বিপদ-আপদ, কঠিন রোগ কিংবা ভয়াবহ দুর্ঘটনা থেকে অলৌকিকভাবে রক্ষা পেলে আমাদের সমাজে অনেকেই বলেন, ‘জানের বদলে জান’ সদকা দিতে হবে। কেউ একটি ছাগল, কেউ গরু, আবার কেউ মুরগি জবাই করে গরিবদের মাঝে বিতরণ করেন। অনেকেই এটিকে মানত হিসেবেও করে থাকেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো— ইসলামে কি ‘জানের বদলে জান’ সদকা বা মানতের কোনো ভিত্তি আছে? এটি কি শরিয়তসম্মত? কুরআন ও হাদিস এ বিষয়ে কী শিক্ষা দেয়?
‘জানের বদলে জান’ মানত করা কি জায়েজ?
কোনো ব্যক্তি যদি কঠিন রোগ, বড় ধরনের দুর্ঘটনা বা অন্য কোনো বিপদ থেকে মুক্তির আশায় ‘জানের বদলে জান’ হিসেবে একটি পশু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দান বা কুরবানি করার মানত করেন, তবে তা শরিয়তে নিষিদ্ধ নয়। তবে একবার মানত করে ফেললে তা পূরণ করা ওয়াজিব হয়ে যায়।
এ প্রসঙ্গে মহান আল্লাহ তাআলা হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর পরীক্ষার ঘটনা উল্লেখ করে বলেন—
وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ
‘আর আমি তার (ইসমাইল আ.)-এর পরিবর্তে জবাই করার জন্য এক মহান কুরবানির ব্যবস্থা করে দিলাম।’ (সুরা আস-সাফফাত: আয়াত ১০৭)
বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) থেকেও এ ধরনের মানত পূরণের ফতোয়ার বর্ণনা পাওয়া যায়।
অতএব, কেউ যদি এমন মানত করে থাকেন, তাহলে কোরবানির উপযুক্ত একটি পূর্ণাঙ্গ পশু—যেমন ছাগল, খাসি বা গরু—আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে জবাই করে তার গোশত গরিব-মিসকিন বা মাদরাসার লিল্লাহ বোর্ডিংয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে মানত পূরণ করবেন।
তবে মানতের চেয়ে ইসলাম সদকাকে বেশি উৎসাহিত করে
যদিও এ ধরনের মানত করা বৈধ, তবুও ইসলাম মানুষকে মানত করতে উৎসাহিত করে না। কারণ, অনেক সময় মানুষ ‘কাজ হলে দান করব, না হলে করব না’—এমন শর্তসাপেক্ষ মানসিকতা গ্রহণ করে, যা ইসলামের কাম্য নয়।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ النَّذْرَ لَا يَرُدُّ شَيْئًا، وَإِنَّمَا يُسْتَخْرَجُ بِهِ مِنَ الْبَخِيلِ
‘মানত আল্লাহর নির্ধারিত কোনো বিষয় পরিবর্তন করতে পারে না। বরং এর মাধ্যমে কেবল কৃপণ ব্যক্তির কাছ থেকে সম্পদ বের করা হয়।’ (মুসলিম ১৬৩৯)
অর্থাৎ, মানতের ওপর নির্ভর না করে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিয়মিত নফল সদকা করাই উত্তম।
বিপদ-আপদ দূর করতে সদকার গুরুত্ব
কঠিন রোগ, বিপদ-আপদ কিংবা দুর্যোগ থেকে মুক্তির আশায় আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গরিবদের মাঝে অর্থ, খাদ্য বা পশুর গোশত দান করা ইসলামে একটি প্রশংসনীয় আমল। রাসুলুল্লাহ (সা.) ইরশাদ করেছেন—
بَادِرُوا بِالصَّدَقَةِ، فَإِنَّ الْبَلَاءَ لَا يَتَخَطَّى الصَّدَقَةَ
‘তোমরা দ্রুত সদকা করো; কেননা বিপদ-আপদ সদকাকে অতিক্রম করতে পারে না।’ (বাইহাকি ৩০৮২)
আরও একটি হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন—
إِنَّ الصَّدَقَةَ تُطْفِئُ غَضَبَ الرَّبِّ وَتَدْفَعُ مِيتَةَ السُّوءِ
‘নিশ্চয়ই সদকা আল্লাহর ক্রোধ প্রশমিত করে এবং অকল্যাণকর মৃত্যু থেকে রক্ষা করে।’ (তিরমিজি ৬৬৪)
সদকা সম্পর্কে কুরআনের সুসংবাদ
মহান আল্লাহ বলেন—
مَّثَلُ الَّذِينَ يُنفِقُونَ أَمْوَالَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ كَمَثَلِ حَبَّةٍ أَنبَتَتْ سَبْعَ سَنَابِلَ فِي كُلِّ سُنبُلَةٍ مِّائَةُ حَبَّةٍ ۗ وَاللَّهُ يُضَاعِفُ لِمَن يَشَاءُ
‘যারা আল্লাহর পথে নিজেদের সম্পদ ব্যয় করে, তাদের উদাহরণ একটি বীজের মতো, যা থেকে সাতটি শীষ জন্মায় এবং প্রতিটি শীষে থাকে একশটি দানা। আর আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আরও বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেন।’ (সুরা আল-বাকারা: আয়াত ২৬১)
‘জানের বদলে জান’— এ বিষয়ে সঠিক আকিদা কী হওয়া উচিত?
এ কথা মনে রাখা জরুরি যে, ‘জানের বদলে জান’ সদকা করলে নিশ্চিতভাবে জীবন রক্ষা পাবে, আয়ু বেড়ে যাবে বা অলৌকিকভাবে সব বিপদ দূর হয়ে যাবে— এমন কোনো নির্দিষ্ট ঘোষণা কুরআন বা সহিহ হাদিসে নেই।
তবে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আন্তরিকভাবে দান-সদকা করা নিঃসন্দেহে একটি বরকতময় ইবাদত। আল্লাহ চাইলে সেই সদকার বরকতে রোগব্যাধি দূর করতে পারেন, বিপদ থেকে হেফাজত করতে পারেন এবং বান্দার জন্য কল্যাণের দরজা খুলে দিতে পারেন। কিন্তু এসবই আল্লাহর ইচ্ছা ও ফয়সালার ওপর নির্ভরশীল।
ইসলাম আমাদের শেখায়, বিপদের সময় আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রাখতে, বেশি বেশি দোয়া করতে এবং আন্তরিকভাবে সদকা করতে। যদি কেউ ‘জানের বদলে জান’ বলে মানত করে ফেলেন, তবে শরিয়তের বিধান অনুযায়ী তা পূরণ করবেন। তবে একজন মুমিনের জন্য উত্তম হলো— কোনো শর্ত ছাড়াই আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে নিয়মিত দান-সদকা করা।
আসুন, আমরা কুসংস্কার বা অতিরঞ্জিত বিশ্বাস থেকে দূরে থেকে কুরআন ও সহিহ সুন্নাহর আলোকে আমল করি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে বিশুদ্ধ আকিদা, কবুল হওয়া সদকা এবং বিপদ-আপদে তার ওপর অটল ভরসা করার তৌফিক দান করুন। আমিন।