শিরোনাম
◈ ‘ভয়াবহ দুর্নীতি’ আদানি চুক্তিতে: বাতিলের জন্য যেতে হবে আন্তর্জাতিক আদালতে ◈ সিডনিকে সিক্সার্সকে হা‌রি‌য়ে বিগ ব্যাশে রেকর্ড ষষ্ঠ শিরোপা জয় কর‌লো স্করচার্স ◈ দেশের মানুষের জন্যই বিএনপির রাজনীতি: তারেক রহমান ◈ ভারত থেকে ৮ ট্রাকে ১২৫ মেট্রিক টন বিস্ফোরক প্রবেশ করল দেশে ◈ চীনের অনুদানে যে কারণে নীলফামারীতে হবে ১০ তলা হাসপাতাল, আরও যা যা থাকছে ◈ কোথায় রাখা হবে পোস্টাল ব্যালট, গণনা কোন পদ্ধতিতে ◈ আই‌সি‌সি এমন কে‌নো, কী কার‌ণে বাংলাদেশ ভারতের বাইরে খেলতে পারবে না— প্রশ্ন অ‌স্ট্রেলিয়ান গিলেস্পির  ◈ বিশ্বকাপ বয়কট আলোচনার মধ্যে দল ঘোষণা করলো পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড ◈ কোনো দল বা গোষ্ঠী কাউকে সিট দেওয়ার মালিক নয় : মির্জা আব্বাস  ◈ বড় দলগুলোর হেভিওয়েট নেতাদের ভূমিধস পতন হবে: সারজিস আলম

প্রকাশিত : ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৭:৪৭ বিকাল
আপডেট : ২৫ জানুয়ারী, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

নারীরা কি নামাজের জন্য মসজিদে যেতে পারবেন?

আজকের মুসলিম সমাজে একটি কথা প্রায় অনায়াসেই উচ্চারিত হয় “নারীরা মসজিদে গেলে ফিতনা হবে।” আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বক্তব্যকে অনেক সময় এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যেন এটি ইসলামের মৌলিক কোনো নির্দেশ। 

অথচ প্রশ্ন করলে দেখা যায়, খুব কম মানুষই বলতে পারেন—এই ধারণা কুরআনের কোথায় বলা হয়েছে, কোন সহিহ হাদিসে একে নিষেধ করা হয়েছে, কিংবা নববি যুগে কখন নারীদের মসজিদে যাওয়া ফিতনা হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। 

বাস্তবতা হলো—নববি যুগে নারীদের মসজিদে যাওয়া ছিল স্বাভাবিক ও নিয়মিত চর্চা। রাসুলুল্লাহ সা. এর মসজিদে নারীরা জামাতে অংশ নিয়েছেন, ফজর ও ইশার নামাজে উপস্থিত থেকেছেন, জুমার খুতবা শুনেছেন, এমনকি ধর্মীয় প্রশ্নও করেছেন। 

রাসুল সা. স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছিলেন, “তোমরা আল্লাহর বান্দীদের (নারীদের)—মসজিদে যেতে বাধা দিও না।” (সহিহ বুখারি ৯০০, সহিহ মুসলিম ৪৪২) 

এই নির্দেশ ছিল সাধারণ ও শর্তহীন

তবে ইতিহাসের এক পর্যায়ে এসে বাস্তবতা বদলাতে শুরু করে। রাসুল সা. এর ওফাতের পর মুসলিম সমাজ ভৌগোলিকভাবে বিস্তৃত হয়, নগরায়ণ বাড়ে, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সামাজিক অবক্ষয়ের কিছু উপসর্গ দেখা দেয়। 

বিশেষ করে উমাইয়া ও পরবর্তী যুগে শহুরে জীবনে শালীনতা রক্ষার বাস্তব সংকট তৈরি হয়। তখন কিছু সাহাবি ও তাবেঈন বাস্তব পরিস্থিতির বিবেচনায় নারীদের মসজিদে যাওয়া নিরুৎসাহিত করতে থাকেন—কিন্তু এটিকে কখনোই শরিয়তের স্থায়ী বিধান হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি। 

হযরত আয়েশা রা. এর একটি উক্তি প্রায়ই উদ্ধৃত করা হয়, তিনি বলেছিলেন, “আজকের নারীদের আচরণ যদি রাসুলুল্লাহ সা. দেখতেন, তবে তিনি হয়তো তাদের মসজিদে যেতে নিষেধ করতেন।” 

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এটি একটি সামাজিক পর্যবেক্ষণ, কোনো ফতোয়া বা নববি নির্দেশ নয়। অথচ পরবর্তীকালে এই বক্তব্যকে প্রেক্ষাপট থেকে বিচ্ছিন্ন করে এমনভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যেন এটি চূড়ান্ত শরিয়তী বিধান। 

এরপর মধ্যযুগে মুসলিম সমাজে স্থানীয় সংস্কৃতি, পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামো এবং নিরাপত্তাহীনতার বাস্তবতা একে আরও জোরালো করে তোলে। ধীরে ধীরে “ফিতনা” শব্দটি নারীর উপস্থিতির সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হয়—যেখানে ফিতনা আসলে মানুষের দৃষ্টি, আচরণ ও নিয়ন্ত্রণহীন প্রবৃত্তির ফল হলেও দায় চাপানো হয় নারীর ওপর। 

ফলে মসজিদ—যা হওয়া উচিত ছিল সবচেয়ে পবিত্র ও নিরাপদ স্থান—সেখান থেকেই নারীকে সরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা গড়ে ওঠে। 

এই ধারণার সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—একই সমাজে নারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যায়, কর্মক্ষেত্রে যায়, আদালতে যায়, বাজারে যায়, এমনকি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করে। কিন্তু কেবল মসজিদে প্রবেশ করলেই তাকে ‘ফিতনা’র উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। 

প্রশ্ন জাগে—যদি নারী সর্বত্র যেতে পারে, তবে আল্লাহর ঘরেই কেন সে সবচেয়ে বেশি সন্দেহের মুখে পড়বে? 

ইসলাম ফিতনার দায় কখনো স্থানের ওপর দেয়নি। কুরআন প্রথমে পুরুষকে নির্দেশ দিয়েছে দৃষ্টি সংযত করতে। অথচ বাস্তবে দেখা যায়, আত্মসংযমের শিক্ষা না দিয়ে সহজ সমাধান হিসেবে নারীর ওপর নিষেধাজ্ঞা চাপানো হয়। এটি ধর্মের ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গি নয়, এটি ধর্মের সামাজিক ব্যাখ্যার বিকৃতি। 

নিশ্চয়ই ইসলাম শালীনতা চায়, পর্দা চায়, শিষ্টাচার চায়। কিন্তু এগুলো নারী ও পুরুষ—উভয়ের জন্য। নববি মসজিদে নারীদের জন্য আলাদা কাতার ও প্রবেশপথ ছিল—এটি বর্জনের নয়, বরং মর্যাদাপূর্ণ অংশগ্রহণের প্রমাণ। 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, যেখানে ব্যবস্থাপনা ও আদব ছিল, সেখানে ‘ফিতনা’ হয়নি। 

নারীকে মসজিদ থেকে দূরে সরিয়ে রেখে সমাজ কখনো ধার্মিক হয়নি। বরং এতে নারীর ধর্মীয় সংযোগ দুর্বল হয়েছে, ইবাদতের সামাজিক চর্চা সংকুচিত হয়েছে এবং ধর্ম ধীরে ধীরে পুরুষকেন্দ্রিক পরিসরে আবদ্ধ হয়েছে। এটি ইসলামের উদ্দেশ্য নয়। 

প্রশ্নটা তাই নারী মসজিদে যাবে কি না—তা নয়। প্রশ্ন হলো, আমরা কি ধর্মকে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে বুঝতে চাই, নাকি ইতিহাসের ভয়, সামাজিক ব্যর্থতা ও আত্মসংযমের অভাবকে ‘ফিতনা’ শব্দের আড়ালে ঢেকে রাখতে চাই? 

মসজিদ আল্লাহর ঘর। সেখানে নারীর উপস্থিতি ফিতনা নয়, বরং ধর্মের নামে যে অযৌক্তিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়—সেটিই আজ মুসলিম সমাজের জন্য বড় ফিতনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

লেখক: শিক্ষার্থী, আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়,কায়রো, মিশর

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়