উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা কাঠামোয় ইরানকে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। তিনি বলেছেন, এই কাঠামোয় ইরানের অংশগ্রহণ আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হতে পারে।
সম্প্রতি পাকিস্তান, সৌদি আরব ও তুরস্কের মধ্যে সই হওয়া ‘মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি’ নিয়ে ল্যাভরভ এ কথা বলেন। গত ৭ আগস্ট সই হওয়া এই চুক্তিকে বৃহত্তর আঞ্চলিক নিরাপত্তা সহযোগিতার একটি সম্ভাব্য কাঠামো হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। চুক্তিতে পারস্পরিক নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সহযোগিতার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
গত সোমবার মস্কো স্টেট ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল রিলেশনসে (এমজিআইএমও) শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সঙ্গে এক মতবিনিময় অনুষ্ঠানে ল্যাভরভ উপসাগরীয় অঞ্চলের নিরাপত্তা সহযোগিতা নিয়ে রাশিয়ার দীর্ঘদিনের অবস্থান তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দুই দশকেরও বেশি সময় আগে রাশিয়া প্রস্তাব দিয়েছিল, উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানকে নিয়েও আঞ্চলিক নিরাপত্তার একটি কাঠামো তৈরির লক্ষ্যে বৈঠকে বসতে পারে। মস্কোর ধারণা ছিল, আলোচনার মাধ্যমে দেশগুলো নিজেদের পারস্পরিক অভিযোগ তুলে ধরবে এবং আস্থা তৈরির কিছু পদক্ষেপে একমত হতে পারবে।
ল্যাভরভ আরও বলেন, আরব লিগ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) এবং জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে একই সময়ে আলোচনায় যুক্ত করা হলে, এ ধরনের আলোচনা আয়োজন করা আরও সহজ হবে বলে রাশিয়া মনে করেছিল। তবে গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর পর আঞ্চলিক পরিস্থিতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির পরিধি আরও বাড়ানোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে ল্যাভরভ বলেন, চুক্তির উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলের বাইরের দেশগুলোর জন্যও এর সদস্যপদ উন্মুক্ত রাখা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মিসরের নাম প্রায়ই আলোচনায় আসে।
ল্যাভরভের মতে, মক্কা চুক্তির মতো একটি কাঠামোয় ইরানের অংশগ্রহণের শর্ত নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো হলে, তা রাশিয়ার প্রস্তাবিত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামো বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ হতে পারে। তবে এ ধরনের কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় রাশিয়া নেতৃত্বের ভূমিকা নেওয়ার চেষ্টা করবে না বলেও স্পষ্ট করেন রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে আঞ্চলিক দেশগুলো নিজেদের মধ্যে আরও শক্তিশালী নিরাপত্তা সহযোগিতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। গত ৯ আগস্ট পাকিস্তানের উপপ্রধানমন্ত্রী ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী সিনেটর ইসহাক দার বলেছিলেন, মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তির মূলনীতি মেনে চলতে ইচ্ছুক দেশগুলোর জন্য এর সদস্যপদ উন্মুক্ত রয়েছে।
ইরানকে মক্কা চুক্তিতে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এরই মধ্যে কিছু অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে সৌদি আরবের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া এবং পাকিস্তানের সঙ্গে তেহরানের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ এই সম্ভাবনাকে কিছুটা জোরালো করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় পাকিস্তান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখায় তেহরান ও ইসলামাবাদের সম্পর্কও আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। দুই প্রতিবেশী দেশ এখন নিজেদের ভৌগোলিক নৈকট্যকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর চেষ্টা করছে।
তবে ইরানের চুক্তিতে যোগ দেওয়ার ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে আছে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত এবং হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে অনিশ্চয়তা। মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তিতে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের মতো পারস্পরিক প্রতিরক্ষা প্রতিশ্রুতি থাকায় ইরানের সদস্যপদ নিয়ে জটিলতা তৈরি হতে পারে। কারণ, কোনো সদস্য দেশের ওপর হামলা হলে অন্য সদস্যদেরও তা নিজেদের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করে প্রতিরোধে এগিয়ে আসার বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। এ কারণে ইরানকে চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত করা সহজ হবে না বলে মনে করা হচ্ছে। খবর আনাদোলু এজেন্সি, জিও নিউজ ও দ্য ডিপ্লোম্যাট ইনসাইটের।