অস্ট্রেলিয়ায় আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা নীতিমালায় সাম্প্রতিক পরিবর্তন ও ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, কেবল নীতিমালার কড়াকড়িই নয়,কিছু শিক্ষার্থীর নিয়ম না মানা ও অপব্যবহারও পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, কিছু শিক্ষার্থী পড়াশোনার মূল উদ্দেশ্য থেকে সরে গিয়ে ঘন ঘন কোর্স বা সাবজেক্ট পরিবর্তন, অতিরিক্ত সময় কাজ করা এবং অনানুষ্ঠানিক (করবিহীন) কাজে যুক্ত হওয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ পথে হাঁটছেন। এতে করে ভিসা শর্ত লঙ্ঘনের ঝুঁকি বাড়ছে এবং সামগ্রিকভাবে নির্দিষ্ট কিছু দেশের শিক্ষার্থীদের ওপর নজরদারি ও কড়াকড়ি বাড়ানোর ক্ষেত্র তৈরি হচ্ছে।
এদিকে অস্ট্রেলিয়া সরকার পড়াশোনা-পরবর্তী অস্থায়ী স্নাতক ভিসার ফি ২,৩০০ ডলার থেকে ৪,৬০০ ডলারে উন্নীত করেছে। পাশাপাশি জেনুইন স্টুডেন্ট (GS) পরীক্ষা চালু, আর্থিক সক্ষমতার সীমা বৃদ্ধি (২৯,৭১০ ডলার) এবং নথিপত্র যাচাই কঠোর করার মতো একাধিক পরিবর্তন কার্যকর হয়েছে। এসব তথ্য অস্ট্রেলিয়ার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও শিক্ষা বিভাগের সাম্প্রতিক আপডেট থেকে জানা গেছে।
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়ায় ২০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশি শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছেন।
তাদের বড় একটি অংশের লক্ষ্য পড়াশোনা শেষে স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ তৈরি করা। তবে নতুন নীতিমালার কারণে সেই পথ আগের তুলনায় আরও জটিল হয়ে উঠছে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা প্রতি পাক্ষিকে সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা কাজ করতে পারেন। কিন্তু বাস্তবতায় এই সীমা অতিক্রম করার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা, যা ভবিষ্যতে ভিসা জটিলতার কারণ হতে পারে।
সাম্প্রতিক পরিবর্তনের অংশ হিসেবে অস্থায়ী স্নাতক ভিসার বয়সসীমা কমিয়ে ৩৫ বছর করা হয়েছে, অনশোর আবেদনকারীদের জন্য কনফার্মেশন অব এনরোলমেন্ট (CoE) বাধ্যতামূলক করা হয়েছে এবং ভিসা পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পাশাপাশি অনশোর এজেন্ট কমিশন সংক্রান্ত কার্যক্রমেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে, যা ২০২৫–২০২৬ সময়কালের অভিবাসন নীতিমালার অংশ হিসেবে কার্যকর হচ্ছে। ২০২৬ সালের শুরু থেকে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও নেপালের শিক্ষার্থীদের জন্য ভিসা যাচাই আরও কঠোর করা হয়েছে। বাংলাদেশকে ‘এভিডেন্স লেভেল ১’ থেকে ‘লেভেল ৩’-এ নামিয়ে আনা হয়েছে, যা সবচেয়ে কঠোর ক্যাটাগরি। ফলে এখন আবেদনকারীদের ভিসা প্রাপ্তিতে অধিক বিস্তারিত আর্থিক প্রমাণ,উন্নত ইংরেজি দক্ষতার প্রমাণ,যাচাইকৃত একাডেমিক নথির প্রমান দাখিলে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ দিকে শিক্ষা খাত অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম বৃহৎ রপ্তানি খাত হিসেবে বিবেচিত হলেও নীতিমালার এই কড়াকড়ি বাংলাদেশীসহ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের আগ্রহে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ফলে শিক্ষার্থী সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও ফি বৃদ্ধি ও নীতিমালার কিছু পরিবর্তন পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ার শিক্ষামন্ত্রী জেসন ক্লেয়ারের বিভিন্ন সরকারি বক্তব্যেও আন্তর্জাতিক শিক্ষাকে দেশের অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সম্পর্ক জোরদারের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মো. ইমাম মেহেদী হাসান লিহাম বলেন,হঠাৎ করে ভিসার ফি দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় আমরা অনেকেই বিপাকে পড়েছি। বছরে আমার টিউশন ফি প্রায় ২৮ হাজার ডলার। কাজের সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় পরিবার থেকে সহায়তা নিতে হচ্ছে।
সিডনি প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদিদ হোসেন জানান, পড়াশোনা শেষ করে ভিসার জন্য আবেদন করতে গেলে বড় অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন হয়। অনেকের পক্ষে এটি জোগাড় করা সম্ভব না হওয়ায় তারা দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। এখানে খরচের চাপ অনেক বেশি,কিন্তু কাজের সুযোগ সীমিত।
একই বাস্তবতা তুলে ধরে পাবলিক হেলথ বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া জাহান বলেন,অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগে আমরা যে পরিকল্পনা করি,এখানে এসে দেখি বাস্তবতা অনেক ভিন্ন। পড়াশোনা, কাজ এবং খরচ সবকিছু ব্যালেন্স করা খুব কঠিন। নতুন নিয়মগুলো আমাদের জন্য আরো চাপ তৈরি করেছে। অনেক সময় ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা কাজ করে।
জালালাবাদ অ্যাসোসিয়েশন অব নিউ সাউথ ওয়েল্স ইনক্ এর সভাপতি মোঃ জাহেদুল হক চৌধুরী বলেন, নীতিমালার পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে এটা ঠিক। তবে আমাদের শিক্ষার্থীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। ভিসার শর্ত মেনে চলা,নির্ধারিত সময়ের বেশি কাজ না করা এবং পড়াশোনাকে গুরুত্ব দেওয়া খুবই জরুরি। কিছু ব্যতিক্রমী ঘটনার কারণে পুরো কমিউনিটি যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়,সে বিষয়েও সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
সিডনিস্থ স্কিলসওয়েভ গ্লোবাল-এর ডিরেক্টর নাসির উদ্দিন বলেন, অস্ট্রেলিয়া এখন বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে স্বপ্নের গন্তব্য, কিন্তু সেই স্বপ্নের পথ আগের চেয়ে অনেক বেশি কণ্টকাকীর্ণ। ভিসা ও একাডেমিক বিষয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা এই অভিজ্ঞ পরামর্শদাতার মতে, একদিকে কঠোর অভিবাসন ও শিক্ষানীতি,অন্যদিকে নিয়ম না মানার প্রবণতা,এই দুইয়ের মধ্যে বিপজ্জনক ফাঁক তৈরি হচ্ছে। এখনই সচেতন না হলে এই ফাঁকটাই একদিন অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ গ্রাস করে নেবে।
সূত্র: কালের কণ্ঠ