ফিলিস্তিন মুসলিম উম্মাহর কাছে শুধু একটি ভূখণ্ডের নাম নয়; এটি নবী-রাসুলদের পদচারণায় ধন্য, ওহির ইতিহাসে সমৃদ্ধ এবং ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ মসজিদুল আকসার আবাসভূমি। ইসলামী ঐতিহ্যে এটি বৃহত্তর শাম অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত, যার মধ্যে বর্তমান ফিলিস্তিন, সিরিয়া, জর্ডান ও লেবাননের অংশ রয়েছে।
কুরআন ও সহিহ হাদিসে শাম ও বায়তুল মুকাদ্দাসের মর্যাদা, বরকত এবং শেষ যুগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার উল্লেখ এসেছে। তবে এসব বর্ণনার ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অনুমান, রাজনৈতিক বিশ্লেষণ বা সমসাময়িক ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে হাদিসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পরিবর্তে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর সীমার মধ্যেই থাকা একজন মুসলিমের জন্য অধিক নিরাপদ।
কুরআনে বায়তুল মুকাদ্দাসের মর্যাদা
سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ لَيْلًا مِّنَ الْمَسْجِدِ الْحَرَامِ إِلَى الْمَسْجِدِ الْأَقْصَى الَّذِي بَارَكْنَا حَوْلَهُ
‘পবিত্র ও মহিমাময় তিনি, যিনি তার বান্দাকে রাতের বেলা মসজিদুল হারাম থেকে মসজিদুল আকসা পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়েছেন, যার চারপাশকে আমি বরকতময় করেছি।’ (সুরা আল-ইসরা/বনি ইসরাইল: আয়াত ১)
কুরআন-হাদিসে বর্ণিত ৭টি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা
১. বায়তুল মুকাদ্দাসের আশপাশে সত্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত একটি দল থাকবে
রাসুলুল্লাহ (সা.) সংবাদ দিয়েছেন যে, তার উম্মতের একটি দল সর্বদা সত্যের ওপর অটল থাকবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي ظَاهِرِينَ عَلَى الْحَقِّ
‘আমার উম্মতের একটি দল সবসময় সত্যের পথে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকবে।’
সাহাবিরা জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন—
بِبَيْتِ الْمَقْدِسِ وَأَكْنَافِ بَيْتِ الْمَقْدِسِ
‘তারা বায়তুল মুকাদ্দাস ও তার আশপাশে থাকবে।’ (মুসনাদ আহমাদ ২২৩২০)
২. শাম অঞ্চলে বিশেষ হিজরতের সুসংবাদ
রাসুলুল্লাহ (সা.) শেষ যুগে শাম অঞ্চলে একটি বিশেষ হিজরতের কথা উল্লেখ করেছেন।
فَخِيَارُ أَهْلِ الْأَرْضِ أَلْزَمُهُمْ مُهَاجَرَ إِبْرَاهِيمَ
‘তখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষ হবে তারা, যারা ইবরাহিম (আ.)-এর হিজরতভূমিতে অবস্থান করবে।’ (আবু দাউদ ২৪৮২)
৩. শেষ যুগের মহাসংঘাতের সময় মুসলমানদের একটি অবস্থানস্থল
রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি হাদিসে উল্লেখ করেছেন—
فُسْطَاطُ الْمُسْلِمِينَ يَوْمَ الْمَلْحَمَةِ بِالْغُوطَةِ
‘মহাযুদ্ধের সময় মুসলমানদের অবস্থানস্থল হবে গোতা (দামেস্কের নিকটবর্তী এলাকা)।’ (আবু দাউদ ৪২৯৮)
৪. বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয় কেয়ামতের অন্যতম নিদর্শন
রাসুলুল্লাহ (সা.) কেয়ামতের পূর্ববর্তী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার মধ্যে বায়তুল মুকাদ্দাস বিজয়ের কথাও উল্লেখ করেছেন।’ (বুখারি ৩১৭৬)
৫. শেষ যুগে একটি বড় সংঘাতের বর্ণনা
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত—
لَا تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى تُقَاتِلُوا الْيَهُودَ...
‘কেয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না তোমরা ইহুদিদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে...।’ (মুসলিম ২৯২২)
এই হাদিসে যুদ্ধের নির্দিষ্ট স্থান উল্লেখ নেই। তাই বর্তমান কোনো নির্দিষ্ট ঘটনা বা সংঘাতকে নিশ্চিতভাবে এই হাদিসের বাস্তবায়ন বলে দাবি করা সঠিক নয়। এ বিষয়ে চূড়ান্ত জ্ঞান একমাত্র আল্লাহ তাআলার কাছেই রয়েছে।
৬. ঈসা (আ.)-এর অবতরণ এবং দাজ্জালের পরিণতি
সহিহ হাদিস অনুযায়ী, কেয়ামতের পূর্বে আল্লাহর নবী ঈসা (আ.) পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং দাজ্জালকে পরাজিত করবেন।
فَيُدْرِكُهُ عِنْدَ بَابِ لُدٍّ فَيَقْتُلُهُ
‘তিনি (ঈসা আ.) লুদ নগরের ফটকের কাছে দাজ্জালকে পাকড়াও করে হত্যা করবেন।’ (মুসলিম ২৯৩৭)
৭. বায়তুল মুকাদ্দাসের বিশেষ মর্যাদা
হজরত মায়মুনা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন—
أَرْضُ الْمَحْشَرِ وَالْمَنْشَرِ
‘এটি (বায়তুল মুকাদ্দাস) হাশর ও পুনরুত্থানের ভূমি।’ (মুসনাদ আহমাদ ২৭৬২৬, ইবনে মাজাহ ১৪০৭)
শাম অঞ্চলের জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দোয়া
اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي شَامِنَا، اللَّهُمَّ بَارِكْ لَنَا فِي يَمَنِنَا
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি শামিনা, আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি ইয়ামানিনা।’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদের শাম দেশে বরকত দান করুন। হে আল্লাহ! আমাদের ইয়েমেনে বরকত দান করুন।’ (বুখারি ১০৩৭)
ফিলিস্তিন, বায়তুল মুকাদ্দাস এবং বৃহত্তর শাম অঞ্চল ইসলামের ইতিহাস, ইমানি চেতনা এবং শেষ যুগের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বর্ণনার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পৃক্ত। কুরআন ও সহিহ হাদিস আমাদের এ অঞ্চলের বরকত, মর্যাদা এবং কিছু ভবিষ্যৎ ঘটনার সংবাদ দিয়েছে। তবে এসব বর্ণনার ব্যাখ্যায় অতিরঞ্জন, অনুমান বা চলমান ঘটনাকে নিশ্চিতভাবে হাদিসের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার পরিবর্তে কুরআন-সুন্নাহর সীমার মধ্যে থাকা এবং আল্লাহর ফয়সালার ওপর পূর্ণ আস্থা রাখাই একজন মুমিনের করণীয়।
আল্লাহ তাআলা আমাদের মসজিদুল আকসার মর্যাদা হৃদয়ে ধারণ করার, শাম ও ফিলিস্তিনের শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য দোয়া করার এবং কুরআন-সুন্নাহর বিশুদ্ধ জ্ঞানের ওপর অবিচল থাকার তৌফিক দান করুন। আমিন।
সূত্র: যুগান্তর