ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের ছাপ পড়েছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে চীন ধীরে ধীরে ঢাকায় তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব জোরদার করছে, আর ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বাংলাদেশের কূটনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
ভারতের সঙ্গে টানাপোড়েন এবং শেখ হাসিনার ক্ষমতা হারানোর পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তনের ছাপ দেখা যাচ্ছে। আসন্ন জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে চীন ধীরে ধীরে ঢাকায় তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব জোরদার করছে। একই সময়ে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই বিশ্লেষণটি ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স সোমবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে তুলে ধরেছে।
রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। নির্বাচনের শীর্ষ দুই প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক শেখ হাসিনার শাসনামলের মতো ঘনিষ্ঠ নয়। টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকার পর আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ হয়েছে, আর শেখ হাসিনা বর্তমানে ভারতে স্বেচ্ছা নির্বাসনে রয়েছেন।
এই সুযোগে চীন ঢাকায় তার কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক তৎপরতা জোরদার করেছে। সম্প্রতি ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় একটি ড্রোন কারখানা স্থাপনের জন্য বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি করেছে বেইজিং। ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন নিয়মিতভাবে বাংলাদেশি রাজনীতিক, কর্মকর্তা ও বিভিন্ন মহলের সঙ্গে বৈঠক করছেন। এসব আলোচনায় অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্পে বহু বিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগের বিষয় উঠে আসছে।
এদিকে, শেখ হাসিনাকে আশ্রয় দেওয়ার কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠেছে। অন্তর্বর্তী সরকার তাঁর প্রত্যর্পণ চেয়েছিল, কিন্তু ভারত তা মানেনি। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে ক্রিকেটসহ বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রকাশ পেয়েছে।
রয়টার্স প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আসন্ন নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একে অপরকে বিদেশি শক্তির ঘনিষ্ঠতার অভিযোগ দিচ্ছে। জামায়াত বিএনপিকে ভারতের কাছাকাছি অবস্থানে আনে, আর বিএনপি জামায়াতকে পাকিস্তানের সঙ্গে অতীত সম্পর্কের দায়ে অভিহিত করছে। সম্প্রতি সমাবেশে তারেক রহমান বলেন, “দিল্লি নয়, পিণ্ডি নয়-সবার আগে বাংলাদেশ।”
ভারতের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, আগামী সরকার যেই হোক, তার সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে দিল্লিকে, তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। চীন দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার, যেখানে বার্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১৮ বিলিয়ন ডলার, যার ৯৫ শতাংশ চীনা পণ্য। শেখ হাসিনার পতনের পর চীনা কোম্পানি শত শত মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে, যেখানে ভারতের বড় প্রতিষ্ঠান নতুন চুক্তি করতে পারছে না।
নয়াদিল্লিভিত্তিক থিংকট্যাংক সিএসইপি-এর সিনিয়র ফেলো কনস্টান্টিনো জাভিয়ার বলেন, ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংকটকে কাজে লাগিয়ে চীন প্রকাশ্যে ও নীরবে তার প্রভাব বাড়াচ্ছে এবং নিজেকে আরও নির্ভরযোগ্য অর্থনৈতিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছে।
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, চীনের বড় প্রণোদনা এবং সংখ্যালঘু ইস্যুতে না জড়ানোর কারণে এটি ঢাকার কাছে আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলেও ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হবে না। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমিন মন্তব্য করেন, বাংলাদেশের চীন ও ভারত-দু’ দেশই দরকার। বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া কোনও উপায় নেই। যে দলই ক্ষমতায় আসুক, তারা ভারতকে উপেক্ষা করার মতো অবিবেচক হবে না।
ভারত তিন দিক থেকে বাংলাদেশকে ঘিরে রেখেছে এবং বঙ্গোপসাগরের মাধ্যমে সমুদ্রপথেও অবস্থান করছে। বাণিজ্য, ট্রানজিট ও নিরাপত্তা সহযোগিতায় বাংলাদেশ ভারতের ওপর নির্ভরশীল, আর সীমান্ত ব্যবস্থাপনার জন্য ভারতেরও ঢাকার সঙ্গে স্থিতিশীল সম্পর্ক প্রয়োজন। রাজনৈতিক টানাপোড়েন সত্ত্বেও দুই দেশের বার্ষিক বাণিজ্য প্রায় ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে স্থিতিশীল রয়েছে। এমনকি বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলায় আদানি গ্রুপ সম্প্রতি বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বাড়িয়েছে, যদিও চুক্তির উচ্চমূল্য নিয়ে সমালোচনা হয়েছে।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভারতের ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও পানি বণ্টন, সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং শেখ হাসিনার শাসনকে সমর্থনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ তৈরি করেছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ভারতের ‘আধিপত্যবাদী’ ভূমিকা নিয়ে অসন্তোষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাহিদ ইসলাম বলেন, এটি শুধু নির্বাচনী বক্তব্য নয়। তরুণদের কাছে ভারতের আধিপত্য একটি বড় ইস্যু, এটাই এই নির্বাচনের অন্যতম প্রধান বিষয়।