শিরোনাম
◈ ১২ দল নি‌য়ে সোমবার শুরু হ‌চ্ছে ঢাকা প্রিমিয়ার ক্রিকেট লিগ ◈ টেস্ট খেল‌তে পা‌কিস্তান দল এখন ঢাকায় ◈ ভারী বর্ষণে চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের আশঙ্কা ◈ ৮ মাস পর ঘুরে দাঁড়াল রপ্তানি, এপ্রিলে আয় ৩৩% বৃদ্ধি ◈ শাপলা চত্বর হত্যাযজ্ঞ: ঢাকাতেই ৩২ জনকে হত্যার প্রমাণ মিলেছে ◈ রামপাল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্র উৎপাদনে নতুন রেকর্ড গড়ল ◈ ই-ট্রাফিক ব্যবস্থায় নতুন ধাপ: আইন ভাঙলে অটো নোটিশ, হাজিরা না দিলে পরোয়ানা ◈ মে‌সির ইন্টার মায়া‌মি ৩ গো‌লে এগি‌য়ে থে‌কেও হে‌রে গে‌লো ◈ গুরুত্বপূর্ণ খনিজ শিল্পে বিনিয়োগ ও সংস্কারে এডিবির নতুন উদ্যোগ ◈ শার্শায় তৃতীয় শ্রেনীর শিক্ষার্থীকে ধর্ষন চেষ্টার অভিযোগে গ্রেফতার

প্রকাশিত : ০৩ মে, ২০২৬, ০৭:২৩ বিকাল
আপডেট : ০৩ মে, ২০২৬, ১১:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

যুদ্ধবিরতির আড়ালে সামরিক শক্তি পুনর্গঠনে ইরান

ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের টানা কয়েক সপ্তাহ বিমান হামলার পর অবিস্ফোরিত গোলাবারুদ উদ্ধারকে ইরান সরকার এবং দেশটির রাষ্ট্রীয় প্রচারমাধ্যমগুলো একদিকে প্রযুক্তিগত আশীর্বাদ ও অন্যদিকে এক কৌশলগত সুযোগ হিসেবে চিত্রায়িত করছে। যুদ্ধক্ষেত্রের এসব ধ্বংসাবশেষকেই তারা তাদের ভবিষ্যতের সামরিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে তুলে ধরছে।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম এবং কট্টরপন্থি রাজনৈতিক মহলে জোরালোভাবে প্রচার করা এই বক্তব্য থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, তারা এই যুদ্ধোত্তর সময়কে সংঘাতের অবসান হিসেবে দেখছে না। বরং এক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির আড়ালে একে তারা সামরিক শক্তিকে আরও সুসংহত করার এক বিশেষ সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করছে।

শুক্রবার ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, তারা দক্ষিণাঞ্চলীয় হরমোজগান প্রদেশে ডজনেরও বেশি ভারী মার্কিন ক্ষেপণাস্ত্র নিষ্ক্রিয় করেছে। এসব অস্ত্র প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে নিজস্ব প্রযুক্তিতে রূপান্তরের উদ্দেশ্যে সংশ্লিষ্ট প্রযুক্তি ও গবেষণা ইউনিটে হস্তান্তর করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া এসব অস্ত্রের মধ্যে একটি জিবিইউ-৫৭ বাঙ্কার-ব্লাস্টার বোমা এবং অন্যান্য প্রদেশ থেকে সংগৃহীত হাজার হাজার ছোট বোমা  রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে টানা ৪০ দিন ধরে চলা রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ইরানে। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে চরম উত্তেজনার পর গত ৮ এপ্রিল একটি ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে এই সংঘাতের অবসান ঘটে।

যুদ্ধক্ষেত্রের অস্ত্রগুলোর গর্জন এখন থেমে গেলেও ইরানের সামরিক বার্তাগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, যুদ্ধ এখন সরাসরি সংঘাতের বদলে নিজেদের শক্তি সংহত করার এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে। কট্টরপন্থি ইরানি সংবাদমাধ্যমগুলো অবিস্ফোরিত এই যুদ্ধাস্ত্রগুলোকে বিপদের পরিবর্তে বরং বড় সম্পদ হিসেবে সরাসরি উল্লেখ করছে।

আইআরজিসি-ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যম স্টুডেন্ট নিউজ নেটওয়ার্ক উদ্ধার হওয়া এসব অস্ত্রকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত উপহার’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, এই সংঘাত মূলত ইরানের নিজস্ব প্রতিরক্ষা শিল্পের জন্য একটি ‘গবেষণাগার’ হিসেবে কাজ করেছে।

সংবাদমাধ্যমটি আরও বলেছে যে, এই অবিস্ফোরিত অস্ত্র ব্যবস্থাগুলো বিশ্লেষণের জন্য পাঠানোর মাধ্যমে ইরান ‘শত্রুর হুমকিকে’ উন্নত প্রযুক্তি পুনরুৎপাদনের এক কৌশলগত সুযোগে রূপান্তর করতে পারছে।

কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ইরানকে দেশীয় প্রযুক্তিতে স্বাবলম্বী হওয়ার দিকে ঠেলে দিয়েছে। অতীতে উদ্ধার হওয়া মার্কিন ‘হক’ ক্ষেপণাস্ত্রের আদলে নিজস্ব সংস্করণ তৈরি কিংবা আটক করা পশ্চিমা ড্রোনের অনুকরণে নিজস্ব ড্রোন তৈরি এর অন্যতম উদাহরণ। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রতীকী ঘটনা ছিল ২০১১ সালে মার্কিন আরকিউ-১৭০ স্টিলথ ড্রোন জব্দ করা, যা ইরানের নিজস্ব মহাকাশ ও প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির অগ্রযাত্রায় একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেশটির কর্মকর্তারা বারবার উল্লেখ করে থাকেন।

তবে এবার এই ধারার ব্যাপকতা এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট একেবারেই আলাদা। এবারের বার্তাটি কেবল প্রযুক্তিগত অভিযোজন নয়, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে শত্রুপক্ষকে কঠোর বার্তা দেওয়ার এক কৌশলও বটে।

ইরানের ভূগর্ভস্থ মিসাইল সিটি

কট্টরপন্থি শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিরা এই রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের বিষয়টিকে সরাসরি ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণের সঙ্গে যুক্ত করছেন। কট্টর রক্ষণশীল দৈনিক কায়হান-এর প্রধান সম্পাদক হোসেইন শরীয়তমার্দারি ইরানকে এই প্রযুক্তিগুলোর রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং সম্পন্ন করার এবং সেই প্রযুক্তি চীন ও রাশিয়ার মতো দেশগুলোর সঙ্গে বিনিময় করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সংগৃহীত এসব অস্ত্র ব্যবস্থা অন্যান্য দেশের সঙ্গে বৃহত্তর কৌশলগত অংশীদারত্বের ক্ষেত্রে ইরানের দর-কষাকষির শক্তি বাড়াবে।

তিনি আরও দাবি করেন যে, সংঘাতের সময় টমাহক এবং এজিএম-১৫৮ ক্ষেপণাস্ত্রসহ এমকিউ-৯ ড্রোনের মতো উন্নত মার্কিন অস্ত্র ব্যবস্থাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে ব্যর্থ হয়েছে, যা পশ্চিমা সামরিক প্রযুক্তির দুর্বলতাকেই প্রমাণ করে।

ইরানের পক্ষ থেকে রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের এই দাবির পাশাপাশি এ অঞ্চলে মার্কিন লক্ষ্যবস্তুর ওপর হামলা এবং তাদের নিজস্ব সামরিক প্রস্তুতির বিভিন্ন খবরও সামনে আসছে।

মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে এনবিসি নিউজ জানিয়েছে, ইরান এই যুদ্ধবিরতির সময়কালকে কাজে লাগিয়ে মাটির নিচের গোপন গুদাম এবং মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ধ্বংসাবশেষ থেকে অবিস্ফোরিত ক্ষেপণাস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধারের কাজ করছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তেহরান ভবিষ্যতে পুনরায় সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কায় তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা দ্রুত পুনরুদ্ধার করার চেষ্টা চালাচ্ছে।

অন্যদিকে, ইরানের সামরিক কর্মকর্তারাও এই যুদ্ধবিরতির সময়কালকে যুদ্ধেরই একটি অংশ হিসেবে বিবেচনা করছেন। টেলিভিশনে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনীর মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ আকরামিনিয়া নিশ্চিত করেছেন যে, ইরানের এফ-৫ যুদ্ধবিমান উপসাগরীয় অঞ্চলে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে সফলভাবে হামলা চালিয়েছে। তিনি কুয়েতের ক্যাম্প বুহরিং-এ হামলার বিষয়ে এনবিসি-র আগের একটি প্রতিবেদনের সূত্র ধরে এই কথা বলেন। তিনি এই অভিযানকে অত্যন্ত সফল ও বিরল বলে বর্ণনা করেছেন।

সেনাবাহিনীর এই জেনারেল সরাসরি উল্লেখ করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি মূলত একটি চলমান ‘যুদ্ধাবস্থা’ এবং নতুন করে কোনও আগ্রাসন চালানো হলে ইরান ‘নতুন সরঞ্জাম নিয়ে এবং নতুন ফ্রন্ট থেকে’ সেটির জবাব দেবে।

ইরানি ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত

কর্মকর্তা ও বিশ্লেষকদের মতে, নিষেধাজ্ঞা ও আন্তর্জাতিক বিচ্ছিন্নতা ইরানকে এক দীর্ঘস্থায়ী উদ্ভাবনের মডেল তৈরি করতে বাধ্য করেছে; যেখানে বিদেশি অস্ত্র কেবল গবেষণাই করা হয় না, বরং তা দেশটির নিজস্ব উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। তেহরান পৌরসভার একজন কর্মকর্তা এহসান খরামিদ এই প্রক্রিয়াকে ‘প্রযুক্তির উৎকর্ষের যুদ্ধের শুরু’ বলে বর্ণনা করেছেন। তিনি মনে করেন, উদ্ধার করা এসব অস্ত্র ব্যবস্থা পশ্চিমা সামরিক প্রযুক্তির ‘গোপন স্তর’ উন্মোচন করতে সহায়তা করবে।

ইরান কেবল শত্রুর অস্ত্র ব্যবস্থাপনাই বিশ্লেষণ করছে না, বরং সংঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া তাদের নিজেদের সামরিক সক্ষমতাও সক্রিয়ভাবে পুনরুদ্ধার করছে।

এদিকে ইরানি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, সেনাবাহিনীর বোম ডিসপোজাল ইউনিট তেহরানের দক্ষিণাঞ্চলে একটি এজিএম-১৫৪ জেএসওডব্লিউ গ্লাইড বোমা সফলভাবে নিষ্ক্রিয় করেছে। এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে দেশটির বিভিন্ন স্থানে এখনও অস্ত্র উদ্ধার ও নিষ্ক্রিয়করণের কাজ চলছে।

এসব ঘটনাপ্রবাহ ইঙ্গিত দেয় যে, ইরান এই যুদ্ধবিরতিকে তাদের সামরিক শক্তি সুসংহত করার এক সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে।

ইরানি সামরিক বাহিনীর দেওয়া বিবৃতি অনুযায়ী, মাটির নিচের গোপন ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থাগুলো পুনরায় সচল করা হচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত লঞ্চারগুলো মেরামত করা হচ্ছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সামরিক বাহিনীকে নতুন করে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। তবে ইরানি কর্মকর্তারা এই ঘটনাগুলোকে তাদের প্রতিরোধ ক্ষমতার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরলেও, এর পেছনের মূল পরিস্থিতি বেশ জটিল।

একদিকে যেমন নিষেধাজ্ঞা ও সামরিক চাপের মুখে এই রিভার্স ইঞ্জিনিয়ারিং ও অস্ত্র পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াটি ইরানের দীর্ঘদিনের পুরোনো যুদ্ধকৌশলেরই প্রতিফলন। অন্যদিকে ‘যুদ্ধাবস্থা’ বজায় থাকার প্রকাশ্য ঘোষণা ইঙ্গিত দেয় যে, তাদের সামগ্রিক কৌশলে শত্রুকে আটকে রাখার মনোভাবই এখনও সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে।

যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে তেহরানের এই দ্বিমুখী অবস্থানই এখন সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। এতে একই সঙ্গে সামরিক পুনর্গঠন ও যুদ্ধের হুঁশিয়ারি দুটোই সমানতালে চলছে।

এর ফল এমন এক সামরিক পরিবেশ তৈরি করছে যেখানে যুদ্ধবিরতি মানেই উত্তেজনা প্রশমন নয়; বরং এটি হলো নতুন করে সামরিক শক্তি ও কৌশলের পুনর্বিন্যাস। সূত্র: আল মনিটর

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়