রাসুলুল্লাহ (স.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ছিল সাহাবায়ে কেরামের (রা.) জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। তাঁর কথা, কাজ, চরিত্র ও নির্দেশনা অনুসরণে তাঁরা ছিলেন অত্যন্ত যত্নশীল। নবীজির প্রতি ভালোবাসা তাঁরা তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ ও আদর্শ নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন।
রবিউল আউয়াল মাস এলে মুসলিম সমাজে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্ম ও জীবন নিয়ে আলোচনা হয়। এ সময় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে, রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্ম উপলক্ষে সাহাবায়ে কেরাম (রা.) কী করতেন? জন্মদিন বা জন্মের মাসকে কেন্দ্র করে তাঁরা কি কোনো বিশেষ আয়োজন করতেন?
নির্দিষ্ট বার্ষিক আয়োজনের প্রমাণ নেই
নির্ভরযোগ্য হাদিস ও প্রামাণ্য ঐতিহাসিক বর্ণনায় সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্ম উপলক্ষে প্রতিবছর কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান, সমাবেশ বা বিশেষ ইবাদত করতেন-এমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগেও জন্ম উপলক্ষে নির্দিষ্ট বার্ষিক আয়োজনের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না।
এর অর্থ এই নয় যে তাঁরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্ম ও জীবনকে গুরুত্ব দিতেন না। তাঁরা তাঁকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন এবং তাঁর জীবন, কথা ও আদর্শ নিজেদের জীবনে ধারণ করেছিলেন।
জন্মের দিনের সঙ্গে সোমবারের রোজার সম্পর্ক
রাসুলুল্লাহ (স.) নিজেই তাঁর জন্মের দিনের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁকে সোমবার রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, ‘এ দিনেই আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমার কাছে ওহি নাজিল হয়েছে।’ (সহিহ মুসলিম: ১১৬২; সুনানে আবু দাউদ: ২৪২৬)
হাদিসটি থেকে জানা যায়, জন্মের দিনের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর নিজের আমল হিসেবে সোমবারের রোজার সম্পর্ক রয়েছে। তবে জন্মদিনকে কেন্দ্র করে প্রতিবছর কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান, সমাবেশ বা বিশেষ ইবাদতের নির্দেশ এ হাদিসে নেই।
সাহাবিদের কাছে সীরাতচর্চা ছিল নিয়মিত
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন সাহাবায়ে কেরামের কাছে কোনো নির্দিষ্ট দিন বা মাসের আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর জীবন, চরিত্র, দাওয়াত ও বিভিন্ন ঘটনা তাঁরা শিখেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে শিক্ষা দিয়েছেন।
তাবেয়ি মুহাম্মদ ইবনে সাদ ইবনে আবি ওয়াক্কাস (রহ.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম তাঁদের সন্তানদের রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবনচরিত ও যুদ্ধসংক্রান্ত ঘটনাবলি এমনভাবে শিক্ষা দিতেন, যেভাবে তাঁরা কোরআনের সুরা শিক্ষা দিতেন। (আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া)
এ বর্ণনা সাহাবিদের কাছে সীরাতচর্চার গুরুত্ব তুলে ধরে। তাঁর সুন্নাহ জানা, তা অনুসরণ করা এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া ছিল তাঁদের নিয়মিত জীবনের অংশ।
নবীপ্রেম ও অনুসরণের সম্পর্ক
নবীপ্রেমের সঙ্গে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণের সম্পর্ক কোরআনেও স্পষ্ট করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।’ (সুরা আলে ইমরান: ৩১)
সাহাবায়ে কেরামের জীবনেও এ আয়াতের বাস্তব প্রতিফলন দেখা যায়। তাঁরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর কথা ও কাজ জানার পাশাপাশি তা নিজেদের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করেছেন। তাই নবীপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ করা এবং তাঁর আদর্শ অনুযায়ী জীবন গড়ার চেষ্টা করা।
রবিউল আউয়ালে সাহাবিরা যা করতেন
রবিউল আউয়ালকে ঘিরে সাহাবায়ে কেরাম (রা.)-এর কোনো বিশেষ বার্ষিক আয়োজনের নির্ভরযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায় না। তাঁদের কাছে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর স্মরণ কোনো একটি মাসের আনুষ্ঠানিকতার বিষয় ছিল না। তাঁর সীরাত ও সুন্নাহ ছিল নিয়মিত জ্ঞানচর্চা ও আমলের অংশ।
তাঁরা তাঁর জীবন শিখেছেন, সুন্নাহ অনুসরণ করেছেন এবং পরবর্তী প্রজন্মকে তা শিখিয়েছেন। আর জন্মের দিনের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রমাণিত আমল হিসেবে রয়েছে সোমবারের রোজা। অর্থাৎ, সাহাবিদের নবীপ্রেমের প্রকাশ ছিল তাঁর জীবন ও আদর্শ অনুসরণে, নির্দিষ্ট বার্ষিক আনুষ্ঠানিকতায় নয়।
মিলাদুন্নবী নিয়ে আলেমদের মতভেদ
মিলাদুন্নবী উপলক্ষে সীরাত আলোচনা, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ পাঠ বা ধর্মীয় আয়োজন করা যাবে কি না, এ বিষয়ে পরবর্তী যুগের আলেমদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে।
একদল আলেম মনে করেন, রাসুলুল্লাহ (স.), সাহাবায়ে কেরাম (রা.), তাবেয়ি ও তাবে-তাবেয়িদের যুগে জন্ম উপলক্ষে নির্দিষ্ট বার্ষিক আয়োজনের প্রমাণ নেই। তাই কোনো নির্দিষ্ট দিনকে বিশেষ ধর্মীয় আমলের জন্য নির্ধারণ করা সমর্থনযোগ্য নয়।
অন্যদিকে কিছু আলেম মনে করেন, এটিকে ফরজ, ওয়াজিব বা নির্ধারিত সুন্নাহ মনে না করে কোরআন তেলাওয়াত, সীরাত আলোচনা, দরুদ পাঠ ও অন্যান্য নেক আমলের মাধ্যমে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জীবন ও আদর্শ স্মরণ করা যেতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রেও শরিয়তের সীমারেখা মেনে চলার ওপর তাঁরা গুরুত্ব দেন।
এ বিষয়ে মতভেদ থাকলেও পরস্পরের প্রতি সম্মান ও সংযম বজায় রাখা জরুরি। ধর্মীয় মতপার্থক্য ব্যক্তিগত আক্রমণ বা হেয় করার কারণ হওয়া উচিত নয়।
সারকথা, সাহাবায়ে কেরাম (রা.) রাসুলুল্লাহ (স.)-এর জন্ম উপলক্ষে প্রতিবছর কোনো নির্দিষ্ট অনুষ্ঠান বা বিশেষ ইবাদত করতেন বলে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তবে তাঁর জন্মের দিনের সঙ্গে সোমবারের রোজার সম্পর্ক সহিহ হাদিসে প্রমাণিত। আর সাহাবিদের জীবন থেকে দেখা যায়, তাঁর সীরাত ও সুন্নাহ তাঁদের নিয়মিত জীবনের বিষয় ছিল।
তাই নবীপ্রেমের গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাহ জানা, অনুসরণ করা এবং তাঁর আদর্শ নিজের জীবনে বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।