শিরোনাম
◈ মন্ত্রিসভা থেকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগের নির্দেশ নিয়ে ধোঁয়া ◈ নারী টি-টোয়েন্টিতে বাংলা‌দেশ দলের নতুন অধিনায়ক নাহিদা আক্তার ◈ পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সীমান্তে পরিস্থিতি হঠাৎ করেই খুব উত্তপ্ত, দফায় দফায় সংঘর্ষ ◈ ঢাকা থেকে ১১৮ ফ্লাইট বাতিল, আটকা ১৮৩৬২ যাত্রী ◈ দেশকে স্বাধীন করার জন্য, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা যেমন ধর্ম দেখিনি, জাত দেখিনি: তারেক রহমান ◈ একটি উদ্যোগ, একটু চেষ্টা, এনে দেবে সচ্ছলতা, দেশে আসবে স্বনির্ভরতা: প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ◈ ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো বাংলাদেশের ফুটবল নিয়ে আশাবাদী, জানালেন পরিকল্পনা ◈ প্রশাসনে সচিব পদমর্যাদার ১০ কর্মকর্তাকে দপ্তর বদল ও পদায়ন করেছে সরকার, কে কোথায় গেলেন ◈ যুক্তরাষ্ট্র প্রস্তাব মেনে নিলে সাত দিনের মধ্যেই হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া সম্ভব ◈ যাত্রীশূন্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, এমন রূপ কেউ কখনও দেখেননি আগে (ভিডিও)

প্রকাশিত : ২২ মার্চ, ২০২৬, ১২:২০ রাত
আপডেট : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিশাল সিঙ্কহোলের দাপটে আতঙ্কে তুরস্কের কৃষকরা, বিপর্যস্ত কৃষিজমি, ঘরবাড়ি তলিয়ে যাওয়ার ভয়

৪৭ বছর বয়সী ফাতিহ সিক তাঁর বন্ধুদের সঙ্গে নিজের বাড়িতে বসে চা খাচ্ছিলেন। হঠাৎ বাইরে থেকে ভেসে এল অদ্ভুত এক গোঙানির শব্দ। মুহূর্তেই তা বিকট আওয়াজে রূপ নিল, যেন পাশের কোথাও আগ্নেয়গিরির উদ্গিরণ শুরু হয়েছে। জানালা দিয়ে বাইরে তাকাতেই ফাতিহর চোখ চড়কগাছ। মাত্র ১০০ মিটার দূরে মাটি ফুঁড়ে আকাশ সমান উচ্চতায় কাদা আর পানি ছিটকে উঠছে! অনুবাদ: টিবিএস

তুরস্কের কনিয়া প্রদেশের কারাপিনার এলাকায় এটি এখন পরিচিত দৃশ্য। বিশাল কৃষিজমির কারণে এলাকাটি 'তুরস্কের রুটির ঝুড়ি' বা শস্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত। ফাতিহর জমিতে তৈরি হওয়া এই বিশাল গর্ত বা 'সিঙ্কহোল' চওড়ায় ৫০ মিটার আর গভীরতায় প্রায় ৪০ মিটার। ঠিক এক বছর আগে একই সময়ে তাঁর জমিতে আরেকটি সিঙ্কহোল তৈরি হয়েছিল।

নিজের পৈতৃক ভিটায় বেড়ে ওঠা ফাতিহ এখন দিশেহারা। বিজ্ঞানীরা বলছেন, এই এলাকা এখন আর বসবাসের উপযোগী নেই। এরই মধ্যে পাশের একটি বাড়ি মাটির নিচে ধসে পড়েছে। আতঙ্কে দিন কাটানো ফাতিহ বলেন, 'রাতে ঘুমানোর আগে প্রার্থনা করি, সকালে উঠে আবারও করি। সারাক্ষণ এই ভয়ে থাকি যে কখন আমার বাড়িটাও মাটির নিচে চলে যায়।'

মরুভূমি হওয়ার পথে প্রাচীন শস্যভূমি

Advertisement

তুরস্কের কনিয়া অঞ্চলটি এক সময় ছিল অত্যন্ত উর্বর। খ্রিস্টপূর্ব আট হাজার বছর আগে এখানেই গড়ে উঠেছিল বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন কৃষিভিত্তিক সভ্যতা 'চাতালহুইউক'। প্রাচীন রোমান ও হিত্তীয়দের অসংখ্য পবিত্র ঝরনা আর পানির আধার ছিল এখানে। এমনকি রেশম পথ বা সিল্ক রোডের ব্যবসায়ীদের কাছেও তৃষ্ণা মেটানোর প্রধান ভরসা ছিল এই অঞ্চল।

কিন্তু সেই সমৃদ্ধ ইতিহাস এখন ফিকে হয়ে আসছে। আবহাওয়া পরিবর্তনের প্রভাবে তুরস্ক এখন ভয়াবহ খরা সংকটের মুখে। দেশটির প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা মরুভূমি হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। মাটির নিচের পানি আশঙ্কাজনকভাবে কমে যাওয়ায় ভূগর্ভে তৈরি হচ্ছে বড় বড় শূন্যস্থান, আর তাতেই ধসে পড়ছে ওপরের মাটি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই অঞ্চলে এখন পর্যন্ত ছোট-বড় প্রায় ৭০০টি সিঙ্কহোল বা গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এই বিশাল গর্তগুলো কেবল কৃষিজমিই নষ্ট করছে না, বরং হাজার হাজার বছর ধরে টিকে থাকা জনপদকে ঠেলে দিচ্ছে এক অনিশ্চিত ভবিশ্যতের দিকে।

তুরস্কের কনিয়া টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটির ভূতত্ত্বের অধ্যাপক ফেতুল্লাহ আরিক এই মাটির নিচের বিশাল গর্ত নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করছেন। তাঁর মতে, সংকটের মূলে রয়েছে আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসা বৃষ্টিপাত আর ভূগর্ভস্থ পানি। পানির অভাবে স্থানীয় কৃষকেরা সেচের জন্য আগের চেয়ে অনেক বেশি গভীর নলকূপ খুঁড়ছেন। এতে মাটির নিচের পানির স্তর আরও নিচে নেমে যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে ভয়াবহ করে তুলছে।

ভৌগোলিকভাবেই কনিয়া অঞ্চলটি সিঙ্কহোলপ্রবণ। কারণ, এখানকার মাটির নিচে রয়েছে প্রচুর চুনাপাথর ও অন্যান্য দ্রবণীয় শিলা। কয়েক দশক ধরে মাত্রাতিরিক্ত সেচের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির যে আস্তর মাটিকে ধরে রাখত, তা এখন শূন্য হয়ে পড়েছে। ফলে ওপরের মাটির ভার সইতে না পেরে তৈরি হচ্ছে এসব গভীর গর্ত। 

নিজের অফিসের দেয়ালে মানচিত্রের দিকে আঙুল তুলে অধ্যাপক আরিক বলেন, 'সারা বিশ্বের মধ্যে কনিয়াতেই এখন সিঙ্কহোলের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশি। গত দুই বছরে এই হার অবিশ্বাস্যভাবে বেড়েছে।'

হারিয়ে যাচ্ছে হ্রদ, বাড়ছে খরা

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে যে বিপর্যয় এক সময় ধীরগতিতে আসছিল, তা এখন অতি দ্রুত জনপদকে গ্রাস করছে। গত বছর তুরস্কে রেকর্ড তাপমাত্রা আর কম বৃষ্টিপাত হয়েছে। স্থানীয় জেলে ও কৃষকেরা জানিয়েছেন, নজিরবিহীনভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে চারপাশ। গত ৬০ বছরে এই অঞ্চলের ২৪০টি হ্রদের মধ্যে ১৮৬টিই পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।

কৃষক ফাতিহ সিক এক সময় বসন্তে একবার আর গ্রীষ্মে দুবার সেচ দিতেন। এখন বৃষ্টি না হওয়ায় তাঁকে ১০ বার পানি দিতে হয়। তিনি বলেন, '১০ বছর আগে মাত্র ৩০ মিটার গভীরেই পানি পাওয়া যেত, এখন ৯০ মিটার খুঁড়েও পানি মিলছে না।'

ফাতিহর বাড়ির আশপাশেই প্রায় ১০০টি সিঙ্কহোল তৈরি হয়েছে। তাঁর নিজের একটি বিটক্ষেত এই গর্তে তলিয়ে যাওয়ায় বছরে কয়েক হাজার পাউন্ডের লোকসান হচ্ছে। এই গর্তগুলো বালু দিয়ে ভরাট করে চাষযোগ্য করতে যে বিপুল খরচ, তা ফাতিহর সাধ্যের বাইরে। 

ফাতিহ বলেন, 'আমিই হয়তো আমার বংশের শেষ কৃষক। আমি আমার সন্তানদের এই পেশায় আনিনি। ওদের নার্সিং আর দন্তচিকিৎসা পড়তে পাঠিয়েছি।'

কনিয়ার কৃষকেরা মূলত ভুট্টা, গম ও সুগারবিটের মতো প্রচুর পানি লাগে—এমন ফসল চাষ করেন। তবে এই সংকট থেকে বাঁচার পথ দেখাচ্ছেন কেউ কেউ। মাহমুদ শেনিউজ নামের একজন কৃষক তাঁর সমবায় সমিতির মাধ্যমে এই অঞ্চলে ফের 'হেম্প' ফসল চাষ শুরু করেছেন। যেখানে ভুট্টা চাষে মৌসুমে ১০ বার সেচ দিতে হয়, সেখানে হেম্প চাষে মাত্র তিনবার পানি দিলেই চলে।

অন্যদিকে, ডক্টর ইসি অনুর প্রাচীন এক পদ্ধতি 'ড্রাই ফার্মিং' পুনরুজ্জীবিত করছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতা ছেড়ে তিনি পৈতৃক ভিটায় ফিরে গড়ে তুলেছেন নারী সমবায় সমিতি। এই পদ্ধতিতে কোনো ধরনের সেচ ছাড়াই মাটির আর্দ্রতা ব্যবহার করে চাষ করা হয়। তিনি গোলাপ ও বিভিন্ন ওষুধি গাছ চাষ করছেন, যা তুরস্কের ভবিষ্যতের জন্য অত্যন্ত কার্যকর হতে পারে।

ইসি অনুর বিশ্বাস, 'মাটি একটি জীবন্ত সত্তা। এই সংকট সমাধানের একমাত্র উপায় হলো প্রকৃতির ওপর জবরদস্তি বন্ধ করা। আমাদের উচিত প্রকৃতির নিয়ম অনুকরণ করা, প্রকৃতিকে জয় করার চেষ্টা করা নয়।'

  • সর্বশেষ