ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারি বাসভবনের কাছে অবস্থিত দিল্লির ঐতিহাসিক রেস কোর্স মসজিদ খালি করে দেওয়ার জন্য কর্তৃপক্ষ ৬ দিনের সময় বেঁধে দিয়ে নোটিশ পাঠিয়েছে বলে দাবি করেছেন মসজিদের ইমাম। এ নিয়ে স্থানটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
মসজিদের ইমাম মোহাম্মদ হারুন জানান, কেন্দ্রীয় ভূমি ও উন্নয়ন দফতর মসজিদটির বিদ্যুৎ ও পানি সংযোগ কেটে দিয়েছে এবং প্রধান ফটক বন্ধ করে দিয়েছে। এর ফলে সেখানে গিয়ে নিয়মিত নামাজ আদায় করতে চরম ভোগান্তি তে পড়ছেন ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।
প্রায় ৪০ বছর ধরে মসজিদটির সাথে যুক্ত থাকা ইমাম হারুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত একটি ভিডিওতে অভিযোগ করেন, এসব নিষেধাজ্ঞার কারণে মসজিদে চলাচলের পথ অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, বারবার সাহায্য চাওয়া সত্ত্বেও দিল্লি ওয়াকফ বোর্ড থেকে কোনো কার্যকর সহায়তা পাওয়া যায়নি।
গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ভূমি ও উন্নয়ন দফতর এই মসজিদটিকে সরকারি জমিতে গড়ে ওঠা একটি অননুমোদিত স্থাপনা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। তবে নয়া দিল্লি মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের (এনডিএমসি) অফিসিয়াল ওয়েবসাইটে মসজিদটি একটি ‘ঐতিহ্যবাহী সম্পত্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে, যদিও এর আইনি মর্যাদার বিষয়টি এখনও অমিমাংসিত।
কিরেন রিজিজুর হস্তক্ষেপ চাইল জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ
জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা মুহাম্মদ হাকিমুদ্দিন কাসমির নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল কেন্দ্রীয় সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজুর সঙ্গে দেখা করে এক স্মারকপত্র জমা দিয়েছেন। এতে সফদরজং মাকবারার পেছনে অবস্থিত এই মসজিদ ও সংলগ্ন কবরস্থানটি রক্ষায় জরুরি হস্তক্ষেপের আবেদন জানানো হয়।
জমিয়তের সভাপতি মাওলানা মাহমুদ আসাদ মাদানীর পক্ষে দেওয়া এই স্মারকপত্রে উল্লেখ করা হয়, মসজিদটি এনডিএমসি-এর ঐতিহ্যবাহী তালিকার ২২ নম্বর ক্রমিকে এবং ১৯৭৭ সালের দিল্লি গেজেটের ১৮ নম্বর ক্রমিকে লিপিবদ্ধ রয়েছে।সংগঠনটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে বিস্তারিত প্রতিবেদন তলব করার অনুরোধ জানানোর পাশাপাশি আইনি বিরোধের নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত যাতে কোনো ধরণের ভাঙচুর বা উচ্ছেদ না চালানো হয়, তা নিশ্চিত করতে দাবি জানিয়েছে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সূত্র অনুযায়ী, প্রতিনিধি দলের বক্তব্য গুরুত্ব দিয়ে শুনেছেন কিরেন রিজিজু এবং তিনি এ বিষয়ে ‘যথাসম্ভব চেষ্টা করবেন’ বলে আশ্বাস দিয়েছেন।
ওয়াকফ বোর্ডের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ ইমামের
ইমাম হারুন অভিযোগ করেন, গত প্রায় ছয় মাস ধরে তিনি দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের কাছে বিষয়টি জানিয়ে আসছেন, কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো কার্যকর সাহায্য পাননি।তিনি জানান, ওয়াকফ বোর্ড কেবল পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার বিষয়ে এনডিএমসিকে চিঠি পাঠিয়েই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছে, কিন্তু কর্তৃপক্ষের এই পদক্ষেপকে চ্যালেঞ্জ করে আদালতে যাওয়ার মতো কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়নি।
ইমাম ২০২১ সালে পরিচালিত একটি জরিপের উল্লেখ করে দাবি করেন, সেই জরিপে এই মসজিদটিকে অবৈধ স্থাপনা বা জবরদখল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়নি। তবে এই দাবিটি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।প্রবেশাধিকার রোধ এবং জরুরি সেবা বিচ্ছিন্ন করার কারণে মুসল্লিরা যে চরম কষ্টে পড়েছেন, তা উল্লেখ করে মসজিদটি রক্ষায় সর্বসাধারণের সহযোগিতা চেয়েছেন ইমাম।
উদ্বেগ প্রকাশ করলেন ওয়াইসি ও আমানতউল্লাহ খান
মজলিস-ই-ইত্তেহাদুল মুসলিমিনের (এআইএমআইএম) প্রধান ও লোকসভার সংসদ সদস্য আসাদউদ্দিন ওয়াইসি মন্ত্রী কিরেন রিজিজুকে অবিলম্বে হস্তক্ষেপের অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ঐতিহ্যবাহী ও ওয়াকফ সম্পত্তির অংশ হিসেবে এই মসজিদটি রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।
ওয়েসি উল্লেখ করেন, ১৯৭৭ সাল থেকেই মসজিদটি ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত রয়েছে। দিল্লি ওয়াকফ বোর্ডের আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার সমালোচনা করে তিনি প্রশ্ন তোলেন—২০২৩ সাল থেকে পরিচালনা পরিষদ না থাকলেও, বোর্ডের কর্মকর্তারা কেন এ বিষয়ে কোনো ব্যবস্থা নেননি?অন্যদিকে, আমাদমি পার্টির নেতা ও ওখলার বিধায়ক আমানতউল্লাহ খানও এই উচ্ছেদ নোটিশের খবরে তীব্র উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।
একটি ভিডিও বার্তায় আমানতউল্লাহ খান বলেন, “মসজিদটি দেশভাগের আগের সময়ের এবং এটি এনডিএমসির ঐতিহ্যবাহী তালিকার মধ্যেও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আগামীকাল আমি নিজে সেখানে যাব।”
উল্লেখ্য, রেস কোর্স রোড এলাকায় অন্যান্য উচ্ছেদ অভিযান চলার পরপরই মসজিদের বিষয়ে এই জটিলতা তৈরি হলো। খবরে বলা হয়েছে, সম্প্রতি দিল্লি হাইকোর্ট ওই এলাকার বস্তিবাসীদের সরাতে নগর কর্তৃপক্ষকে সম্মতি দিয়েছে, যাদের পরবর্তীতে সাওদা ঘেবরায় পুনর্বাসন করা হবে।