ইসলামি শরিয়ত সামাজিক জীবনের প্রতিটি সম্পর্ককে সুনির্দিষ্ট অধিকার ও দায়িত্বের ফ্রেমে বেঁধে দিয়েছে। স্বামী-স্ত্রী সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম ঘটেনি। বিশেষ করে দাম্পত্য জীবনে নারীর আর্থিক অধিকার সুরক্ষায় ইসলাম যে নীতিমালা নির্ধারণ করেছে, তা অত্যন্ত সুসংহত ও স্পষ্ট।
সাধারণ নিয়মে পরিবারে নারীর প্রধান ভূমিকা থাকে গৃহস্থালি ও সন্তান প্রতিপালনে। জীবনযাপনের এই স্বাভাবিক বিভাজনে নারীর ওপর সংসারের কোনো আর্থিক বোঝা চাপানো হয়নি। অথচ জীবনধারণের জন্য অর্থ অপরিহার্য। তাই ইসলাম স্বামীর অর্জিত ও বিদ্যমান সম্পদের ওপর স্ত্রীর বেশ কিছু সুস্পষ্ট আর্থিক অধিকার নির্ধারণ করে দিয়েছে।
১. খোরপোশ বা ভরণপোষণ: প্রাত্যহিক মৌলিক অধিকার: স্বামীর কাছে স্ত্রীর সবচেয়ে মৌলিক ও তাৎক্ষণিক আর্থিক অধিকার হলো 'ভরণপোষণ' (খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা)। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, “বিত্তবান নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী ব্যয় করবে” (সূরা তালাক: ৭)।
স্ত্রী ধনী হন কিংবা তাঁর নিজস্ব কোনো আয় থাকুক না কেন, স্ত্রীর সার্বিক খোরপোশ বহন করা শরয়ী বিধান অনুযায়ী স্বামীর ওপর আবশ্যক (ওয়াজিব)। এমনকি বিবাহবিচ্ছেদ ঘটলে 'ইদ্দত' পালনের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত স্ত্রী এই খোরপোশ পাওয়ার পূর্ণ অধিকারী।
২. দেনমোহর: নারীর সুনির্দিষ্ট ও নগদ পাওনা: দেনমোহর হলো এমন এক আর্থিক অধিকার, যা বিবাহের চুক্তির মাধ্যমেই স্বামীর ওপর অবশ্যই পরিশোধযোগ্য হয়ে যায়। পবিত্র কুরআনে নির্দেশ এসেছে— “আর তোমরা নারীদেরকে মনতুষ্টির সাথে তাদের মোহর দিয়ে দাও” (সূরা নিসা: ৪)। প্রখ্যাত মুফাসসির ইমাম কুরতুবী (র.) উল্লেখ করেছেন, নারীর দেনমোহর পরিশোধ ওয়াজিব হওয়ার বিষয়ে ইসলামি গবেষকদের মধ্যে কোনো দ্বিমত নেই।
দেনমোহরের অর্থ সম্পূর্ণ নগদ, পুরোটাই বাকিতে অথবা কিছু নগদ ও বাকি অংশ পরে পরিশোধের শর্তে নির্ধারিত হতে পারে। তবে তালাক কিংবা স্বামীর মৃত্যু—যেটিই আগে ঘটুক না কেন, স্ত্রী তাঁর দেনমোহর পাওয়ার পূর্ণ অধিকার রাখেন। এমনকি স্বামীর মৃত্যুর পর তাঁর রেখে যাওয়া সম্পত্তি (মিরাস) বন্টনের আগেই এই বকেয়া দেনমোহর শোধ করা শরিয়তের বাধ্যবাধকতা।
উলেখ্য, আমাদের সামাজিক প্রেক্ষাপটে অনেকেই দেনমোহরকে কেবল তালাকের সময় দেওয়ার বিষয় মনে করেন, যা একটি মারাত্মক ভুল ধারণা। নগদ নির্ধারিত দেনমোহর স্ত্রী চাওয়ামাত্র পরিশোধ করা স্বামীর আইনি ও শরয়ী দায়িত্ব।
৩. উত্তরাধিকার বা মিরাসে সুনির্দিষ্ট অংশ: স্বামীর ত্যাজ্য সম্পদে স্ত্রীর উত্তরাধিকারের অধিকার কুরআনের স্পষ্ট বিধান দ্বারা নির্ধারিত। সূরা নিসার ১২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
সন্তান না থাকলে: স্বামীর যদি কোনো সন্তান (বর্তমান বা পূর্বের স্ত্রীর ঘরে) না থাকে, তবে স্ত্রী মোট সম্পত্তির এক-চতুর্থাংশ (১/৪) বা চার ভাগের এক ভাগ পাবেন।
সন্তান থাকলে: স্বামীর সন্তান থাকলে স্ত্রী মোট সম্পত্তির এক-অষ্টমাংশ (১/৮) বা আট ভাগের এক ভাগ পাবেন।
৪. উপহার ও গহনা কার সম্পত্তি?: বিবাহের পূর্বপ্রস্তুতি বা বাগদানের সময় পুরুষ যদি নারীকে সোনার গহনা বা অন্যান্য জিনিস উপহার দেয়, সেটির সিদ্ধান্ত সামাজিক প্রথা ও চুক্তির ওপর ভিত্তি করে হয়। তবে মূল বিবাহ বা 'আকদ' সম্পন্ন হওয়ার পর স্ত্রীকে প্রদত্ত যেকোনো উপহার, অলঙ্কার বা সম্পদের ওপর কেবল স্ত্রীরই পূর্ণ একক মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীতে বিবাহবিচ্ছেদ হলেও স্বামী বা তাঁর পরিবার সেই উপহার ফেরত চাইতে পারেন না।
৫. গৃহস্থালি কাজের মূল্যায়ন: সংসারের দৈনন্দিন কাজকর্ম করার জন্য স্ত্রী কোনো পারিশ্রমিক বা ভাতা পাওয়ার যোগ্য কি না—এ বিষয়ে ফকীহদের মধ্যে দুটি প্রধান অভিমত রয়েছে:
এক পক্ষের মতে (শাফেয়ী ও হাম্বলী মাযহাব): গৃহস্থালির কাজ করা স্ত্রীর জন্য আইনি বাধ্যবাধকতা নয়। ফলে তিনি চাইলে কাজের জন্য পারিশ্রমিক দাবি করতে পারেন। তবে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংসারের কাজ করাই উত্তম।
অপর পক্ষের মতে (হানাফী ও মালেকী মাযহাব): নীতিগত ও নৈতিকভাবে সাংসারিক কাজ করা স্ত্রীর দায়িত্ব। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর কন্যা হযরত ফাতিমা (রা.) ও হযরত আলী (রা.)-এর মধ্যে ঘরের ভেতর ও বাইরের দায়িত্ব ভাগ করে দিয়েছিলেন।
তবে আধুনিক ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, নারী চাকরি না করলেও দিনরাত সংসারের যে অনানুষ্ঠানিক শ্রম দেন, স্বামীর সফলতায় তাঁর সেই অবদানের নৈতিক ও সামাজিক মূল্যায়ন থাকা উচিত।
৬. যৌথ উপার্জন ও হযরত উমর (রা.)-এর ঐতিহাসিক রায়: বর্তমান যুগে অনেক নারী চাকরি বা ব্যবসার মাধ্যমে আয় করেন এবং সেই অর্থ সংসারের প্রয়োজনে স্বামীর অর্থের সঙ্গে মিলিয়ে খরচ বা বিনিয়োগ করেন। এই ক্ষেত্রে ইসলামি শরিয়তের দৃষ্টিভঙ্গি অত্যন্ত ন্যায়ভিত্তিক:
আলাদা উপার্জনের স্বাধীনতা: নারী যদি নিজের উপার্জিত অর্থ সম্পূর্ণ আলাদা রাখেন, তবে তাতে স্বামীর বিন্দুমাত্র অধিকার থাকবে না। কারণ ইসলামে নারীর স্বাধীন আর্থিক সত্তা স্বীকৃত। একইভাবে স্ত্রীর পৈতৃক সম্পত্তি (বাপের বাড়ির মিরাস) বা নিজস্ব আয়ে স্বামী জোরপূর্বক হস্তক্ষেপ করতে পারেন না।
যৌথ উপার্জনে অর্জিত সম্পদ (কাদ ও সিআয়াহ): স্ত্রী যদি নিজের অর্থ বা কায়িক শ্রম স্বামীর ব্যবসা বা সম্পদ অর্জনে যৌথভাবে বিনিয়োগ করেন, তবে তিনি সেই সম্পদের আংশিক মালিক হবেন।
পূর্বচুক্তি থাকলে: চুক্তি অনুযায়ী সম্পদ বন্টন হবে।
চুক্তি না থাকলে: স্ত্রী যে পরিমাণ অর্থ বা শ্রম দিয়েছেন, সেই অনুপাতে তিনি ওই সম্পত্তির স্বত্ব দাবি করতে পারবেন। বিবাহবিচ্ছেদ কিংবা মৃত্যুর ক্ষেত্রে মূল মিরাস বন্টনের আগেই স্ত্রীর এই পাওনা শোধ করতে হবে।
ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত: ইসলামের দ্বিতীয় খলীফা হযরত উমর (রা.)-এর আমলের এক ঐতিহাসিক ফায়সালা এই নীতির বড় দলিল। আমির বিন হারিস ও তাঁর স্ত্রী হাবীবা একসঙ্গে কাজ করতেন (স্ত্রী কাপড়ে নকশা করতেন, স্বামী তা বিক্রি করতেন)। এতে তাঁরা প্রচুর সম্পদ অর্জন করেন। আমিরের মৃত্যুর পর ওয়ারিশরা সব সম্পত্তি দখল করতে চাইলে খলীফা উমর (রা.) স্ত্রীর শারীরিক শ্রম ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ মোট সম্পদের অর্ধেক অংশ সরাসরি স্ত্রীকে দেন এবং বাকি অর্ধেক থেকে স্ত্রী হিসেবে তাঁর মিরাসের অংশ (এক-চতুর্থাংশ) প্রদান করেন।
সারসংক্ষেপ: বিবাহের মাধ্যমে নারীর নিজস্ব আর্থিক সত্তা বিলুপ্ত হয়ে যায় না। ইসলাম একদিকে যেমন পরিবার পরিচালনার সব খরচ বহনের দায়িত্ব পুরুষকে দিয়েছে, অন্যদিকে নারীর উপার্জিত অর্থ বা সম্পত্তিকে সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব অধিকার হিসেবে সুরক্ষা দিয়েছে। যৌথভাবে সংসার পরিচালনা করার ক্ষেত্রে শ্রম ও অর্থের বিনিময়ে অর্জিত সম্পদে নারীর ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত করাই ইসলামি শরিয়তের মূল বার্তা।