শিরোনাম
◈ জাতিসংঘের প্রতিবেদন ‘অত্যন্ত ভুল তথ্যে ভরা’, ১,৪০০ মৃত্যুর হিসাব প্রত্যাহারের দাবি শেখ হাসিনার! ◈ শহীদ জিয়ার সমাধিতে প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা,ঢাকা ১৬ টি স্থানে বস্ত্র বিতরনে অংশ নিবেন ◈ ট্রাম্পের গলফ প্রকল্পে ভাঙছে কবরস্থান, জমি ছাড়তে নারাজ কৃষকেরা, ক্ষোভে ফুঁসছে ভিয়েতনামের গ্রামবাসী ◈ ট্রাম্পের দেওয়া যে ২ শর্তে ঝুলে আছে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি ◈ ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে ধ্বংস হয়েছে ৬ হাজার ৪৭৩টি ইসরায়েলি বাড়ি: জেরুজালেম পোস্ট ◈ আজ রা‌তে চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ফাইনালে আর্সেনাল ও পিএস‌জি মু‌খোমু‌খি ◈ বর্ষায় গো-খাদ্যের ভরসা যমুনার চর, ঘাসের হাটে মিলছে কৃষকের স্বস্তি ◈ পথ দেখাচ্ছে বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের তরুণীরা : প্যারিসে অধ্যাপক ইউনূস ◈ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশি শান্তিরক্ষীদের ভূমিকার প্রশংসা জাতিসংঘের ◈ বিশ্বকা‌পের গ্রুপ প‌র্বে বেলজিয়ামের সামনে মিশর-ইরান ও নিউজিল্যান্ড চ্যালেঞ্জ

প্রকাশিত : ৩০ মে, ২০২৬, ১২:১২ দুপুর
আপডেট : ৩০ মে, ২০২৬, ১২:১২ দুপুর

প্রতিবেদক : আর রিয়াজ

ট্রাম্পের গলফ প্রকল্পে ভাঙছে কবরস্থান, জমি ছাড়তে নারাজ কৃষকেরা, ক্ষোভে ফুঁসছে ভিয়েতনামের গ্রামবাসী

ফিন্যান্সিয়াল টাইমস: উত্তর ভিয়েতনামের ফলবাগানে ঘেরা একটি ছোট্ট সমাধিক্ষেত্র। কয়েক দশক ধরে নিজেদের জমির পাশেই পরিজনদের কবর দিয়ে এসেছেন কৃষকেরা। কিন্তু এখন বাধ্য হয়ে সেই সব সমাধি খুঁড়ে দেহাবশেষ বের করছেন তারা।

কারণ ট্রাম্প অর্গানাইজেশন ও তাদের স্থানীয় সহযোগীদের একটি মেগা-প্রকল্প। প্রায় ১.৫ বিলিয়ন ডলারের এই প্রকল্পে তৈরি হবে গলফ মাঠ ও বিলাসবহুল আবাসন। তার জায়গা করে দিতেই সমাধিক্ষেত্রটি ভেঙে ফেলা হচ্ছে।

হুং ইয়েন প্রদেশের চাউ নিন কমিউনের ওই সমাধিক্ষেত্রে এখন ভাঙা নামফলক আর আধপোড়া ধূপকাঠির ছড়াছড়ি। ভেঙে পড়া বেদির উপর সেগুলো বিপজ্জনকভাবে ছড়িয়ে রয়েছে। বেশ কয়েকটি সমাধিপাথরে বড় করে 'ক্রস' (X)  চিহ্ন আঁকা। অর্থাৎ সেখান থেকে মৃতদেহ সরানো হয়ে গেছে।

লিলি ফুলচাষি ত্রান মিন হাইয়ের আক্ষেপ, 'এই প্রকল্পের জন্যই মানুষ তাদের পূর্বপুরুষদের সরাতে বাধ্য হচ্ছে।' ভিয়েতনামের একটি প্রাচীন প্রবাদের উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাধিক্ষেত্রের শান্তিতে বিঘ্ন ঘটাতে নেই। গ্রামবাসীর একাংশ আবার মৃতদেহ তোলায় সম্মতি দেননি।

সমাধিক্ষেত্র নিয়ে এই টানাপোড়েনের জেরে ৯৯০ হেক্টরের প্রকল্পটি বিলম্বিত হচ্ছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের পারিবারিক সংগঠন ট্রাম্প অর্গানাইজেশনের এ প্রকল্পে পাঁচতারকা হোটেল ও অতি-বিলাসবহুল ভিলা তৈরির কথা রয়েছে।

হ্যানয় ও ওয়াশিংটনের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে এই প্রকল্পটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্যমতে, ২০২৫ সালের মে মাসে প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে ভিয়েতনামের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ফাম মিন চিন বলেছিলেন, 'ভিয়েতনাম-আমেরিকা সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে—বিনিয়োগকারীদের, বিশেষত মার্কিন বিনিয়োগকারীদের আস্থা বাড়াতে—এই গলফ কোর্স গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।' এরিক ট্রাম্প প্রকল্পটিকে 'গোটা এশিয়া ও বিশ্বের কাছে ঈর্ষণীয়' বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

রপ্তানি-নির্ভরশীল ভিয়েতনাম এই প্রকল্পের অনুমোদনে বেশ তড়িঘড়ি করেছিল। ট্রাম্পের 'লিবারেশন ডে' শুল্ক নীতির মাত্র ছয় সপ্তাহের মধ্যেই এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও তার মিত্রদের সন্তুষ্ট করতেই হ্যানয় এই পদক্ষেপ নিয়েছিল বলে মনে করা হয়। শুরুতে ভিয়েতনামের উপর ৪৬ শতাংশ শুল্ক চাপানোর হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প, চীনের পর যা ছিল সর্বোচ্চ। পরে অবশ্য তা কমিয়ে ২০ শতাংশ করা হয়।

আমেরিকা ভিয়েতনামের শীর্ষ রপ্তানি বাজার। সম্প্রতি ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে বহু উৎপাদনকারী চীন থেকে ব্যবসা সরিয়ে ভিয়েতনামে নিয়ে এসেছে। ফলে আমেরিকার সঙ্গে বাণিজ্যে ভিয়েতনামের উদ্বৃত্ত আরও বেড়েছে।

আইএসইএএস ইউসুফ ইসহাক ইনস্টিটিউটের ভিজিটিং ফেলো গুয়েন খাক গিয়াং বলেন, 'বাণিজ্য, শুল্ক ও মেধাস্বত্ব-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক উদ্বেগের প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনকে খুশি করতে ভিয়েতনামের আরও কিছু করা প্রয়োজন—এমন একটা ধারণা ক্রমশ প্রবল হচ্ছে।'

বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানান, ২০২৭ সালের মধ্যেই এ প্রকল্প চালু হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু জমি নিয়ে বিবাদের জেরে তা পিছিয়ে গেছে।

কমিউনিস্ট পার্টি শাসিত ভিয়েতনামে জমির মালিকানা থাকে 'জনগণের' হাতে, আর তা পরিচালনা করে রাষ্ট্র। তাই জমি অধিগ্রহণ করে তা লগ্নিকারীদের হাতে তুলে দেওয়ার দায়িত্ব সরকারেরই। মার্চ মাসে দেশটির সরকারি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রথম ধাপের জন্য প্রয়োজনীয় ৫০০ হেক্টর জমির মধ্যে মাত্র এক-তৃতীয়াংশের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন পরিকল্পনা অনুমোদিত হয়েছে।

এ প্রকল্পের জেরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে চলেছে চার হাজারেরও বেশি পরিবার। প্রায় দুই ডজন স্থানীয় বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের অনেকেই জমি ছাড়তে নারাজ। অনেকেই সরকারের কাছে আরও বেশি ক্ষতিপূরণ দাবি করছেন।

চলতি মাসের শুরুতে প্রকল্প এলাকা দেখেনফিনান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) প্রতিনিধিরা। সেখানে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বোর্ড অভ ট্রাম্প ইন্টারন্যাশনাল লেখা একটি লাল ব্যানারের পাশে কয়েকটি বুলডোজার ও ডাম্প ট্রাক দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। তবে নির্মাণকাজ এখনও শুরু হয়েছে বলে মনে হয় না।

প্রস্তাবিত গলফ মাঠের কাছেই কলার খেত রয়েছে ৬৩ বছর বয়সি গুয়েন ডুক থিও-র। তিনি বলেন, 'প্রথম যখন আমাদের এই গলফ প্রকল্পের কথা জানানো হয়, তখন দেশের উন্নয়নের কথা ভেবে মানুষ বেশ উৎসাহিতই হয়েছিল; প্রকল্পটিকে সমর্থনও জানিয়েছিল।'

কিন্তু থিও এবং অন্যান্য বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্থানীয় কর্মকর্তারা তাদের বাজারদরের চেয়ে কম টাকায় জমি ছাড়তে চাপ দিচ্ছেন। কৃষিজমির জন্য প্রতি বর্গমিটারে মাত্র ৩ ডলার (৮০ হাজার ডং) দিতে চাইছে প্রশাসন।

সমর্থকদের যুক্তি, এ প্রকল্পের ফলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে এবং পর্যটকদের আনাগোনা বাড়বে। কিন্তু প্রস্তাবিত গলফ কোর্সের একটি বড় অংশই উর্বর জমির ওপর অবস্থিত। এই উর্বর মাটির গুণেই হুং ইয়েন প্রদেশ দেশের অন্যতম প্রধান ফল উৎপাদনকারী অঞ্চল হয়ে উঠেছে।

হ্যানয় থেকে এক ঘণ্টারও কম দূরত্বের এই প্রস্তাবিত গলফ মাঠের আশেপাশের গ্রামগুলোতে সমৃদ্ধির ছাপ স্পষ্ট। প্রায় প্রতিটি সরু গলিতেই নতুন বাড়ি তৈরি হচ্ছে। এখানকার বাসিন্দারা মূলত বয়স্ক কৃষক। ছেলেমেয়েদের পড়াশোনা বা কাজের জন্য শহরে পাঠিয়েছেন তারা। এমন লাভজনক জমির চরিত্র বদল তাই স্থানীয়দের ক্ষুব্ধ করেছে। 

স্থানীয় বাসিন্দা হাই বলেন, 'দেখলেই বোঝা যায় এই জমি কতটা উর্বর। আমরা চাষবাসের জন্য এই জমির ওপরই নির্ভরশীল। আর এই চাষের আয় থেকেই আমরা এমন বাড়ি তৈরি করতে পেরেছি। কাজেই বুঝতেই পারছেন, এই জমি আমাদের কতটা দামি।'

এ প্রকল্পে স্থানীয় সহযোগী হিসেবে রয়েছে কিনহ বাক সিটি (কেবিসি)। মূলত ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্ক নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবেই তাদের পরিচিতি। প্রকল্পের বিপুল ব্যয় কে বহন করবে, তা এই দুই কোম্পানির কেউই এখনও জানায়নি।

তবে ট্রাম্প অর্গানাইজেশন সাধারণত এ ধরনের প্রকল্পে নির্মাণ বা উন্নয়নের কোনো খরচ বহন করে না। কেবিসির মতো স্থানীয় সহযোগীদেরই সেই দায়িত্ব নিতে হয়। তারা মূলত 'ট্রাম্প' ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহারের ছাড়পত্র দেয়। বিনিময়ে স্থানীয় অংশীদারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট ফি নেয়। ইউএস অফিস অভ গভর্নমেন্ট এথিক্স-এ ২০২৪ সালে ট্রাম্পের জমা দেওয়া আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, কেবিসির একটি শাখা সংস্থা ইতিমধ্যেই ট্রাম্প অর্গানাইজেশনকে লাইসেন্স ফি বাবদ ৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেছে।

প্রকল্প এলাকায় থাকা লাল ব্যানারে লুং লো কনস্ট্রাকশন কর্প-এর নাম রয়েছে। এটি ভিয়েতনামের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন অবকাঠামো নির্মাণকারী সংস্থা। অবকাঠামো নিরাম্নের পাশাপাশি মাইন ্ব বোমা নিষ্ক্রিয় করার কাজও করে তারা। গত কয়েক বছরে হুং ইয়েন প্রদেশে ভিয়েতনাম যুদ্ধের সময়ের বেশ কিছু অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ উদ্ধার হয়েছে।

এ বিষয়ে কেবিসি, লুং লো, ট্রাম্প অর্গানাইজেশন, হুং ইয়েন প্রদেশের প্রশাসন কিংবা ভিয়েতনাম সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কারও পক্ষ থেকেই সাড়া পাওয়া যায়নি।

এদিকে নিজেদের দাবিতে অনড় আছেন প্রকল্প-সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দারা।

হুং ইয়েন প্রদেশের শীর্ষ নেতৃত্ব স্থানীয় কর্মকর্তাদের এপ্রিলের মধ্যেই দ্রুত জমি অধিগ্রহণের কাজ শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিল। কিন্তু মে মাসের শুরুতেও বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জমি ছাড়তে অস্বীকার করেছেন। তাদের অভিযোগ, সরকার ভয় দেখাচ্ছে। তাছাড়া জমির জরিপ ও ফসলের দাম নির্ধারণের ক্ষেত্রেও সরকারি পর্যায়ে চরম অস্বচ্ছতা রয়েছে।

বাবা-মা ও ছেলের কবর সরানোর জন্য প্রায় ৭০ মিলিয়ন ডং ক্ষতিপূরণ পেয়েছেন ৭২ বছর বয়সি হোয়াং দো। তিনি বলেন,  'বিষয়টি অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক। [জমি অধিগ্রহণের জন্য] যে দাম দেওয়া হচ্ছে, তা দেখে আমি ক্ষুব্ধ।'

বুই থি ইয়েন নামে অপর এক বাসিন্দা জানান, তিনি তার জমির একাংশ কিছুতেই ছাড়তে চান না। কারণ ভিয়েতনাম যুদ্ধে নিহত সেনাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবেই ওই জমি দেওয়া হয়েছিল।

ওই সমাধিক্ষেত্রে হোয়াং আন জা-র পরিবারের পাঁচ সদস্য শায়িত রয়েছেন। তিনি বলেন, '১৯৬৭ সাল থেকে আমার পূর্বপুরুষদের কবর ওখানে রয়েছে। অর্থাৎ এই দেশের (সমাজতান্ত্রিক ভিয়েতনাম প্রজাতন্ত্র) জন্মেরও আগে থেকে। আমি কেন তাদের সরাব?'

৫০ বছর বয়সি জা নিজের জীবিকা নিয়েও চিন্তিত। তিনি বলেন, 'আমি নতুন করে আর অন্য কোনো কাজ খুঁজে পাব না। আমরা দল বা সরকারের কোনো নীতির বিরোধিতা করছি না। আমাদের একটাই দাবি, জমির দাম আরও বাড়াতে হবে।' অনুবাদ: টিবিএস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়