শিরোনাম
◈ জাপানে তারেক রহমানের চার দিনের সরকারি সফর : বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে নতুন সম্ভাবনা, অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে জোরদার ◈ প‌্যা‌রি‌সে বিক্ষোভের উত্তাপ, সোমবার রাতে পিএসজির ম্যাচ ◈ ইসলামবিদ্বেষের ছায়ায় ইউরোপ, কতটা নিরাপদ মুসলিমরা? : আল-জাজিরার বিশ্লেষণ ◈ বাস-ট্রেনে হেডফোন ছাড়া গান শুনলে ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করলে কোন দেশে কত জরিমানা? ◈ প্রধানমন্ত্রীর জাপান সফরের আগে রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় রাখার সিদ্ধান্ত পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের: শামা ওবায়েদ ◈ বলপ্রয়োগ করলে ফ্যাসিবাদী, না করলে দুর্বল ভাবে মানুষ: আইজিপি ◈ মাদরাসায় বলাৎকার: কঠোর সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে সরকার ◈ কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে ১০০ কোটি ডলারের নয়, ১০ কোটি ডলারে ক্যান কারখানা গড়ছে চীনা প্রতিষ্ঠান ◈ গাজীপুরে সুপ্রিম গার্মেন্টসের কার্টন গুদামে আগুন, নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের ৮ ইউনিট ◈ যে কারণে বাতিল হতে পারে মার্কিন ভিসা, জানাল দূতাবাস

প্রকাশিত : ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:০০ রাত
আপডেট : ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ০৮:০৮ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

‘বাংলাদেশি’ প্রপাগান্ডার নেপথ্যের রহস্য ফাঁস, আইএমএফের তথ্যে প্রশ্নের মুখে মোদি-অমিত শাহ

ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থাকে রাজনৈতিক অস্ত্র বানিয়ে কোটি কোটি বৈধ নাগরিকের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এক ভয়ঙ্কর চক্রান্তে মেতেছে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। অবৈধ ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তাড়ানোর চটকদার ও বিভেদকামী স্লোগান তুলে পুরো দেশকে এক চরম নৈরাজ্যের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সম্প্রতি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) অর্থনৈতিক তথ্য এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতা উগ্র হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপির এই ‘বড় মিথ্যা’ ও ফাঁকা প্রপাগান্ডার থলের বিড়াল সম্পূর্ণ উন্মোচিত করে দিয়েছে।

ভারতীয় বিশ্লেষণাত্মক সংবাদমাধ্যম স্ক্রল ডট ইন-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে দেখা যায়, বিজেপির এই সাজানো নাটক কেবল তাদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি এবং ভারতের মুসলিম নাগরিকদের ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী নীলক নকশা ছাড়া আর কিছুই নয়।

ভারতের ভোটার তালিকা পর্যালোচনার নামে গৃহীত তথাকথিত ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ (এসআইআর) বা বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে এখন পুরো ভারতজুড়ে আগুন জ্বলছে। গত সপ্তাহে রাজধানী দিল্লি উত্তাল হয়ে ওঠে রাজপথের অভূতপূর্ব গণবিক্ষোভে। বিজেপি সরকার এই আন্দোলন দমনে পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনীকে লেলিয়ে দিয়ে দিল্লির বড় অংশকে কার্যত অবরুদ্ধ সামরিক জোনে পরিণত করে। হাজার হাজার প্রতিবাদকারী নাগরিক এবং বহু সাংবাদিককে গ্রেপ্তার ও আটক করা হয়।

কিন্তু কেন এই চণ্ডনীতি? কারণ, এই এসআইআর প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ভোটার তালিকার খসড়া থেকে এক ধাক্কায় কল্পনাতীত ১৩ কোটি ভোটারের নাম ছেঁটে ফেলা হয়েছে! পরিসংখ্যান ও তথ্য বিশ্লেষণ করে স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, এই বিশাল বাদ পড়া গোষ্ঠীর বড় অংশই ভারতের সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়, যারা প্রচলিতভাবে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী ও সাম্প্রদায়িক রাজনীতির কঠোর বিরোধী। এমনকি পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ঐতিহাসিক রাজনৈতিক সুবিধার পেছনেও এই বিতর্কিত এসআইআর প্রক্রিয়ার হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

Advertisement

এই নজিরবিহীন ও ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ডের পক্ষে সাফাই গাইতে গিয়ে মোদী সরকারের অন্যতম মূল কারিগর ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ রাজপথে আন্দোলনের মুখেই দাবি করেন—কংগ্রেসসহ বিরোধী দলগুলো নাকি অবৈধ ‘ঘুসপেটিয়া’ বা অনুপ্রবেশকারীদের রক্ষা করার জন্য এসআইআরের বিরোধিতা করছে!

তবে আসল সত্য হলো, কতজন তথাকথিত ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ শনাক্ত করা গেছে—তার বিন্দুমাত্র হিসাব বা পরিসংখ্যান খোদ ভারতের নির্বাচন কমিশনের কাছেই নেই! কতজন অবৈধ নাগরিক ভোটার তালিকায় ঢুকেছিল, সেটির কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য ছাড়াই ১৩ কোটি মানুষের নাম কেটে দেওয়া হলো। পক্ষান্তরে, হাজার হাজার এমন নজির সামনে আসছে, যেখানে শতবর্ষ ধরে ভারতে বসবাসকারী খাঁটি ও বৈধ ভারতীয়দের নাম তালিকা থেকে রাতারাতি হাওয়া হয়ে গেছে।

আইএমএফ’র তথ্যে উন্মোচিত বিজেপির ভণ্ডামি

বিজেপি ও তার অনুসারীরা ভারতের জনমনে এই আতঙ্ক তৈরি করতে চায় যে, বাংলাদেশ থেকে লাখ লাখ দরিদ্র মানুষ নাকি ভারতে উপচে পড়ছে। অথচ আইএমএফের সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি ভারতের চেয়েও বেশি!

বিষয়টি উল্লেখ করে নিবন্ধে বলা হয়, বিশ্বের কোথাও নিজেদের সমান বা ভালো অর্থনীতির প্রতিবেশী দেশ থেকে গণ-অভিবাসন বা কাজের খোঁজে পালিয়ে আসার নজির দেখা যায় না। কিন্তু মোদী-অমিত শাহদের ভারতে প্রপাগান্ডার ওপর ভর করে এমন এক কাল্পনিক ও হাস্যকর গল্প সাজানো হচ্ছে, যা অর্থনৈতিক বাস্তবতার সম্পূর্ণ বিপরীত।

এর আগেও ২০১৯ সালে একই ধরনের ঘৃণ্য রাজনীতি করা হয়েছিল আসামের ‘ন্যাশনাল রেজিস্টার অব সিটিজেনস’ (এনআরসি) প্রক্রিয়ায়। আসাম ভারতের অন্যতম দরিদ্র একটি রাজ্য, যার অর্থনৈতিক অবস্থা বাংলাদেশের অনেক নিচে। বর্তমানে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি আসামের চেয়ে প্রায় ১.৫ গুণ বেশি! সত্যটা এমন হওয়া সত্ত্বেও বিজেপি নেতারা গুজব রটিয়েছিলেন যে, প্রায় ৬০ লাখ বাংলাদেশি নাকি আসামে গিজগিজ করছে। কিন্তু বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের জীবন নরক বানিয়ে এনআরসির চূড়ান্ত তালিকায় দেখা গেল, বাদ পড়েছে মাত্র ১৯ লাখ মানুষ—যার একটা বড় অংশই আবার হিন্দু সম্প্রদায়ের লোক! অর্থাৎ, অর্থনৈতিক কাজের খোঁজে বাংলাদেশ থেকে আসামে বিশাল গণ-অভিবাসনের যে দাবি তোলা হয়েছিল, তা ছিল এক নির্মম ও সাজানো মিথ্যা।

আইনি নজির শূন্য, উদ্দেশ্য কেবলই ভোটাধিকার হরণ

বিজেপির এই বাংলাদেশবিরোধী কার্ড যে একটি ভোঁতা অস্ত্র, তার বড় প্রমাণ হলো আইনি বাস্তবতা। ভারতে অবৈধ সীমান্ত অতিক্রম করা একটি গুরুতর অপরাধ। যদি কোটি কোটি অবৈধ বাংলাদেশি সত্যিই ভারতে বাস করত, তবে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে লাখ লাখ অবৈধ নাগরিকের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার হচ্ছে না কেন? আদালত ও আইনি ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রকৃত কতজন বাংলাদেশি ধরা পড়েছে? পরিসংখ্যান বলছে, সেই সংখ্যাটি প্রায় শূন্যের কোঠায়!

অতএব, বিষাক্ত এই রাজনীতির আসল হিসাব বুঝতে খুব বেশি দূর যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ তাড়ানোর নামে বিজেপি মূলত তাদের নিজস্ব ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি ও নির্বাচনী বৈষম্য চরিতার্থ করছে। লক্ষ্য একটাই—ভারতের মূলধারার মুসলিম নাগরিকদের ভোটার তালিকা থেকে মুছে ফেলা, যাতে বিরোধী দলগুলো নিশ্চিত ভোটব্যাংক হারায় এবং অন্যায্য উপায়ে নির্বাচনে জয়লাভের পথ সুগম হয়।

আইএমএফের অর্থনৈতিক তথ্য এবং বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিজেপির এই ‘বাংলাদেশি’ জিকির ও এসআইআর নাটক এখন সম্পূর্ণ মিথ্যা প্রমাণিত। তবে প্রপাগান্ডা কাল্পনিক হলেও, এর নির্মম শিকার হচ্ছেন ভারতের কোটি কোটি সাধারণ নাগরিক, যাদের মাথার ওপর থেকে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে তাদের গণতান্ত্রিক মৌলিক অধিকার—‘ভোটাধিকার’।

সূত্র : ইনকিলাব 

  • সর্বশেষ