শিরোনাম
◈ অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে রাষ্ট্র পুনর্গঠনের কাজে হাত দিবে বিএনপি: তারেক রহমান ◈ ভোটকেন্দ্রে মোবাইল ফোন নিষিদ্ধের বিষয়ে জামায়াত আমিরের কড়া বার্তা ◈ লিভারপুলের বিরু‌দ্ধে ম‌্যান‌চেস্টার সি‌টির ক‌ষ্টের জয়  ◈ তিনমুখী সংকটের মাঝেও কড়া মুদ্রানীতিতেই অটল বাংলাদেশ ব্যাংক ◈ বিবিসির দৃষ্টিতে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক: কেন তলানিতে দুই দেশের বন্ধন ◈ যেসব কারণে বাতিল হতে পারে ভোট: কী বলে নির্বাচন আইন ◈ নির্বাচনের ফল কবে প্রকাশ হবে জানাল নির্বাচন কমিশন ◈ বিশ্বের প্রথম জেন–জি অনুপ্রাণিত নির্বাচন হচ্ছে বাংলাদেশে, ভারতের প্রভাব কমছে চীনের বাড়ছে ◈ ইরানের পারমাণু ইস্যুতে ভূমিকা রাখতে ইউরোপ কেন হিমশিম খাচ্ছে ? ◈ অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার দেড় বছরে ‌দে‌শের অর্থনীতি কতটা পাল্টালো?

প্রকাশিত : ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১২:১৯ দুপুর
আপডেট : ০৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০২:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিবিসির দৃষ্টিতে ভারত–বাংলাদেশ সম্পর্ক: কেন তলানিতে দুই দেশের বন্ধন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালগুলো আবার চিৎকার করছে। দেয়াল আর করিডর জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে ক্ষুব্ধ, সুতীক্ষ্ণ, কখনো কখনো কাব্যিক গ্রাফিতি। এগুলো ২০২৪ সালের জুলাইয়ের সেই জেন-জি নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানের প্রতিধ্বনি। ওই অভ্যুত্থান টানা ১৫ বছর ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনাকে ক্ষমতাচ্যুত করে। একসময় বাংলাদেশের গণতন্ত্রপন্থী প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হলেও সমালোচকদের মতে শেষদিকে তিনি ক্রমশ স্বৈরাচারী হয়ে উঠেছিলেন। পদত্যাগের পর তিনি ভারতে পালিয়ে যান।

এখন ছোট ছোট দলে ছাত্ররা জড়ো হয়ে রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করছে। অগোছালো এক লনে দোল খাচ্ছে লাল লণ্ঠন-চীনা নববর্ষের এক ছোট্ট উদযাপন। তুচ্ছ মনে হলেও এটি তাৎপর্যপূর্ণ; কারণ বাংলাদেশে প্রভাব বিস্তারের লড়াইয়ে বেইজিং ও দিল্লি দু’পক্ষই এখন সক্রিয়। এখানে অনেক তরুণের জন্য ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচন হবে জীবনের প্রথম সত্যিকারের ব্যালটের মুখোমুখি হওয়া।

শেখ হাসিনার পতনের কয়েক দিনের মধ্যেই দায়িত্ব নেন নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস। হাসিনা এখন দিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। ২০২৪ সালে তার সরকারের সময় ভয়াবহ নিরাপত্তা অভিযানে জাতিসংঘের মতে প্রায় ১৪০০ মানুষ নিহত হন। তাদের বেশির ভাগই নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে নিহত হয়েছেন। তার অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলেও ভারত তাকে ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

বাংলাদেশের সবচেয়ে পুরোনো দল আওয়ামী লীগ। তারা একসময় প্রায় ৩০ শতাংশ জনপ্রিয় ভোট পেত। এবার নির্বাচনে অংশ নিতে পারছে না। 

বিশ্লেষকদের মতে, এই শূন্যস্থান দখলের চেষ্টা করছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। তারা এখন নিজেদেরকে উদার-মধ্যপন্থী পরিসরে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছে। প্রধান ইসলামপন্থী দল জামায়াতে ইসলামী যুক্ত হয়েছে ছাত্র আন্দোলন থেকে জন্ম নেয়া এক নতুন দলের সঙ্গে।

কিন্তু ক্যাম্পাসে এবং তার বাইরেও স্লোগানগুলো শুধু দেশের ভেতরের গণতন্ত্র নিয়েই নয়। সেগুলো ক্রমশ সীমান্তের ওপারেও আঙুল তুলছে। ‘ঢাকা, দিল্লি নয়’-এই বাক্যটি দেয়ালে আঁকা। এমনকি শাড়িতেও সেলাই করা। বাংলাদেশের ওপর ভারতের দীর্ঘ ছায়ার প্রতিশব্দ হিসেবে তরুণদের মুখে এখন ‘হেজেমনি’ শব্দটি নিত্যদিনের উচ্চারিত হয়। 

সমাজবিজ্ঞান বিভাগের ২৪ বছর বয়সী ছাত্র মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘তরুণ প্রজন্ম মনে করে ভারত বহু বছর ধরে আমাদের দেশে হস্তক্ষেপ করে আসছে। বিশেষ করে ২০১৪ সালের নির্বাচনের পর, যেটা কার্যত একদলীয় নির্বাচন ছিল।’

মারাত্মকভাবে ভারতবিরোধী মনোভাব বৃদ্ধির কেন্দ্রে রয়েছে এই অভিযোগ যে, বাংলাদেশের গণতন্ত্র ক্ষয়ের পেছনে দায়ী দিল্লির ভূমিকা-ই। এর ফলাফল: একসময় প্রতিবেশী কূটনীতির ‘মডেল’ হিসেবে প্রশংসিত ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক এখন কয়েক দশকের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায়।

লন্ডনের এসওএএস বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও আন্তর্জাতিক অধ্যয়ন বিভাগের শিক্ষক অবিনাশ পালিওয়াল বলেন, বাংলাদেশে গভীর ভারতবিরোধী মনোভাব এবং ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আলোচনায় প্রতিবেশীদের প্রতি ক্রমশ কঠোর ও অনেক সময় বৈরী ভাষা-এই দুইয়ের কারণেই দিল্লি এখন ঢাকায় বড় ধরনের সমস্যায় পড়েছে।

অনেকে দিল্লিকে দোষারোপ করেন শেখ হাসিনার শেষ বছরগুলোতে তার ক্রমবর্ধমান স্বৈরশাসনকে সমর্থন করার জন্য। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচনগুলো এবং সেগুলোর প্রতি ভারতের ‘সমর্থন’ আজও স্মরণ করা হয়। মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘ভারত কোনো প্রশ্ন ছাড়াই হাসিনার শাসনকে সমর্থন করেছে। মানুষ মনে করে গণতন্ত্র ধ্বংসের পেছনে ভারতের সমর্থন ছিল।’
এই বিশ্বাসের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে পুরোনো ক্ষোভ। তার মধ্যে আছে সীমান্তে হত্যা, পানি বণ্টন নিয়ে বিরোধ, বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতা, ভারতীয় রাজনীতিবিদ ও টিভি স্টুডিও থেকে ছড়ানো উসকানিমূলক বক্তব্য। ফলে জন্ম নিয়েছে আরও ক্ষয়কারী এক ধারণা: ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম সমান রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি অনুগত ‘পিছনের উঠান’ হিসেবে দেখে।

স্থানীয় গণমাধ্যমে খবর ছড়িয়েছে-বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহকারী এক ভারতীয় করপোরেট গোষ্ঠী দেশটির সঙ্গে প্রতারণা করছে; যদিও প্রতিষ্ঠানটি তা অস্বীকার করেছে। ফেসবুকে-যা রাজনৈতিক সংগঠনের প্রধান মঞ্চ-একটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিককে ‘ভারতের এজেন্ট’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার দাবিতে প্রচারণা চলছে। দুই দেশই অধিকাংশ ভিসা পরিষেবা স্থগিত করেছে।

একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে আইপিএলে খেলতে না দেয়া এবং টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের বাংলাদেশের ম্যাচ ভারত থেকে শ্রীলঙ্কায় সরাতে অস্বীকৃতি এসবও ক্ষোভ বাড়িয়েছে। পালিওয়াল বলেন, নিশ্চিতভাবেই ভারতের বাংলাদেশের সব পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু বর্তমান রাজনৈতিক পরিবেশে সেই যোগাযোগকে ইতিবাচক রাজনৈতিক ফলাফলে রূপ দেয়া কঠিন।
ভারত এখন কৌশল বদলানোর চেষ্টা করছে। গত মাসে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর ঢাকায় আসেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির প্রয়াত নেত্রী খালেদা জিয়ার জানাজায় অংশ নিতে। সেখানে ওই সময় দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন। ১৭ বছর লন্ডনে নির্বাসিত থাকার পর দেশে ফেরা ৬০ বছর বয়সী রহমান আসন্ন নির্বাচনে সবচেয়ে এগিয়ে থাকা প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত।

ভারত ইসলামপন্থী শক্তির সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছে। জামায়াতে ইসলামীর এক জ্যেষ্ঠ নেতা জানান, গত এক বছরে ভারতীয় কর্মকর্তারা চারবার দলের নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এমনকি ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের প্রজাতন্ত্র দিবসের সংবর্ধনাতেও তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। তবু এসব কৌশলগত পদক্ষেপ সামগ্রিক অবনতি থামাতে পারেনি। ডেইলি স্টারের উপদেষ্টা সম্পাদক কামাল আহমেদ বলেন, ‘দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিহাসে এটি সবচেয়ে নিচের পর্যায়। শেখ হাসিনার সময়ের সঙ্গে বর্তমান অবস্থার পার্থক্য স্পষ্ট। 

১৭ বছরে ঢাকা ভারতের জন্য ‘প্রায় সব দরজা খুলে দিয়েছিল’। এর মধ্যে আছে নিরাপত্তা সহযোগিতা, ট্রানজিট, বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক বিনিময়, মানুষে-মানুষে যোগাযোগ। কামাল আহমেদের ভাষায়, আজ কিছুই এগোচ্ছে না-না মানুষ, না সদিচ্ছা।

বিশেষ ক্ষোভ তৈরি হয় হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর ভারতের প্রতিক্রিয়ায়। অনেক বাংলাদেশি আশা করেছিলেন, ভারত একদলকেন্দ্রিক নীতি থেকে সরে আসবে। বরং হাসিনাকে আশ্রয় দেয়া ও ভিসা-বাণিজ্য কড়াকড়ি বৃদ্ধির যে বার্তা তাতে এমন আভাস দেয়া হয়েছে যে, বাংলাদেশিদের প্রতিবেশী হিসেবে মূল্য দেয়া হচ্ছে না।

ভারতীয় রাজনীতিবিদদের বক্তব্য পরিস্থিতি আরও খারাপ করেছে। কামাল আহমেদ প্রশ্ন করেন, যখন বাংলাদেশি অভিবাসীদের ‘উইপোকা’ বলা হয়, বা বলা হয় গাজায় ইসরাইল যা করেছে, তেমন শিক্ষা দেয়া হবে-তখন মানুষ কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? এর জবাবে এসেছে সাংস্কৃতিক প্রতিক্রিয়া-ভারতীয় পণ্য বয়কট, আইপিএল সম্প্রচার বন্ধের মাধ্যমে। তিনি বলেন, সংস্কৃতি, বাণিজ্য, সম্মান-কিছুই একমুখী নয়। 

তবে ঢাকার কর্মকর্তারা সম্পর্ককে শুধু সংকটের চশমায় দেখতে নারাজ। ড. ইউনূসের প্রেস সচিব শফিকুল আলম বলেন, সম্পর্ক ‘বহুমাত্রিক’- ৫৪টি অভিন্ন নদী, ভাষা, ইতিহাস, ৪০৯৬ কিলোমিটার সীমান্ত। তবু তিনি স্বীকার করেন, জনমত কঠোর হয়েছে। তার ভাষায়, মানুষ বলে-১৫ বছর ভোট দিতে পারিনি কেন? হাসিনার স্বৈরতন্ত্র এবং ভারতের সমর্থনের জন্য। 

২০২৪ সালের সহিংসতার পর হাসিনার ভারতে পালানো বিষয়টি বিশেষভাবে ক্ষত সৃষ্টি করেছে। শফিকুল আলম আরও বলেন, শত শত তরুণ নিহত হলো। তারপর তিনি ভারতে পালালেন। 
ভারতীয় গণমাধ্যমের সংখ্যালঘু নির্যাতন সংক্রান্ত প্রতিবেদনকে তিনি ‘ব্যাপক ভ্রান্ত তথ্য প্রচার’ বলে আখ্যা দেন। ভারত অবশ্য বলছে, ২,৯০০-এর বেশি সহিংস ঘটনার নথি রয়েছে। ড. ইউনূসের বিশেষ সহকারী ড. আলী রীয়াজ মনে করেন, সমস্যা কেবল ভুল বোঝাবুঝি নয়। এটা একেবারে তলানিতে পৌঁঁছেছে। সম্পর্কটি ধীরে ধীরে ‘রাষ্ট্র থেকে ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক সম্পর্কে’ পরিণত হয়েছিল।

পানি বণ্টন ও সীমান্ত হত্যা এই অসমতাকে আরও বাড়িয়েছে। আলী রীয়াজ বলেন, যদি আপনি পানি নিয়ন্ত্রণ করেন, সম্পর্ক সঙ্গে সঙ্গে অসম হয়ে যায়। 

রাষ্ট্রীয় টানাপোড়েন এখন অর্থনীতিতেও ছড়াচ্ছে। ১৩.৫ বিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য আরও বাড়তে পারত, বলে মনে করেন সিপিডির ফাহমিদা খাতুন। তবু এই বৈরিতা সব সময় একরকম নয়। ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ভারত (শব্দাটা) শুনলেই শত্রু মনে হয়। কিন্তু মানুষে-মানুষে (সম্পর্কের) বিষয়টা এমন নয়।

নির্বাচনী প্রচারে ভারতবিরোধিতা তুলনামূলকভাবে কম। কারণ সবাই জানে, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠন অনিবার্য। পালিওয়াল বলেন, এটা কেবল কূটনৈতিক শীতলতা নয়, আবার পুরোপুরি বিচ্ছেদও নয়। ভূগোল, ইতিহাস ও সংস্কৃতি- ভারত ও বাংলাদেশ একে অন্যকে উপেক্ষা করতে পারে না।

সূত্র: মানবজমিন

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়