নির্বাচনি প্রচারণায় রিপাবলিকান শিবির ও সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলীয় নেতাদের পক্ষ থেকে নাম নিয়ে ব্যঙ্গ, পরিকল্পিত ইসলামবিদ্বেষী প্রচারণা এবং নানা হুমকির পরও যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক নির্বাচনে ইতিহাস গড়েছেন মুসলিম প্রার্থীরা। মার্কিন সিনেট, প্রতিনিধি পরিষদ, অঙ্গরাজ্য আইনসভা থেকে শুরু করে স্কুল বোর্ড—সব স্তরেই রেকর্ডসংখ্যক মুসলিম প্রার্থীর এই বড় বিজয় দেশটির রাজনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
মুসলিম নাগরিক অধিকারবিষয়ক সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস (সিএআইআর)-এর হিসাব অনুযায়ী, এবারের নির্বাচনে বিভিন্ন স্তরে মোট ১৬৮ জন মুসলিম প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তাদের মধ্যে অন্তত ৯৭ জন প্রার্থী বিজয়ী হয়েছেন।
এই সাফল্যের তালিকায় সবচেয়ে বড় চমক হিসেবে এসেছে মিশিগান অঙ্গরাজ্য থেকে ড. আবদুল আল-সাইয়েদের বিজয়, যিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম সিনেটর হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন। এছাড়া প্রতিনিধি পরিষদে (হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভস) নির্বাচিত হয়েছেন ছয়জন মুসলিম সদস্য। এর মধ্যে ইলহান ওমর, রাশিদা তালিব, আন্দ্রে কারসন ও লতিফা সাইমন পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন এবং নতুন মুখ হিসেবে জয় পেয়েছেন আদম হামাউই ও দারিয়া লিজা আভিলা সেভালিয়া। এর বাইরে অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ৩৯ জন, পৌরসভা ও কাউন্টিতে ১৬ জন, স্কুল বোর্ডে ২৭ জন এবং বিচারক পদে ৮ জন মুসলিম প্রার্থী জয়লাভ করেছেন।
যে কারণে এই ঐতিহাসিক সাফল্য
বিশ্লেষক ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মতে, প্রতিকূল পরিবেশ ও ইসলামবিদ্বেষের মধ্যেও মুসলিম প্রার্থীদের এমন নজরকাড়া সাফল্যের পেছনে মূলত চারটি বড় নিয়ামক কাজ করেছে:
১. মুসলিম ভোটারদের নজিরবিহীন সক্রিয়তা:
যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার মাত্র প্রায় এক শতাংশ মুসলিম হলেও রাজনীতিতে তাদের সম্পৃক্ততা ও ভোটার নিবন্ধন গত এক বছরে প্রায় ২৫ শতাংশ বেড়েছে। জর্জিয়াসহ গুরুত্বপূর্ণ সুইং স্টেটগুলোতে বিপুলসংখ্যক মুসলিম আগাম ভোট (Early Voting) দিয়ে নিজেদের প্রভাব জানান দিয়েছেন।
২. গাজা যুদ্ধ ও পররাষ্ট্রনীতিতে ক্ষোভ:
সিএআইআর-এর জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ৮০ শতাংশ মুসলিম ভোটার জানিয়েছেন যে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান ও ফিলিস্তিন সংকট তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সিদ্ধান্তে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলেছে। নীতিগত পরিবর্তনের দাবিতে মুসলিমরা দলবদ্ধভাবে ব্যালট বাক্সে এর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন।
৩. ইসলামবিদ্বেষের বিপরীতে প্রতিরোধ:
নির্বাচনের আগে প্রার্থীদের নাম নিয়ে ট্রাম্পের কটাক্ষ, মসজিদে হামলার মতো ঘটনা এবং রিপাবলিকানদের সংগঠিত মুসলিমবিরোধী প্রচারণা ভীতি ছড়ানোর বদলে মুসলিম সমাজকে আরো বেশি ভোটমুখী করেছে। জরিপে অংশ নেওয়া প্রায় ৭০ শতাংশ ভোটার বলেছেন, ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষই তাদের ভোটকেন্দ্রে যেতে উৎসাহিত করেছে।
৪. ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আন্তরিকতার প্রকাশ:
অতীতে ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা নিজেদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশে ইতস্তত করলেও এবার মুসলিম প্রার্থীরা নিজেদের বিশ্বাস ও মানবিক মূল্যবোধকে আড়াল না করে সরাসরি জনসেবার দর্শনের সঙ্গে যুক্ত করেছেন। ভোটারদের সামনে তাদের এই সততা ও আন্তরিকতা সাধারণ অমুসলিম নাগরিকদেরও বিপুল সমর্থন পেতে সাহায্য করেছে।
সূত্র : আমার দেশ