শুধু ‘২,৪-ডি’ একাই নয়, ভারতের কৃষিক্ষেত্রে এমন অনেক বিতর্কিত রাসায়নিকের ব্যবহার চলছে, যা উন্নত বিশ্বে বহু আগে নিষিদ্ধ হয়েছে। যেমন বিশ্বজুড়ে ৭০টিরও বেশি দেশে নিষিদ্ধ হওয়া আগাছানাশক ‘প্যারাকোয়াট’ এবং ডব্লিউএইচও কর্তৃক ক্যানসারের অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত ‘গ্লাইফোসেট’ অবলীলায় ব্যবহৃত হচ্ছে ভারতের ফসলি মাঠে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময় বনাঞ্চল ও ফসলের ক্ষেত ধ্বংস করতে ‘এজেন্ট অরেঞ্জ’ নামে একটি মারাত্মক রাসায়নিক আকাশ থেকে স্প্রে করেছিল মার্কিন বিমানবাহিনী। লক্ষ্য ছিল কমিউনিস্ট যোদ্ধাদের খাদ্য সরবরাহ বন্ধ করা। সেই ঘটনার অর্ধশতক পর, এজেন্ট অরেঞ্জের অন্যতম প্রধান উপাদান ‘২,৪-ডি’ নামে আগাছানাশকটি এখনও দেদার ব্যবহৃত হচ্ছে ভারতসহ বিভিন্ন দেশের কৃষিজমিতে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) ক্যানসার গবেষণা সংস্থা একে ‘সম্ভাব্য ক্যানসার সৃষ্টিকারী’ উপাদান হিসেবে তালিকাভুক্ত করেছে।
স্বাস্থ্য ক্ষতির আশঙ্কায় ৩১টি দেশে নিষিদ্ধ ‘ডাইমেথোয়েট’ এবং মৌমাছির বংশ ধ্বংসকারী কীটনাশক ‘অ্যাসিফেট’ কোনো বাধা ছাড়াই বিক্রি হচ্ছে ভারতীয় বাজারে। এসব ক্ষতিকর রাসায়নিক কৃষিজমি থেকে ফসলের মাধ্যমে সরাসরি চলে আসছে মানুষের খাবারের থালায়, যা নীরবে কেড়ে নিচ্ছে সাধারণ মানুষের প্রাণ।
এই অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিকের ব্যবহার ভারতের অভ্যন্তরীণ জনস্বাস্থ্যকেই কেবল হুমকির মুখে ফেলেনি, আন্তর্জাতিক বাজারেও দেশটির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করছে।
ইউরোপীয় কমিশন এবং ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ক্ষতিকর কীটনাশক ও ভারী ধাতুর উপস্থিতির কারণে ২০২৪ সালের মে থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ২৭টি সদস্য দেশ ভারতের ৩৬৫টি কৃষিজাত পণ্য বাতিল বা প্রত্যাখ্যান করেছে। বৃহত্তম বাণিজ্য জোটে ভারতীয় পণ্য এভাবে বাতিল হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তার চেয়েও বড় উদ্বেগের বিষয় হলো কোটি কোটি ভারতীয় নাগরিকের প্রতিদিন এই বিষাক্ত খাবার গ্রহণ করা।
ভারতে ক্যানসার এরই মধ্যে একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইন্ডিয়ান কাউন্সিল অব মেডিকেল রিসার্চের (আইসিএমআর) তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে ভারতে নতুন ক্যানসার রোগী শনাক্ত হয়েছিল ১৪ লাখ ৬০ হাজার। ২০২৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা প্রায় ১৫ লাখ ৭০ হাজারে পৌঁছাবে বলে আশঙ্কা করা হয়েছিল।
ক্যানসারের একাধিক কারণ থাকতে পারে এবং কোনো একটি নির্দিষ্ট কীটনাশককে এর জন্য এককভাবে দায়ী করা যায় না, তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে ক্যানসার সৃষ্টি করতে পারে এমন সম্ভাব্য উপাদানের সংস্পর্শ যতটা সম্ভব কমিয়ে আনা উচিত।
১৮৮২ সালে অস্ট্রিয়ান রসায়নবিদ হুগো উইডেল প্রথম ‘প্যারাকোয়াট’ সংশ্লেষণ করেন। পঞ্চাশের দশকে ব্রিটেনের ইম্পেরিয়াল কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ এর আগাছানাশক গুণাগুণ আবিষ্কার করে এবং পরে সুইজারল্যান্ডের সিনজেনটা ও বর্তমানে চীনের কেমচায়না এর মালিকানা পায়। তীব্র বিষাক্ততার কারণে ২০০৭ সালেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন কৃষিকাজে প্যারাকোয়াট নিষিদ্ধ করে। বর্তমানে অন্তত ৭৪টি দেশে এটি নিষিদ্ধ হলেও ভারতে তা সম্পূর্ণ বৈধ।
চিকিৎসাবিজ্ঞানীদের মতে, প্যারাকোয়াটের বিষক্রিয়া এতটাই মারাত্মক যে এর কোনো সুনির্দিষ্ট অ্যান্টিডোট বা প্রতিষেধক নেই। সামান্য পরিমাণ প্যারাকোয়াট শরীরে প্রবেশ করলে ফুসফুস ও কিডনি বিকল হতে পারে এবং এটি পারকিনসন্স রোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
ভারতের রাজস্থানের কিষাণ মহাপঞ্চায়তসহ বিভিন্ন কৃষক সংগঠন এটি নিষিদ্ধের দাবি জানিয়েছে। কেরালা ও তেলেঙ্গানার মতো কয়েকটি রাজ্য এর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নিলেও দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা চেয়ে করা একটি আবেদন এখনও সুপ্রিম কোর্টে ঝুলে আছে।
সুইস রসায়নবিদ হেনরি মার্টিন আবিষ্কৃত এবং পরবর্তীতে মার্কিন বহুজাতিক কোম্পানি মনসান্টোর তৈরি ‘রাউন্ডআপ’ বা গ্লাইফোসেট ইতিহাসের অন্যতম সফল কৃষিপণ্য। তবে ২০১৫ সালে ডব্লিউএইচওর ইন্টারন্যাশনাল এজেন্সি ফর রিসার্চ অন ক্যানসার (আইএআরসি) গ্লাইফোসেটকে ক্যানসার সৃষ্টির জন্য দায়ী (গ্রুপ ২এ) বলে ঘোষণা করার পর বিশ্বজুড়ে আইনি লড়াই শুরু হয়। মনসান্টো কিনে নেওয়া জার্মান কোম্পানি বায়ার ক্যানসার সৃষ্টির মামলার নিষ্পত্তির জন্য এরই মধ্যে শতকোটি ডলার জরিমানা গুনেছে।
তবে ভারতের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো বহুজাতিক কোম্পানির দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে একে এখনও ‘নিরাপদ’ বলে সার্টিফিকেট দিয়ে যাচ্ছে। গণমাধ্যম ‘কিষাণ তক’-এর সম্পাদক ও কৃষি বিশেষজ্ঞ ওম প্রকাশ একে আমলা ও বহুজাতিক কোম্পানির যোগসাজশ উল্লেখ করে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
তুলা, শাকসবজি ও ডাল চাষে বহুল ব্যবহৃত কীটনাশক ‘অ্যাসিফেট’ মানবদেহের চেয়েও বেশি ক্ষতি করছে পরিবেশ ও পরাগায়নকারী পতঙ্গদের। বিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন, অ্যাসিফেটের ব্যবহারে মধু উৎপাদনকারী মৌমাছি এবং প্রজাপতির মতো উপকারী কীট-পতঙ্গ মারা যাচ্ছে, যা বৈশ্বিক খাদ্য উৎপাদনের জন্য এক বড় হুমকি।
মৌমাছির সংখ্যা কমে গেলে ফল, সবজি ও তৈলবীজের উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে। ভারতে জাসিড, থ্রিপস বা সাদা মাছি দমনে সস্তা ও কার্যকর উপায় হিসেবে এটি দেদার ব্যবহার করা হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে জীববৈচিত্র্যকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
ভারতের সার ও কীটনাশক লবি হয়তো যুক্তি দিতে পারে, আধুনিক কৃষিব্যবস্থা রাসায়নিক ছাড়া সচল রাখা সম্ভব নয় এবং এটি নিষিদ্ধ করলে উৎপাদন খরচ বাড়বে ও ফলন কমবে। তবে সমালোচকদের প্রশ্ন অন্য জায়গায়। ইউরোপ ও পশ্চিমা বিশ্ব যে রাসায়নিকগুলোকে মানবদেহ ও পরিবেশের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর বিবেচনা করে নিষিদ্ধ করেছে, উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে ভারতে সেগুলোর বিশাল বাজার কীভাবে বজায় থাকে?