নিজের চেহারা সুন্দর, ফুটফুটে সন্তান, অফুরন্ত সম্পদ কিংবা জীবনের কোনো বড় অর্জন দেখে মনে মনে মুগ্ধ হওয়া বা আনন্দ পাওয়া খুবই স্বাভাবিক এক মানবিক অনুভূতি। কিন্তু এই মুগ্ধতার রেশ ধরে মনের কোণে প্রায়ই একটি প্রশ্ন উঁকি দেয়— অন্যের নজর তো লাগতেই পারে, তবে নিজের কোনো নেয়ামত দেখে নিজে মুগ্ধ হলেও কি কোনো ক্ষতি হতে পারে? ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিতে বিষয়টি বেশ চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
বদনজরের বাস্তবতা ও ইসলামি বিধান
নজরের প্রভাব যে সত্য এবং এর বাস্তব অস্তিত্ব রয়েছে, তা ইসলামে দৃঢ়ভাবে স্বীকৃত। মানুষের ক্ষতিকর বা ইর্ষান্বিত দৃষ্টি কখনো কখনো বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (স.) এই বিষয়ে সতর্ক করে বলেছেন—
اسْتَعِيذُوا بِاللَّهِ مِنَ الْعَيْنِ، فَإِنَّ الْعَيْنَ حَقٌّ
‘তোমরা বদনজরের প্রভাব থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করো। কেননা, নজরের প্রভাব সত্য।’ (ইবনে মাজাহ ৩৫০৮)
তবে নিজের কোনো নেয়ামত দেখে নিজে মুগ্ধ হওয়ার বিষয়টিকে সরাসরি ‘নিজের চোখে নিজের ওপর নজর লাগা’ হিসেবে প্রমাণ করার সুযোগ নেই। নিজের ভালো কিছু দেখে আনন্দিত হওয়া বা মুগ্ধ হওয়া দোষের কিছু নয়; বরং তা আল্লাহর এক একটি নিয়ামত।
সাহল ইবনে হুনাইফের (রা.) ঘটনা ও বরকতের শিক্ষা
অন্যের নিয়ামত দেখে মুগ্ধ হওয়ার ক্ষেত্রে ইসলামের শিক্ষা হলো সঙ্গে সঙ্গে বরকতের দোয়া করা। এ প্রসঙ্গে হজরত সাহল ইবনে হুনাইফ (রা.)-এর বিখ্যাত ঘটনাটি অত্যন্ত শিক্ষণীয়। হজরত আমের ইবনে রবীআ (রা.) এক দিন সাহল (রা.)-কে গোসল করতে দেখে তার চমৎকার রূপ দেখে মুগ্ধ হন, যার ফলে সাহল (রা.) হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষয়টি যখন নবীজি (স.)-এর দরবারে পৌঁছাল, তখন তিনি এর সমাধান জানিয়ে বলেন—
عَلَامَ يَقْتُلُ أَحَدُكُمْ أَخَاهُ؟ هَلَّا إِذَا رَأَيْتَ مَا يُعْجِبُكَ بَرَّكْتَ؟
‘তোমাদের কেউ তার ভাইয়ের মনোমুগ্ধকর কিছু দেখলে কেন তার জন্য বরকতের দোয়া করে না?’ (ইবনে মাজাহ ৩৫০৮)
নবীজি (স.) আমের (রা.)-কে অজু করার নির্দেশ দেন এবং সেই পানি সাহল (রা.)-এর গায়ে ঢেলে দেওয়ার পর তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন। এই ঘটনা থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, নিজের বা অন্যের যেকোনো সুন্দর জিনিস দেখে মুগ্ধ হলে তৎক্ষণাৎ তার জন্য বরকত কামনা করা উচিত। নিজের জন্য দোয়া করার চমৎকার একটি বাক্য হলো—
اَللهُمَّ بَارِكْ لِىْ فِيْهِ
উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা বারিক লি ফিহি’
অর্থ: ‘হে আল্লাহ, এতে আমার জন্য বরকত দিন।’
নজর লাগলে বা সমস্যা দেখা দিলে করণীয়
জীবনের প্রতিটি অসুস্থতা, দুর্ঘটনা বা বিপদকে সবসময় নজরের ফল বলে অন্ধের মতো ধরে নেওয়া ইসলামের শিক্ষা নয়। কোনো বাস্তব বা দুনিয়াবি সমস্যা দেখা দিলে তার চিকিৎসা বা শারীরিক কারণও খুঁজে দেখতে হবে। তবে যদি সত্যিই নজরের আশঙ্কা থাকে, তবে তাবিজ-কবজ বা কুসংস্কারের পথ না ধরে শরিয়তসম্মত রুকইয়ার আশ্রয় নেওয়া উচিত। হজরত জিবরিল (আ.) নবীজি (সা.)-এর সুস্থতার জন্য যে বিশেষ দোয়াটি পড়ে ফুঁ দিয়েছিলেন, তা অত্যন্ত কার্যকর—
بِاسْمِ اللَّهِ أَرْقِيكَ، مِنْ كُلِّ شَيْءٍ يُؤْذِيكَ، مِنْ شَرِّ كُلِّ نَفْسٍ أَوْ عَيْنِ حَاسِدٍ، اللَّهُ يَشْفِيكَ
উচ্চারণ: ‘বিসমিল্লাহি আরক্বিকা, মিন কুল্লি শাইয়িন ইউ’জিকা, মিন শাররি কুল্লি নাফসিন আও আইনি হাসাদিন, আল্লাহু ইয়াশফিকা।’
অর্থ: ‘আল্লাহর নামে তোমার জন্য রুকইয়া করছি— যা কিছু তোমাকে কষ্ট দেয়, প্রত্যেক প্রাণীর অনিষ্ট এবং হিংসুকের নজরের অনিষ্ট থেকে। আল্লাহ তোমাকে শিফা দিন।’ (মুসলিম ২১৮৬)
নিজের সৌন্দর্য, সম্পদ বা সফলতা দেখে আনন্দিত হওয়া মানব স্বভাবের অংশ, এতে কোনো পাপ নেই। তবে এই প্রতিটি নিয়ামতের আসল মালিক যে মহান আল্লাহ— এই অনুভূতি সব সময় হৃদয়ে পোষণ করা জরুরি। নিজের বা অন্যের যেকোনো ভালো দিক দেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা, বরকতের দোয়া করা এবং যাবতীয় সংকটে কুসংস্কার এড়িয়ে কেবল আল্লাহর ওপর ভরসা রাখাই একজন মুমিনের প্রকৃত সৌন্দর্য।