রয়টার্সের বিশ্লেষণ: বাংলাদেশে আগামী বৃহস্পতিবার (১২ ফেব্রুয়ারি) দেশের প্রথম জেন-জি অনুপ্রাণিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। যা ২০০৯ সালের পর সবচেয়ে প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে বিরোধী দলগুলো প্রায় কার্যকরী ছিল না। কখনও ভোট বর্জন, কখনও শীর্ষ নেতাদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে তাদের দমন করা হতো। তবে এবার পরিস্থিতি পুরোপুরি ভিন্ন। ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে প্রতিবেদনে এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেছে।
তারা আরও লিখেছে, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবার ব্যাপকভাবে বিজয়ী হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যদিও ইসলামপন্থী জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন একটি জোট শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছে। ৩০ বছরের নিচে বয়সী জেন-জি কর্মীদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি নতুন দল, শেখ হাসিনাবিরোধী রাজপথের আন্দোলনকে নির্বাচনী ভিত্তিতে রূপ দিতে গিয়ে জামায়াতের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়েছে। বিএনপি প্রধান তারেক রহমান রয়টার্সকে বলেন, তার দল সংসদের ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯২টিতে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে এবং তারা ‘সরকার গঠনের জন্য যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা’ পাওয়ার ব্যাপারে আত্মবিশ্বাসী।
বিশ্লেষকদের মতে, ‘ফ্যাকচারড’ ফলাফলের বদলে ১২ই ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে একটি স্পষ্ট রায় পাওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পর টানা কয়েক মাসের অস্থিরতায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ মানুষের এই দেশে বড় শিল্প, বিশেষ করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক খাত ব্যাহত হয়েছে। এই নির্বাচনের ফল দক্ষিণ এশিয়ার দেশটিতে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি চীন ও ভারতের ভূমিকার ওপরও প্রভাব ফেলবে।
ঢাকার সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের নির্বাহী পরিচালক ও সহকারী অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী বলেন, মতামত জরিপগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে বিএনপি এগিয়ে আছে। তবে মনে রাখতে হবে, ভোটারদের একটি বড় অংশ এখনও সিদ্ধান্তহীন। তিনি বলেন, ফলাফল নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ হবে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হলো জেনারেশন জি, যারা মোট ভোটারের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। তাদের ভোটের সিদ্ধান্তের ওজন অনেক বেশি।
সারা বাংলাদেশে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ এবং জামায়াতের ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকযুক্ত সাদা-কালো পোস্টার ও ব্যানারের খুঁটি, গাছ আর সড়কের পাশের দেয়ালে ঝুলছে। পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থীর পোস্টারও। রাস্তার মোড়ে মোড়ে দলীয় অস্থায়ী কার্যালয়গুলোতে প্রতীক টানানো। আর সেখান থেকে ভেসে আসছে প্রচারণার গান। এটি অতীতের নির্বাচনের চিত্র থেকে একেবারেই ভিন্ন, যখন আওয়ামী লীগের ‘নৌকা’ প্রতীক পুরো দেশজুড়ে আধিপত্য বিস্তার করত। মতামত জরিপগুলো বলছে, একসময় নিষিদ্ধ থাকা জামায়াত সরকার গঠন করতে না পারলেও এবার তাদের ইতিহাসের সেরা নির্বাচনী ফল পেতে পারে।
ভারতের প্রভাব কমছে, চীনের প্রভাব বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, এই নির্বাচনের রায় আগামী বছরগুলোতে বাংলাদেশে চীন ও ভারতের ভূমিকাকেও প্রভাবিত করবে। শেখ হাসিনাকে ভারতপন্থী হিসেবে দেখা হতো এবং ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর তিনি দিল্লিতে পালিয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশে চীনের প্রভাব বেড়েছে। ভারতের প্রভাব কমতে থাকলেও, কিছু বিশ্লেষকের মতে বিএনপি তুলনামূলকভাবে জামায়াতের চেয়ে ভারতের সঙ্গে বেশি সুর মিলিয়ে চলতে পারে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, জামায়াতের নেতৃত্বাধীন সরকার গঠিত হলে তারা পাকিস্তানের দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে, যা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ এবং ভারতের দীর্ঘদিনের প্রতিদ্বন্দ্বী। পাশাপাশি জামায়াতের জেন-জি মিত্র দলটি বলেছে, ‘বাংলাদেশে দিল্লির আধিপত্য’ তাদের প্রধান উদ্বেগগুলোর একটি। সম্প্রতি দলটির নেতারা চীনা কূটনীতিকদের সঙ্গেও সাক্ষাৎ করেছেন। ইসলামি নীতির ভিত্তিতে সমাজ গঠনের পক্ষে থাকা জামায়াত অবশ্য বলেছে, তারা কোনো নির্দিষ্ট দেশের প্রতি ঝুঁকতে আগ্রহী নয়।
বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, তার দল সরকার গঠন করলে তারা যেকোনো দেশের সঙ্গেই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রাখবে। যে দেশ আমার জনগণ ও আমার দেশের জন্য উপযোগী প্রস্তাব নিয়ে আসবে, তাদের সঙ্গেই সম্পর্ক হবে।
বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ দেশ বাংলাদেশ, যেখানে চরম দারিদ্র্যের হারও বেশি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কমে যাওয়া এবং বিনিয়োগ স্থবির হয়ে পড়ায় ২০২২ সাল থেকে দেশটি বড় পরিসরে বৈদেশিক অর্থায়নের দিকে ঝুঁকেছে। যার মধ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক থেকে পাওয়া বিলিয়ন ডলারের সহায়তাও রয়েছে।
ঢাকাভিত্তিক দুটি থিঙ্কট্যাঙ্ক কমিউনিকেশন অ্যান্ড রিসার্চ ফাউন্ডেশন এবং বাংলাদেশ ইলেকশন অ্যান্ড পাবলিক ওপিনিয়ন স্টাডিজের জরিপ অনুযায়ী, ১২ কোটি ৮০ লাখ ভোটারের কাছে দুর্নীতি সবচেয়ে বড় উদ্বেগ। এরপরেই রয়েছে মূল্যস্ফীতি। বিশ্লেষকদের মতে, জামায়াতের ‘পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তি’ তাদের পক্ষে কাজ করছে ধর্মীয় অবস্থানের চেয়েও বেশি। জরিপে বলা হয়, ভোটাররা ভোট দিতে আগ্রহী, ধর্মীয় বা প্রতীকী ইস্যুর চেয়ে দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক সমস্যাকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন এবং এমন নেতৃত্ব প্রত্যাশা করছেন যারা যত্নশীল, দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক।
তবু সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমানকেই পরবর্তী সরকারপ্রধান হওয়ার প্রধান দাবিদার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট এগিয়ে যায়, তাহলে দলটির আমীর শফিকুর রহমান শীর্ষ পদে আসতে পারেন।
প্রথমবার ভোট দিতে যাচ্ছেন ২১ বছর বয়সী মোহাম্মদ রাকিব। তিনি আশা করেন পরবর্তী সরকার জনগণকে মত প্রকাশ ও ভোটাধিকার স্বাধীনভাবে প্রয়োগের সুযোগ দেবে। তার মতে, সবাই (শেখ হাসিনার) আওয়ামী লীগের কারণে ক্লান্ত ছিল। জাতীয় নির্বাচনে মানুষ ভোটই দিতে পারত না। মানুষের কোনো কথা বলার জায়গা ছিল না। আমি আশা করি, যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক না কেন, তারা এই মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে। অনুবাদ: মানবজমিন