ইরান যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন যে লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিল, সেগুলোর বেশির ভাগই নমনীয় নয়। আর এ কারণে যুদ্ধ থেকে এত সহজে সরতে পারছে না ট্রাম্প প্রশাসন। এ ধরনের লক্ষ্যের মধ্যে দেখা গেছে– ইরানের সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ, হিজবুল্লাহর মতো মধ্যপ্রাচ্যের গোষ্ঠীগুলোর জন্য তেহরানের সমর্থন বন্ধ, কখনও পারমাণবিক অস্ত্র তৈরিতে হাত না দেওয়া ইত্যাদি।
তবে যুদ্ধ ছয় মাসে গড়ানোর পর সেসব লক্ষ্য বহুবার পরিবর্তন হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বড় ছাড় দিয়ে লক্ষ্য পেছানো হয়েছে। সে রকমই আরেকটি ছাড় হয়তো এবার দিতে চলেছে ট্রাম্প প্রশাসন। কিন্তু এবার ছাড়টি দেবেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, এবার হয়তো আরও কমেই সন্তুষ্ট হতে চায় যুক্তরাষ্ট্র।
গত বৃহস্পতিবার ফক্স নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভ্যান্স জানান, তাঁর লক্ষ্য দুটি। প্রথমটি হলো, উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো যাতে বিশ্ব অর্থনীতিতে তেল ও গ্যাস পাঠিয়ে জ্বালানি মূল্য স্থিতিশীল রাখতে পারে এবং মার্কিনিরা যাতে দেশজুড়ে কম দামে তেল ও গ্যাস কেনার সুযোগ পায়। আর দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো, ইরান যাতে কখনও পারমাণবিক অস্ত্র না বানাতে পারে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, পারমাণবিক অস্ত্রের বিষয়টি প্রশাসনের পুরোনো লক্ষ্যের মধ্যেও রয়েছে। তবে ভ্যান্স যেভাবে লক্ষ্য দুটিকে সাজিয়েছেন, তা চমকপ্রদ। কারণ, এবারই প্রথম মার্কিনিদের তেল ও গ্যাসের দামের বিষয়টিকে আমলে নেওয়া হচ্ছে।
ভ্যান্সের লক্ষ্য যে ফাঁকা বুলি নয়, সে সম্পর্কে কিছুটা তথ্য মিলেছে গত শুক্রবার। হোয়াইট হাউস প্রেস সচিব ক্যারোলাইন লেভিট বলেছেন, দুটি লক্ষ্যই প্রেসিডেন্টের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
ট্রাম্প এর আগে মে মাসে মার্কিনিদের কম দামে তেল ও গ্যাস পাওয়ার বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিতে রাজি হননি। সেই সময় তাঁকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, মার্কিনিদের অর্থনৈতিক অবস্থার কথা তিনি বিবেচনা করছেন কিনা। উত্তরে মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন, ‘একটুও না।’ তিনি সেই সময় ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, ইরানের পরমাণু নিরস্ত্রীকরণ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ, অন্য কিছুকে আমলে নেওয়া সম্ভব না।
ট্রাম্প একই ধরনের কথা গত শুক্রবারও বলেছেন। তিনি জানান, মার্কিনিদের জন্য তেল ও গ্যাসের দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে কখনও ক্ষমা চাবেন না। কারণ, ইরান যুদ্ধের সঙ্গে অনেক কিছু জড়িত।
ইরান যুদ্ধ অবসানের জন্য আগে একাধিকবার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। কোনো তালিকায় ছিল– প্রক্সি গোষ্ঠীর জন্য তহবিল বন্ধ করা, কোনোটায় ছিল ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোর অবসান, একটিতে ছিল ইরানের বিমানবাহিনীর ইতি টানার বিষয়টি। আবার কয়েকটিতে বলা হয়েছিল, শুধু ইরানের নৌবাহিনীর অবসান হলেই চলবে। বিষয়টি অনেকটা এমন ছিল, প্রশাসন যেন বাস্তব সময়ে এই তালিকা পরিমার্জন করে যাচ্ছে। তবে এখানে লক্ষণীয় মূল বিষয়টি হলো, তেল ও গ্যাসের দাম যুক্তরাষ্ট্রে কমানোর বিষয়টি কোনো তালিকায় ছিল না।
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, যেহেতু যুদ্ধের আগে হরমুজ প্রণালি খোলা ছিল, বর্তমানে ভ্যান্সের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের অর্থ দাঁড়াচ্ছে, যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফিরতে চাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এবং পরমাণু নিরস্ত্রীকরণই এখানে একমাত্র বিষয়, যা অর্জিত হবে।
সিএনএনের বিশ্লেষণ বলছে, যদি যুদ্ধ-পূর্ববর্তী অবস্থায় ফেরাই বর্তমানের এক নম্বর লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে এই যুদ্ধ থেকে যে খুব বেশি অর্জন আসেনি, সে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে যায়।
কাতারে ইরানি পাইলট
ইরানের দাবি, কাতারে ইরানি দুই পাইলট আটকা পড়েছেন। তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানার ব্যবস্থা করে দিতে ইরানের একটি টিমকে কাতারে প্রবেশ করতে দেওয়া উচিত। তবে কাতার বিষয়টি অস্বীকার করে জানিয়েছে, তাদের হাতে কোনো ইরানি পাইলট নেই।
দোহা গত শনিবার জানায়, গত মার্চে তাদের উদ্ধারকর্মীরা একজন পাইলটের দেহাবশেষের খোঁজ পেয়েছিল। সেই সময় কাতারের আকাশে ঢুকে পড়েছিল ইরানি বিমান এবং তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছিল।
ওমানের সঙ্গে আলোচনার ফল শিগগিরই
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, ওমানের সঙ্গে চলমান আলোচনা ইরান যুদ্ধ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক এবং খুব শিগগিরই এই আলোচনার ফলাফল দৃশ্যমান হবে।
আরাঘচি বলেন, ওমানের সঙ্গে আমাদের আলোচনা চলমান। এটি সম্পূর্ণ পৃথক বিষয়। এটি মূলত হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ যাতায়াতের সঙ্গে সম্পৃক্ত। আগে যে পথগুলো ছিল, সেগুলো এখন আর কার্যকর নেই। ফলে নতুন পথ বের করতে হবে। আমরা সাময়িক একটি পথ বের করার কাজ করছি, যেটিকে পরবর্তী সময় চূড়ান্ত রূপ দেওয়া যাবে।
এদিকে, ইরান-ওমান আলোচনার ফলাফল মেনে নিতে অনিচ্ছুক যুক্তরাষ্ট্র। দেশটি চায় না হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলের ওপর কোনো কর আরোপ হোক। অন্যদিকে, ইরান চায় হরমুজ দিয়ে যাতায়াত করা জাহাজ থেকে টোল সংগ্রহ করতে।