে নিছক মনগড়া কোনো একক কল্পনা হিসেবে গ্রহণ করে না।

বরং মস্তিষ্কের নিউরোলজিক্যাল চিত্র দেখে বোঝার কোনো উপায় থাকে না যে মানুষটি কোনো পার্থিব ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি কথা বলছে, নাকি অদেখা স্রষ্টার সঙ্গে কথা বলছে!

অর্থাৎ বস্তুগত বাস্তবতায় দুজন ব্যক্তির মুখোমুখি আলোচনার সময় মস্তিষ্কে ঠিক যে নিউরোট্রান্সমিশন ও রক্তসঞ্চালন ঘটে, নামাজের সময় আল্লাহর সঙ্গে বান্দার সংলাপেও অবিকল একই বাস্তবতা প্রতিফলিত হয়।

অচিরেই আমার নিদর্শনাবলি তাদের প্রদর্শন করব দূরদিগন্তে এবং তাদের নিজেদের শরীরের ভেতরেও; যাতে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে এই কোরআনই চূড়ান্ত সত্য। আপনার প্রতিপালক কি সব কিছুর ওপর প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যথেষ্ট নন?----সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৫৩

প্যারাইটাল লোব ও ‘খুশু’

মস্তিষ্কের পেছনের অংশে দুই গোলার্ধে বিভক্ত ‘প্যারাইটাল লোব’ মূলত মানুষের শরীর ও পারিপার্শ্বিক স্থান-কালের অবস্থান (ওরিয়েন্টেশন) এবং বাহ্যিক সংবেদনশীল তথ্য প্রক্রিয়াজাত করে। আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি, চারপাশের পরিবেশ কেমন এবং নিজের শারীরিক উপস্থিতি সম্পর্কে সজাগ রাখে এই অংশটি।

গবেষণায় দেখা গেছে, গভীর প্রার্থনা ও ধ্যানের সময় এই প্যারাইটাল লোবের রক্তপ্রবাহ ও সক্রিয়তা ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়। এর কারণ হলো, উপাসনার চরম একাগ্রতায় মস্তিষ্ক বাইরের যাবতীয় পার্থিব কোলাহল ও বাহ্যিক ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য সংকেতকে অবরুদ্ধ করে দেয়।

এর ফলে মানুষ নিজের ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্ব ভুলে এক পরম ঐশ্বরিক শান্তিতে নিজেকে বিলীন করে দেয়, যা ইসলামি পরিভাষায় ‘খুশু-খুজু’ বা নামাজের পরম আত্মনিবেদন নামে পরিচিত। এই প্রক্রিয়াই মানুষের মানসিক অস্থিরতা, উদ্বেগ ও হতাশা দূর করে গভীর আত্মিক প্রশান্তি এনে দেয়।

সংশয়বাদী মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়া কেন ভিন্ন

ডা. নিউবার্গ তাঁর গবেষণায় সংশয়বাদী বা নাস্তিক্যবাদী ধ্যানমগ্ন ব্যক্তিদের মস্তিষ্কও স্ক্যান করেছিলেন। তাঁরা যখন মেডিটেশন করছিলেন বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করছিলেন, তখন তাঁদের ফ্রন্টাল লোবে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।

ধ্যান করার পূর্ববর্তী স্ক্যান এবং পরবর্তী স্ক্যানের মধ্যে কোনো ইতিবাচক পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়নি।

স্নায়ুবিজ্ঞানীরা এর কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেছেন যে, একজন সংশয়বাদীর কাছে স্রষ্টার অস্তিত্ব সম্পূর্ণরূপে অকল্পনীয় ও শূন্য। ফলে তাঁর মস্তিষ্কের সামাজিক ও যোগাযোগের স্নায়বিক জালিকাগুলো স্রষ্টাকে ঘিরে সক্রিয় হতে পারে না।

অন্যদিকে একজন বিশ্বাসীর কাছে আল্লাহ হলেন পরম সত্য ও সর্বশক্তিমান সত্তা। তাই বিশ্বাসী মানুষের মস্তিষ্ক প্রার্থনাকে সম্পূর্ণ জীবন্ত সত্য হিসেবে ধারণ করে এবং শারীরিক ও মানসিক সুস্থতার অনুকূলে সাড়া দেয়।

গবেষণায় সংশয়বাদী বা নাস্তিক্যবাদী ধ্যানমগ্ন ব্যক্তিদের মস্তিষ্কও স্ক্যান করেছিলেন। তাঁরা যখন মেডিটেশন করছিলেন বা ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে চিন্তা করছিলেন, তখন তাঁদের ফ্রন্টাল লোবে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন দেখা যায়নি।

কোরআনের ঘোষণা

ডা. অ্যান্ড্রু নিউবার্গ তাঁর গবেষণার সারসংক্ষেপ টেনে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ একটি মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, “আমাদের মস্তিষ্ক এমনভাবে সুবিন্যস্ত যে ঈশ্বর ও ধর্ম মানুষের মস্তিষ্ককে সুস্থ রাখা, আত্মরক্ষা এবং আত্মিক সীমানা অতিক্রম করানোর ক্ষেত্রে সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। মানুষের মস্তিষ্কের মৌলিক গঠনে বড় কোনো রূপান্তর না ঘটলে ঈশ্বরভাবনা মানবজাতি থেকে কখনোই নিঃশেষ হবে না।”

বিজ্ঞান আজ যে সত্য মস্তিষ্কের নিউরন বিশ্লেষণ করে আবিষ্কার করছে, মহাগ্রন্থ আল-কোরআন চৌদ্দশত বছর পূর্বেই সেই দেহতত্ত্ব ও মহাবিশ্বের নিদর্শনের ঘোষণা দিয়েছে।

মহান আল্লাহ সুরা ফুসসিলাতে বলেছেন, “অচিরেই আমি তাদেরকে আমার নিদর্শনাবলি প্রদর্শন করব দূরদিগন্তে এবং তাদের নিজেদের শরীরের ভেতরেও; যাতে তাদের কাছে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে যে এই কোরআনই চূড়ান্ত সত্য। আপনার প্রতিপালক কি সব কিছুর ওপর প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে যথেষ্ট নন?” (সুরা ফুসসিলাত, আয়াত: ৫৩)

সূত্র: অ্যান্ড্রু নিউবার্গ, হোয়াই গড ওন্ট গো অ্যাওয়ে: ব্রেন সায়েন্স অ্যান্ড দ্য বায়োলজি অব বিলিফ, ব্যালেন্টাইন বুকস, নিউ ইয়র্ক, ২০০১, পৃষ্ঠা: ৩৫–৪৮।

  • সর্বশেষ